দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত: ডাল লেকে শিকারায় বসে চমকে উঠেছি। 
এ কী! এ যে তরুণ শাম্মি কাপুর। ঠিক তেমনই দেহসৌষ্ঠব, নাক–মুখের গড়ন। দূরের পাহাড় চূড়ায় বরফ ঝলকাচ্ছে। শাম্মি কাপুর সেদিকেই উদাস দৃষ্টিতে। এক লহমায় সত্তর দশক থেকে নিজেকে সরিয়ে আনলাম। কাশ্মীর মানে আমাদের মতো গড়পড়তা বাঙালির কাছে শর্মিলা ঠাকুর-শাম্মি কাপুর, রোগান জোশ, শালিমার বাগ, বেতাব ভ্যালি,   আপেল বাগান, শাল- জহরকোট। কাশ্মীর মানে অফুরান বিতর্ক। কিন্তু কাশ্মীরকে কখনও কি আমরা জানতে–বুঝতে চেয়েছি?‌
শাম্মি কাপুরের আসল নাম হামিদ। প্রশ্ন করেই ফেললাম, ‘‌হামিদ, এত যে বন্‌ধ ডাকা হয়, তোমরা সমর্থন করো?’‌ 
‘‌একেবারেই না। বন্‌ধ হলে আমাদের রুজি রোজগার বন্ধ। পেটে টান পড়ে।’‌
‘‌বন্‌ধ পালন করো কেন তা হলে?’‌ 
‘‌আমরা নিরুপায়।’‌ হামিদের মুখে অসহায়তার রেখা। ‘‌আমাদের জিজ্ঞেস করে কেউ বন্‌ধ ডাকে না। ওই যে পাহাড়ের ওপরে শঙ্করাচার্যের মন্দির দেখছেন, ওর পিছনের পাহাড়েই আমার বাড়ি। এখানে থাকতে গেলে অনিচ্ছাতেও সবকিছু মেনে নিতে হয়।’‌
‘সবকিছু’র অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দিতে ভয় পেয়েছিল হামিদ। সন্ত্রাস জনজীবনেই শুধু নয়, চারিয়ে গেছে মানুষের মনে। পারস্পরিক সম্পর্কে। এমনকী আত্মবিশ্বাসেও। অনুভব করেছিলাম সেদিন। 
অথচ কী অপরূপ এই উপত্যকা। হিমালয়ের ছত্রছায়ায় তুষারাবৃত লাদাখ কাশ্মীর। আপাতভাবে মনে হতে পারে লাদাখ আলাদা। কিন্তু কাশ্মীর, জম্মু ও লাদাখ এই তিনটে অঞ্চল নিয়েই জম্মু-কাশ্মীর প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। ‘লা সো লাদাখ’ কথাটির অর্থ  হ্রদ ও গিরিবর্তের দেশ।  
সমগ্র ভারতের মধ্যে লাদাখ সবথেকে বৈচিত্র‌্যময়। এখানে আট হাজার আটশো ফুটের নীচে কোনও জায়গা নেই। সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি, মরুভূমি, অসংখ্য হ্রদ এবং কিংবদন্তিসম প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার জনক সিন্ধু নদ। হিমালয়ের বৃষ্টিচ্ছায় ঢালে অবস্থিত বলে  লাদাখ বৃষ্টিহীন শুকনো।   
শ্রীনগর থেকে সোনমার্গ এসেছি, যার আরেক নাম ‘মিডো অফ গোল্ড’‌। অতীতে এই পথেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের তৈজসপাতি থেকে সোনার টুকরো পড়ে থাকত এ পথে। তাই হয়তো নাম সোনমার্গ। কিছুকাল আগেও পায়ে হেঁটে লাদাখ যাওয়ার জন্য অভিযাত্রীরা এখানে শিবির স্থাপন করতেন। সোনমার্গের বন দপ্তরের বাংলো থেকেই ‘থাজিওয়াস হিমবাহ’ দেখা যায়।  এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধ নালা। সেটা পেরিয়ে একটি প্রাচীন গ্রাম, সরবাল। এই গ্রামে থাকলাম দু’রাত। ইতিমধ্যে কাশ্মীরের অপরূপ সুন্দর লিডার নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। উচ্ছল নদী যেখান থেকে সৃষ্ট সেই ‘কোলাহাই হিমবাহ’ দেখে যুগপৎ আনন্দ ও দুঃখ হল। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ‘কোলাহাই’এর তুষারদেহ ক্রমশ সঙ্কুচিত। হয়তো কোনওদিন মিলিয়ে যাবে। সেদিনটা কাশ্মীরের পক্ষে যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনই মানবজাতির।   
গন্ধরবল পার হয়ে লাদাখ চলেছি। এ পথেই অনেক বিখ্যাত আবিষ্কারক, বণিক, পর্যটক  জোজিলা পার করেছেন। যাত্রাপথে দেখা হল বালতালের সঙ্গে। পাহাড়িরা ডাকেন ‘শিখাং’। বহুকাল আগে থেকেই বালতাল খ্যাত তার মনোরম সৌন্দর্যের জন্য। সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল এবং পরিব্রাজক স্বামী অভেদানন্দর লেখায় বালতালের বর্ণনা পেয়েছিলাম। মানস চোখে দেখে বুঝলাম কোনও বর্ণনাই যথেষ্ট নয়। বৃষ্টিভেজা বালতালের দূর্বাঘাসের মাথায় মাথায় শিশির জমছিল বরফ হয়ে। চাঁদের আলোতে দেখাচ্ছিল হীরের কুচি ছড়ানো উপত্যকা। একটানা গর্জন করে চলেছে ‘সিন্ধনালা’। দুরন্ত হিমেল হাওয়া।  বালতালের ডাকবাংলো দেখে মনে পড়ে গেল এক তরুণ কবির কথা। তখনও তিনি  রাষ্ট্রনায়ক হননি। সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমার জন্য বেছে নিয়েছিলেন বালতালের এই নির্জন পর্বতসানু। সেকালের কবির নাম জওহরলাল নেহরু এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন কমলা।
অমরনাথ যাত্রার মূলপথ এই বালতাল থেকেই শুরু। পাহাড়ি পথে ক্রমশ উঠছি জোজিলার দিকে। নীচে বালতালের ঘরগুলো দেশলাই বাক্সের মতো দেখাচ্ছে। জুন মাসেও রাস্তার দুপাশে বরফের দেওয়াল। গাড়ির জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই তুষারের ছুরি ‘আইসিকলস’ ধরা যায়। ছয়ের দশকে এ পথে বাস চলত বলে জানা যায়নি। তার থেকেও আশ্চর্যের ব্যাপার এই সঙ্কীর্ণ গিরিবর্ত্ম্যে ভারতীয় সামরিকবাহিনী ট্যাঙ্ক তুলে এনেছিল স্বাধীনতার পরের বছরেই। ফলত পাকবাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিল জোজিলায়। আজ রাস্তাঘাট অনেক উন্নত তবুও জোজিলা পার হওয়ার সময় দক্ষ চালকের কপালে ভাঁজ দেখা যায়। আমাদের ড্রাইভার ইউনিস জানাল, এই রাস্তা দিয়েই ইয়ারখন্দ, কাশগড়, চীন ও লাসা থেকে গার্তোক হয়ে ব্যবসায়ীরা ভারতে যাওয়া–আসা করতেন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল জোজিলার ইতিহাস শুনে। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা। বরফে ঢাকা। জোজিলার মাহাত্ম্য তার উচ্চতার জন্য নয়। দুর্গমতার জন্য। হিমালয়ে বেশ কিছু জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছে পায়ে হেঁটে কিংবা গাড়িতে। কিন্তু জোজিলা এমন একটা জায়গা যেখানে আর্যাবর্তের শেষ এবং মধ্য এশিয়ার শুরু। 
গাড়ি থেকে নেমে ইউনিস দেখিয়েছিল, একে শুধু পাহাড় বলা বোধহয় ঠিক হবে না। এই  গিরিবর্ত্ম্য গ্রেট হিমালয়ান গিরিশ্রেণির একটা নীচু অংশ।  
‘‌এই মাউন্টেন রেঞ্জকে ভাল করে দেখে নিন দিদি। সুদূর উত্তর–পশ্চিম দিকের পামির মালভূমি থেকে শুরু হয়ে হিমাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে পূর্বদিকে বিস্তৃত। এর জন্যই মৌসুমি বায়ু লাদাখে ঢুকতে পারে না। তাই লাদাখ রুখাশুখা।’‌ 
চোখ মেলে দেখলাম জোজিলার পর্বতশ্রেণি। এর জন্যই বালতালের দিকে কাশ্মীর সবুজ, উল্টোদিকের লাদাখ রুক্ষ।   
সন্ধেবেলা পৌঁছোলাম মাটায়ন। নির্জন  প্রান্তরে কয়েকটি উইলো, পপলার, বার্চ গাছ। মেষপালকদের গ্রাম। দূরে পাহাড়ের কোলে ছড়ানো–ছিটানো কয়েকটা বাড়ি আর একটা গুম্ফা নিয়ে মাটায়ন। অতীতে যাত্রীরা যখন ঘোড়ায় চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে জোজিলা পার হতেন তখন এখানে এসে এক রাত কাটিয়ে যেতেন। সামান্য কিছু মুলো, শালগম, ওলকপি জাতীয় সবজি ছাড়া কিছু গম ও বার্লি ফলে। মাটায়ান ছাড়িয়ে চলে এলাম পানদ্রাস গ্রামে। পথের ধারে একটি জলের কুণ্ড। তাতে পেছনের পাহাড়ের ছায়া পড়েছে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, পিছনের পাহাড়ে দ্রৌপদীর বাসস্থান ছিল এবং তিনি এই কুণ্ডে স্নান করতেন। তাঁদের আরও বিশ্বাস পাহাড়ের ওপর একটা মন্দির আছে কিন্তু সেটা কেউ দেখতে পায় না। ভেবেছিলাম চর্মচক্ষে সেই রহস্যের কিনারা করতে যাব কিন্তু সন্ধে গাঢ় হয়েছে। আমাদের পৌঁছোতে হবে পৃথিবীর দ্বিতীয় শীতলতম দেশে, দ্রাসে।  
যখন যাত্রাপথের পাহাড়গুলোর রং বদলে  ক্রমশ ধূসর, লালচে অথবা বাদামি হবে, বোঝা যাবে দ্রাস এসেছে। রুক্ষতারও এক অনন্যরূপ আছে। বাঁদিকে খাড়া পাহাড়, ডানদিক দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ‘বোদ গুমবর নালা’ যার নাম এখানে ‘দ্রাস নদী’। দ্রাস শহরে ঢোকার আগেই ‘মাসকোহ উপত্যকা’ দ্রাসের জনজীবন প্রতিষ্ঠায় এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। মাসকোহ নালা এখানে এসে না পড়লে হয়তো দ্রাস আজও জনশূন্য থাকত। প্রাচীনকাল থেকে এই উপত্যকার মধ্যে দিয়ে দর্দ জাতির মানুষেরা এখানে বসবাস শুরু করেন। জলধারার আশেপাশের তৃণভূমি বরাবরই যাযাবরদের আস্তানা গাড়তে প্রলুব্ধ করেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় দ্রাসের অভ্যন্তরে এমনই একটা গ্রামে আমরা আতিথ্য নিলাম। তবে সেখানে নাগরিক পরিষেবা নেই, সুযোগসুবিধা নেই, গ্যাজেট নেই। এমনকী বিদ্যুৎসংযোগ পৌঁছোয়নি। আছে শুধু আন্তরিকতা, নিখাদ ভালবাসা, যা মানুষে মানুষে আজ দুর্লভ। প্রবেশ করতে না করতেই লাদাখভূমি চমকে দিল তার অনন্যতায়। 
ভোরবেলা দ্রাস থেকে দেখে নিলাম টাইগার হিল, তোলোলিং শৃঙ্গ। এর পিছনেই বালতিস্তান যা পাকিস্তান অধিকার করে রেখেছে। লাইন অফ কন্ট্রোলে প্রত্যেক গিরিশিরার ওপর সামরিক ছাউনি। দ্রাসে না এলে ভারতকে উপলব্ধি করা কঠিন। সীমানার কড়াকড়ির মধ্যে, প্রচণ্ড প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে মানুষ বেঁচে আছে তা নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস  হয় না। দ্রাসে রাত কাটিয়ে চললাম কার্গিলের পথে। চুরকিয়াট সাং নামের একটা ছোট নদী পেরিয়ে এলাম থাসগাম। যখন ডাক ব্যবস্থা চালু ছিল তখন এখানে রানার বদলি হত। এই দুর্গম জনহীন প্রান্তরে রানারের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল আজ ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’য় বসে সেটা আমরা বুঝব না। 
খারবু পার হয়ে চলেছি। এই উপত্যকার সবথেকে নীচু গ্রাম। থাসগাম এর পর থেকে সড়কের দুপাশে ভাঙাচোরা গিরিশিরা বরফসুদ্ধ সিধে নদীর ধার অবধি নেমে এসেছে। অসামান্য সুন্দর দৃশ্য। দ্রাসের মতোই প্রচুর সামরিকবাহিনীর লোক। বুঝলাম কার্গিল বেশি দূরে নয়। সুরু ও ওয়াখা নদীর সঙ্গমে কার্গিল শহর। পাহাড়ের ধাপে ধাপে বাড়ি। নাগরিক সুবিধাস্বাচ্ছন্দ্য সব মজুত। বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাজার, বিপণি সব আছে।  যখন পৌঁছোলাম মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছিল আর মনকে উদাস করে দিচ্ছিল। কার্গিলের সূর্যাস্ত অপরূপ। নগরের বুক ফুঁড়ে বয়ে যাওয়া উচ্ছল সুরু নদীর বুকে সেই গোধূলির ছায়া পড়েছিল। কার্গিলের মানুষজনের চোখে কিন্তু সেই আন্তরিকতা দেখিনি। নিজের দেশের পর্যটকদের দিকে ‘বিদেশি’ দৃষ্টিতে তাকানো কিংবা ছোটখাটো আচরণেও রূঢ়তা, এমন কিছু ঘটনায় বিস্মিত হলাম। শহরের আশেপাশে সামরিক তৎপরতা দেখে মনে হল এটাই যদি উনিশশো সাতচল্লিশে ভারত সরকার দেখাতে পারতেন তবে আজ কার্গিলের বুক চিরে যুদ্ধবিরোধী সীমারেখা যেত না। পাকিস্তান সংলগ্ন সীমান্ত নিয়ে সরকারকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত থাকতে হত না। সীমান্তের এপারে–ওপারে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ যেত না।
বিকেলে পায়ে পায়ে সুরু নদীর ওপর পুরনো কাঠের পুল পার হয়ে প্রাচীন ‘পয়েন’ গ্রাম ঘুরে এলাম। পয়েন থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গায়ে কার্গিল শহরটা কেমন নদীর ধার অবধি নেমে এসেছে। সন্ধেবেলা কার্গিল বাজারে ঘুরতে বেশ লাগছিল। নদীর কাছে ‘গভর্নমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি সেন্টারে’ পশমিনা শাল, খোবানির জ্যাম, পিতলের কেটলি, হরেকরকম হুঁকো প্রভৃতি থরে থরে সাজানো। লোভ সামলানো দায়, অগত্যা কিনেই ফেললাম।
কার্গিল থেকে পরদিন চললাম সুরু উপত্যকা।  ডানদিকে হিমালয় ও বাঁদিকে জাঁসকার পর্বতমালা। এই দুই গিরিশ্রেণির মাঝে সুরু নদীর ধারে ধারে পথ গিয়েছে ‘পেনসি লা’ হয়ে ‘পদম’। পেনসি লার কাছেই ‘নুন–কুন’ শৃঙ্গ এবং অন্যান্য বরফঢাকা পাহাড়ের জলে সুরু নদীর জন্ম। সুরু উপত্যকা কার্গিল জেলার হৃদয়াঞ্চল। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে প্রচুর চাষবাস হয়। পতিত জমি নেই। প্রচুর পরিমাণ ফসল ও সবজি ফলে তাই সুরু উপত্যকাকে ‘লাদাখের শস্য ভাণ্ডার’ বলা হয়। এখানকার লোকজন বৃষ্টির থেকেও রোদ্দুর বেশি কামনা করেন। তাঁরা চান বছরে তিনশো দিন অন্তত কড়া রোদ পাওয়া যায় তাতে দুপাশের পাহাড়ে জমা বরফ গলে বেশি জল পাওয়া যাবে এবং খেতে জলসেচের সুবিধে হবে। অধিবাসীদের বেশিরভাগ তিব্বতি দর্দ ও মিশ্রিত জাতির বংশধর। প্রাচীনকালে এঁরা ছিলেন বৌদ্ধ। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে সুরু অঞ্চলের বৌদ্ধ শাসনকর্তা ‘থি নামগ্যয়াল’ কাশ্মীরের মুসলিম এবং বিদ্বান সাধু ‘সৈয়দ মীর হাসিম’কে এখানকার লোকেদের ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই থেকে এখানে ইসলামের জয়যাত্রা শুরু হল।   
কার্গিল এবং পদমের মাঝামাঝি জায়গায় ‘রিংদম’। বহুদূর থেকে দেখা যায়। রিংদম গুম্ফাটা একটা ছোট্ট টিলার ওপর। এখানে সুরু নদীর নাম ‘রিংদম সাংপো’। বিকেলে পড়ন্ত সূর্যের আলোতে মনে হয় যেন আগুন ধরেছে। সেই অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য প্রচুর দেশি–বিদেশি পর্যটক সমাগম হয়। রিংদম গুম্ফার প্রধান আকর্ষণ অষ্টাদশ শতাব্দীর গেলুক পা মতের গুম্ফা। বুদ্ধের নানান ভঙ্গিমার মূর্তি এর আগে কোথাও দেখিনি। গুম্ফার পশ্চিমদিকে ‘ইউলদো’ এবং দক্ষিণে ‘তাশি-তোংজে’ গ্রাম। গ্রাম দুটোর অধিবাসীরা গুম্ফার ক্রীতদাসবৎ দায়বদ্ধ চাষিদের বংশধর জেনে চমকে উঠলাম। বোধহয় পৃথিবীর তাবৎ ধর্মের ব্যবস্থাই মূলত এক! এদের নিজস্ব কোনও জমিজমা নেই। গুম্ফাটা এই পুরো উপত্যকার চাষের জমি, মাঠঘাট, পাহাড় এমনকী নদীনালার একচ্ছত্র মালিক।  
জাঁসকার উপত্যকা দেখে মন ভরে গেল। আদিগন্ত সবুজ তৃণভূমিতে নির্ভয়ে চরছে হাজার হাজার ইয়াক এবং বন্য ছাগল। পৃথিবীটা যে শুধু মানুষের দাপাদপির জায়গা নয়, এই একটুকরো ছবি সেই বরাভয় দিল। ওপরে মেঘমুক্ত সুনীল আকাশ। রৌদ্রস্নাত সোনালি ঈগলের ডানা চকচক করছে। বেঁকানো শিঙওয়ালা ভেড়ার পাল দেখলাম যাদের ‘লাদাখ উরিয়াল’ বলে। আর দেখলাম ‘হিমালয়ান মারমট’। বিরাট বড় কাঠবেড়ালি। আমাদের দেখেই লজ্জায় সেঁধিয়ে গেল গর্তে। পাহাড়ের ওপর থেকে দেখলাম অনেক নীচে প্রায় শখানেক ‘ব্লু শিপ’  নিজেরাই শৃঙ্খলিত হয়ে লাইন করে পেরোচ্ছে জাঁসকার নদী। জাঁসকারের রাজধানী পদমে গোটা একটা দিন এবং দু’রাত  কাটালাম। পদম জনপদটি পায়ে পায়ে ঘুরে নেওয়া যায়। ‘পিবিটিং গুম্ফা’তে গেলাম। এখানে দলাই লামা এসেছিলেন ‘কালচক্র’ উৎসবের সময়। আরেকটি হল ‘স্তাগরিমো গুম্ফা’। উইলো গাছের অরণ্যে ঘেরা। এই উইলো কাঠের খুব কদর ক্রিকেট ব্যাট তৈরির জন্য। কাশ্মীরেও দেখেছি গ্রামে গ্রামে উইলো কাঠ থেকে ব্যাট তৈরি হতে। পদম থেকে নেমে এসেছিলাম নীচে। লুগনাক নদীর ধারে। আধঘণ্টা হেঁটে দেখতে পেলাম সারি সারি বুদ্ধমূর্তি যে যার মতো অরণ্যে একাকী। স্থানীয় এক লামা জানালেন, সেগুলো অষ্টম শতাব্দীর। সেই মুহূর্তে টাইম ট্র্যাভেল করে আমি ফিরে গেছিলাম ইতিহাসে। অপূর্ব সেই অনুভূতি।
লাদাখে যাত্রাপথের দৃশ্য মাঝেমাঝেই মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমরা যাযাবর। এইসব মেষপালকদের মতো আমাদেরও কোনও না কোনও পূর্বসূরি হয়তো এভাবেই হেঁটে গেছেন হিমালয়ের প্রান্ত ধরে। নয়তো নাগরিক মনেও কেন এত পিছুটান! জাঁসকর পেরিয়ে চলে এলাম ‘মুলবেখ’। প্রাচীন নাম  ‘মৌলবা চাম্বা’। বিকেলের প্রায়ান্ধকারে পাহাড়ের দিকে এগোতেই চমকে উঠলাম। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল দণ্ডায়মান মূর্তি। লাদাখিরা বলেন, ‘ভবিষ্য বুদ্ধ’। কার্গিল থেকে পদম যাওয়ার পথে শঙ্কু গ্রামেও এমনই এক বুদ্ধমূর্তি দেখেছিলাম। চল্লিশ ফুট উঁচু মূর্তির চার হাত। এক হাতে কমণ্ডলু, অন্য হাতে জপমালা। এক হাতে পদ্ম, অপর হাত খালি। গলায় হার। উপবীত এবং পায়ের নূপুর প্রমাণ করে মূর্তিটা যেসময়ে তখন হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্মের পারস্পরিক প্রভাবকাল। কেউ কেউ বললেন, মূর্তিটি বিষ্ণুর। বুদ্ধদেবই নাকি বিষ্ণুর নবম অবতার। প্রার্থনা সঙ্গীতের সময় হাঁটুমুড়ে বসামাত্র স্পর্শ করলাম লাদাখকে। খ্রিস্ট পূর্বাব্দ একশো। কুশান যুগের ভারতবর্ষকে।   
দ্রাস কার্গিলের সঙ্গে মুলবেখ, বাটালির পোশাক–আশাক, ধর্ম, আচার–আচরণে বেশ পার্থক্য। চিরাচরিত লাদাখি পোশাক পরা পুরুষ পাজামা ও আলখাল্লা পরা। মাথায় রঙিন টুপি, পায়ে চামড়ার জুতো। মেয়েদের গায়ের জামা একটু ছোট। ওপরে রঙিন জ্যাকেট। হাতে, পায়ে, গলায়, কোমরে প্রচুর ধাতুর ও পাথরের গয়না। তবে এই পোশাক–আশাক দেখতে পেলাম গুম্ফার উৎসবের জন্য। পরে লেহ শহরেও গেছি কিন্তু  শহরবাসীদের মধ্যে এই প্রথাগত পোশাক পরার চল নেই।
 ‘লামায়ুরু’ পৌঁছে হতবাক। হঠাৎ দেখলে মনে হবে বুঝি বা চাঁদের মাটিতে নামলাম। তীব্র হাওয়া মুলতানি মাটির পাহাড়ে ক্ষয় ধরিয়ে চন্দ্রভূমির মতো আকার দিয়েছে। লামায়ুরুকে তাই ‘মুনল্যান্ড’ বলে। লাদাখের প্রাচীনতম গুম্ফা লামায়ুরু। এই গুম্ফা না দেখলে লাদাখের কিছুই দেখা হয় না। গর্ভগৃহে প্রায় চারশোখানা তিব্বতি ভাষার পুঁথি ছাড়াও অতীশ দীপঙ্কর, পদ্মসম্ভব প্রভৃতি বৌদ্ধগুরুদের মূর্তি। এছাড়া ‘থুকজে ছিনপো’ বা ‘অবলোকিতেশ্বর’। এগারোটা মাথা এবং হাজার হাত। প্রত্যেক হাতে একটা করে চোখ। কেন অনেকের বিশ্বাস প্রাক বৌদ্ধযুগে এখানে ‘বন’ ধর্মের চর্চা হত তার প্রমাণ।   
লাদাখ মানেই উপত্যকা থেকে উপত্যকায় ঘুরে বেড়ানো। মোটরে পার হতে হবে  তেরোটা গিরিবর্ত্ম্য। সবথেকে উঁচু খারদুংলা। সতেরো হাজার পাঁচশো বিরাশি ফুট উঁচু এই দুর্গম উপত্যকার পুরোটাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। কাছেই সিয়াচেন হিমবাহ। সেনাবাহিনী প্রচণ্ড কষ্টের সঙ্গে পাহারা দিচ্ছে সীমান্ত। খারদুংলা না দেখলে  ভারতবর্ষের উচ্চতা বোঝা যায় না। সবাই তো হিমালয়ে ট্রেক করতে সক্ষম নন। খারদুংলা তাঁদের কাছে এক বিকল্প। হিমালয়ের মোহিনী রূপের সঙ্গে ভয়ঙ্কর চেহারা ফুটে ওঠে খারদুংলার নিঃসঙ্গ শৈলপ্রান্তরে। চারদিকে শুধু ধু ধু বরফ। আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। চেক পোস্টে দশ মিনিটের বেশি থাকতে দেয় না পাছে অক্সিজেনের সমস্যায় শরীরে বিঘ্ন ঘটে। এই খারদুংলাই ছিল মধ্য এশিয়া  থেকে সরাসরি ভারতবর্ষের প্রবেশপথ। তারাই আসতে পারত যাদের শরীরে, মনে ছিল অমিত বিক্রম, ধৈর্য, স্থৈর্য।     
খারদুংলা উপত্যকায় ‘খারদুং গ্রাম’ লাদাখের দ্বিতীয় উচ্চতম জনবসতি। খারদুং থেকে নীচে  নামতেই ‘শায়ক উপত্যকা’। শায়ক নদীর পাড়ে রাস্তাটা দুভাগে বেঁকে গেছে। বাঁদিক দিয়ে চলে গেলাম ‘খালসার গ্রাম’। সেখানে এক রাত কাটিয়ে পরদিন নুব্রা পৌঁছোলাম। শায়ক এবং নুব্রা বাদবাকি লাদাখের তুলনায়  উষ্ণ এবং রুক্ষ। তুঁতে নীল শায়ক নদী বার বার আকর্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছিল পাড়ে। নুব্রার রাত ছিল পূর্ণিমা। বালিভরা মাটি দেখে বোঝা যায় কাছেই মরুভূমি। প্রচুর খেজুর এবং ক্যাকটাসের আধিক্য। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে খোলা চাতালে গেলাম। জ্যোৎস্নায় ভাসছে নুব্রা উপত্যকা। সীমাহীন বিস্তীর্ণ চরাচর। চন্দ্রালোকে দূরে প্রতীয়মান ডিস্কিট  গুম্ফার ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি।
ডিস্কিট পেরিয়ে পরদিন চললাম লাদাখের মরুভূমিতে। হাণ্ডার গ্রাম পেরিয়ে উটের পিঠে চড়ে মরুযাপন। এগারো হাজার ফুট উঁচুতে লাদাখের এই শীতল মরুপ্রান্তর না দেখলে লাদাখভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না। উটগুলোও দুকুঁজো। ব্যাকট্রিয়ন ক্যামেল। প্রচুর ট্যুরিস্ট এসেছেন। বাস্তবিক, ট্যুরিজম লাদাখের আয়ের একটা বড় উৎস এবং লাদাখিদের অতিথিবৎসলতা এখনও হারিয়ে যায়নি ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মানুষদের মতো। 
রাজধানী লেহ নগরে গিয়েছিলাম সবার শেষে। আমাদের ধারণা ছিল নগরসভ্যতা দেখে কী হবে! কিন্তু লেহ এমন নগর যা দেখামাত্রই মন কেড়ে নেবে। দার্জিলিং গেলে বাঙালির যেমন হয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার বদলে এখানে চব্বিশ ঘণ্টা অতন্দ্র পাহারা দেয় কারাকোরাম পর্বতমালা। আর রয়েছে   সবুজ-নীল ‘সিন্ধু নদ’। লেহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম শহর। ‘লেহ প্যালেস’, ‘শে প্যালেস’, ‘থিকসে গুম্ফা’ এবং ‘হেমিস গুম্ফায়’ গেলাম। সাতশো বছরের পুরনো হেমিস গুম্ফায় প্রচুর তিব্বতি পুঁথি আছে। লাইব্রেরিটা একবার উঁকি দিয়ে দেখলাম। যিশু খ্রিস্ট কাশ্মীরে এসেছিলেন এবং এখানেই তাঁর জীবনের শেষদিনগুলো কাটিয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রচুর তর্কবিতর্ক আছে। হেমিসের বিভিন্ন পুঁথিতে সেগুলো লিপিবদ্ধ। কিন্তু তা জানতে গেলে থাকতে হবে এখানে দীর্ঘদিন।  
অবশেষে পনেরো হাজার ফুট উচ্চতায় ‘সোমোরিরি’ এবং চোদ্দো হাজার ফুট উঁচু  ‘প্যাংগং’ হ্রদের জলে আমার ভ্রমণতৃষ্ণা মিটল। দিনে–রাতে, ঊষা গোধূলিতে এই হ্রদগুলোর জলের রং বদল হয়। আকাশের রঙের সঙ্গে সঙ্গে সরোবরের এই ভোলবদল দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। দিনের বেলা গাঢ় তুঁতে জল। পাড়ের কাছে স্বচ্ছ। গর্ভের নুড়ি পর্যন্ত দেখা যায়। রাতের বেলা ঘন নীল থেকে বেগুনি। অমাবস্যার রাতে সোমোরিরির বুকে খসে পড়ে মহাজাগতিক উল্কা। আলো ফুটতে না ফুটতেই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি উড়ে আসে। ‘বার হেডেড গুজ’ যারা হিমালয়ের ওপর দিয়ে ওড়ে। তেমনই ‘গাঙ চিল’ , ‘ব্রাহ্মিণী হাঁস’।     
কাশ্মীর লাদাখের অন্দরে অন্তরে আমি সাতবার গিয়েছি। থেকেছি একেবারে সাধারণ  মানুষগুলোর সঙ্গে। এই লোকজন ঘৃণা কাকে বলে জানেন না। ঘৃণার রাজনীতি বুনে দেওয়া হয় বলেই কিছু অংশ দিশেহারা। তাঁরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর ছাদে বসে আছেন অতএব  বিপদে–আপদে শরণ নেওয়া মানুষদের  আগলিয়ে রাখার দায়িত্ব তাঁদের। জীবনের মৌলিক চাহিদা থেকে অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত। এমনকী তাঁরা নিজেরাও জানেন না যে তাঁদের অধিকারের কতখানি অধরা থেকে গেছে। প্রকৃতির মতোই মানুষগুলোকেও ব্যবহার করেছে বাকি ভারতবর্ষ। কিন্তু এবার প্রয়োজন কাশ্মীর লাদাখের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কল্যাণ। সেটা শুধু সরকারের কর্তব্য নয়, বাকি ভারতবর্ষেরও। একটা কথা আমরা ভুলে যাই, সরকার যায় আসে, মানুষ থেকে যায়। কাজেই কাশ্মীর লাদাখে শান্তি নিয়ে আসার জন্য আমাদের প্রতিটি ভারতবাসীর কিছু না কিছু ভূমিকা আছে। অন্তত সোশ্যাল মিডিয়াতে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে, উত্তেজনা, ঘৃণা না বাড়িয়ে একবার বেড়িয়ে আসুন।  
প্রকৃতি আর মানুষ সমার্থক। ঘুরে দেখে নিন একবার। সেই চোখ আর মনটা অবশ্য খোলা থাকা দরকার। নয়তো হিমালয়ের ছত্রছায়ায় থাকা কাশ্মীর লাদাখের অপার সৌন্দর্য ধ্বংসের মুখে চলে যাবে। আর তা নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top