ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: ‘ভাল মা! ভাল মা! জ্যাঠাবাবুরা ফিরে এসেছে।’ 
মেজদার ডাক শুনে একছুট্টে বারান্দায়। মা-কাকিমা কপালে হাত ঠেকালেন, ‘‌দুগ্গা, দুগ্গা।’‌
১৯৭১। সদ্য জন্ম নিয়েছে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ওপারবাংলায় টানা কয়েক মাস মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। সপরিবার আমাদের বাড়িতেই এসে উঠেছিলেন ন’কাকা-কাকিমা ও ছেলেমেয়েরা। দশদিন আগে বাবা, ফুলকাকু ও ছোটকাকু তাঁদের নিয়ে গেছেন আদি দেশের বাড়ি, যশোরের পাইকড়া গ্রামে। শেষ ফোন এসেছিল বনগাঁ সীমান্ত পার হওয়ার সময়ে। দুশ্চিন্তায় মা-কাকিমার ঘুম ছিল না।
বাড়িতে আনন্দের শোরগোল পড়ে গেছে। সেই আনন্দ কয়েক গুণ বেড়ে গেল, যখন আমাদের অ্যাম্বাসাডরের ডিকি থেকে লাউ, কুমড়ো, শাকসবজির শেষে নামল নধর চেহারার গোটা আটেক রুপোলি ইলিশ। বুকের কাছে লাল আভা। বাবা ঝলমল মুখে বললেন, ‘বনগাঁ বাজার থেকে নিয়ে এলাম। ফরিদপুরের পদ্মার ইলিশ।’
সেই প্রথম পদ্মার ইলিশের সঙ্গে আমার পরিচয়। তার প্রাণকাড়া গন্ধে গোটা বাড়ি ম ম করছে। থালায় গন্ধ, গেলাসে গন্ধ, হাতের তালুতে গন্ধ। আর সেইসঙ্গে চলল বিতর্ক, কোন ইলিশের স্বাদ বেশি– গঙ্গা না পদ্মা? এ যেন সেই বাঙালির চিরন্তন তরজা, হেমন্ত না মান্না, উত্তম না সৌমিত্র! ‌
আমার মা সবসময়েই ছিলেন গঙ্গা আর রূপনারায়ণের ইলিশের পক্ষে।  এ নিয়ে দুই বাঙাল বাবা ও মায়ের মধ্যে তর্ক লেগে যেত। 
বাবা বলতেন, ' যাই বলো, পদ্মার ইলিশ অনেক নরম। ' 
মা বলতেন, ' কোলাঘাট কি ডায়মন্ডহারবারের ইলিশে তেল, গন্ধ অনেক অনেক বেশি। কড়াইয়ে ছাড়লে ইলিশের তেলেই রান্না হয়ে যায়। এক বাড়িতে ইলিশ ভাজলে তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পাড়াময়। ' 
ইলিশ বিশেষজ্ঞ আমি নই।  তবে আমিও আগে বাজারে গিয়ে কোলাঘাটের ইলিশই খুঁজতাম। অত তেলাদু ইলিশ আর কোথাও পাইনি। আমি পদ্মার ইলিশও খেয়েছি। সেই গল্প আজ বলব। তবে আগে বলে রাখি, গঙ্গার ইলিশের কোনও তুলনা হয় না। বাংলাদেশ হওয়ার পরে পদ্মার ইলিশ দিব্য আসতে শুরু করল। বরফচাপা সেই মাছের চেয়ে গঙ্গার ইলিশ অবশ্য আমাদের বেশি পছন্দের। অনেক টাটকা, অনেক তৈলাক্ত ও স্বাদু। বাড়ির তৎকালীন কত্তারা অবশ্য বলতেন, ‘তরা ত গোয়ালন্দের তাজা ইলিশ খাওস নাই। কী কইরা বোঝবা তার সোয়াদ!’
খাস বাঙালদের মুখে গোয়ালন্দের ইলিশ-কাহিনী শুনে আমরা বেড়ে উঠেছি। ২০০০ সালে আকস্মিক যাচাই করার সুযোগ এসে গেল।
প্রথম ভারতীয় বইয়ের মেলা হতে চলেছে ঢাকায়। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের দুই প্রতিনিধি সুধাংশু ও আমি উঠে পড়লাম কলকাতা-ঢাকা সরকারি বাসে।
বনগাঁ পেট্রাপোল থেকে যশোরের বেনাপোল। বাস ছুটছে সবুজে মাখা বাংলাদেশ-এর বুক চিরে। মাঝে কয়েকটা জায়গায় থেমে যশোর, মাগুরা, ফরিদপুর হয়ে বাস যখন এসে দাঁড়াল দিগন্তহীন পদ্মার পারে, তখন গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে চরাচর।
বুকের মধ্যে শিহরন! এই সেই গোয়ালন্দ ঘাট! টিমটিম হলুদ আলো। এখানকার ইলিশের কথাই তো বাবা-কাকাদের মুখে শুনে এসেছি আশৈশব।
সারি সারি বাস–ট্রাক গাড়ির লম্বা লাইন। একের পর এক বার্জ এসে দাঁড়াচ্ছে আর তার ওপর উঠে পড়ছে মানুষ ঠাসা বিরাট বিরাট বাস, মালভর্তি ফুল পাঞ্জাব লরি। হাঁ হয়ে দেখছি।
আমাদের বাসটাও উঠে পড়ল, ছেড়ে দিল বার্জ। কন্ডাক্টর বললেন, ‘নদী পেরোতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। আপনারা নেমে ঘুরে দেখতে পারেন। তবে খবরদার, কেউ বার্জের রেলিংয়ের কাছে যাবেন না। নদীতে এখন জোয়ারের ঢেউ। দুলুনিতে যদি জলে ছিটকে পড়েন, তবে আল্লাও বাঁচাতে পারবেন না।’
এসি বাস থেকে নামতেই নাকে এসে ধাক্কা দিল হাওয়ায় মিশে থাকা মাদক গন্ধ! সুধাংশু-আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি ও ফিসফিস, ‘ইলিশ! ইলিশ!’
অবাক হয়ে দেখলাম, আশপাশের বাস-টাস থেকেও মানুষজন নামছেন। আর অপ্রতিরোধ্য গন্ধের আকর্ষণে দুদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছেন ওপরের ডেক-রেস্তোরাঁর দিকে।
রেস্তোরাঁ নামেই। লোহার ছাউনির নিচে প্লাস্টিকের কালচে টেবিল–চেয়ার। ধোপদুরস্ত বেশভূষার প্রচুর মহিলা-পুরুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন থালার ওপর। মূল মেনু বলতে মোটা চালের ভাত আর–হ্যাঁ, মহার্ঘ মৎস্যকুলপতি। ইলিশ আর ইলিশ।
আমরা বসতেই লুঙি-গেঞ্জি একজন মানুষ স্টিলের থালায় এক খামচা করে ভাত, পাশে কাঁচা মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী খাইবেন কন কত্তা? ইলিশের সব প্রকার রান্ধন আসে।’
তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ইলিশের তেল দিয়ে ভাজা মাছ, আর ডিমভাজা। সব একজোড়া করে।’
ভাত রইল পড়ে। আহা, কী অনির্বচনীয় স্বাদ, কী অপূর্ব গন্ধ! মুখে দিচ্ছি, আইসক্রিমের মতো গলে যাচ্ছে। থামতে পারছি না, পাগলের মতো খেয়ে চলেছি। আর মনে মনে মা-বাবার উদ্দেশে বলছি, ‘না, তোমরা একটুও বাড়িয়ে বলোনি। এ ইলিশ স্বর্গের চেয়েও লোভনীয়।’
হঠাৎ হুঁশ ফিরল জোরালো হুইশলে। হড়বড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, সার্চলাইটের গনগনে আলোয় অন্ধকার জলরাশিকে ফালাফালা করে এগিয়ে চলেছে বার্জ, দূ-রে আবছা-আবছা ফুটে উঠছে আলোকমালায় সজ্জিত ওপারের তটরেখা। আরিচা ঘাট। এই রে! পদ্মাপার শেষ হয়ে এসেছে। এখনই নিচে নামতে হবে।
আমাদের অবস্থা দেখে হেসে ফেলে ক্যাশে বসা বয়স্ক লম্বা দাড়ি মানুষটি। বলে, ‘ব্যস্ত হওনের নাই কত্তা। অ্যাহনও অনেক টাইম বাকি। আরামে তরিজুত কইরা খান।’...
তবে পদ্মার তাজা ইলিশের স্বাদগ্রহণের জন্য ঢাকা শহর থেকে তিন ঘণ্টা সময় ও পেট্রোল পুড়িয়ে প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে ধাবিত হওয়া, এই কর্মটি আমার একার দ্বারা কদাপি হত না। এবারে সেই অসম্ভব ব্যাপারটাই ঘটল।
নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন শেষবার ঢাকা শহরে আয়োজিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগে, ১৯৩৩ সালে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সভাপতি। ১৯৪৭–এ দেশভাগ, ১৯৭১–এ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পরে ২০১৮–য় এসে ‘আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন’ শিরোনামে শয়ে-শয়ে কবি-সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেমীদের নিয়ে গত জানুয়ারির ১৩, ১৪ ও ১৫, তিনদিন বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং ভারতের টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের সহায়তায়।
সত্যিই তো, আর কোথায়ই বা হতে পারে এমন বাংলাচর্চার আয়োজন! ভারতের বাংলাভাষী অঙ্গরাজ্যগুলোয় কখনও যদিও বা বিপন্ন হয় বাংলা ভাষা, আলাদা রাষ্ট্র বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। ওদের জন্যেই বাংলা ভাষাকে কখনও কেউ মুছে দিতে পারবে না। তাই যত ব্যস্ততাই থাক, এই সাহিত্য সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি। মেয়ে এষা আর শাশ্বত ঘোষাল আমার সঙ্গী।
১২ জানুয়ারি সন্ধেবেলা। ঢাকায় ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে। বেল্টের সামনে লাগেজ নিতে দাঁড়িয়ে আছি। দুই মক্কেল এগিয়ে এল। এষা বলল, ‘পাপা, মাওয়া ঘাট নামটা শুনেছ?’
‘মাওয়া ঘাট? নাহ্! কোথায়?’
‘ত্রিদিবদা, তুমি কতবার বাংলাদেশ এসেছ?’ শাশ্বত পাশ থেকে বলল।
‘কেন, কেন?’ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি, ‘তা বার দশেক। ক্-কিন্তু তার সঙ্গে এই মাওয়া ঘাটের কী সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক একটাই। ল্যাক অফ ইনফরমেশন।’ এষা বলে ওঠে, ‘আমরা এই প্রথম এলাম। আমরা নামটা জানি, তুমি এতবার এসেও জানো না!’
বলে কী! আকাশপাতাল ভেবেও থই পাচ্ছি না। এষা হেসে বলল, ‘পদ্মার মাওয়া ঘাট বিখ্যাত ইলিশ মাছের জন্য। সারা বছর নদীতে প্রচুর ইলিশ। জালে তুলছে আর সাজিয়ে দিচ্ছে খদ্দেরের পাতে। এই ঘাটের কথা আমায় বলেছিল এক বন্ধু। ব্যবসার কাজে সে এসেছিল। তার মধ্যেই সময় করে খেয়ে গেছে।’
মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল ১৮ বছর আগের গোয়ালন্দ, নাকে ধাক্কা দিল ইলিশের তীব্র ঘ্রাণ।
‘কী করে যাব? সারাদিন অনুষ্ঠান আছে তো!’
‘লিস্ট দেখে নিয়েছি। কাল উদ্বোধন। পরশু তোমার কোনও সেমিনার নেই। ওইদিনই আমরা যাব। তুমি না গেলেও যাব।’‌
১৪ জানুয়ারি সকাল ১১টা। শাশ্বত ওর বন্ধুর গাড়ি নিয়ে হাজির হোটেলের দরজায়। ড্রাইভার হাসিখুশি তরুণ চুন্নু। হোটেলের সিকিউরিটি খুব গাইগুই করছিল। হাজার হোক, আমরা সরকারি অতিথি। চুন্নু ওর লাইসেন্সের জেরক্স দিয়ে তাতে ওর ফোন নম্বর লিখে দিতে তবে ছাড়ল।
ঢাকার বিকট জ্যামজট ছাড়াতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তারপর বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে গাড়ি হাইওয়েতে। কিন্তু তবুও গতি বাড়ছে না। ডানদিক দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি চলাচল, বামদিকে বিশাল রাস্তা তৈরি হচ্ছে।
চুন্নু গর্বের সঙ্গে বলল, ‘স্যর, চাইর লেনের এশিয়ান হাইওয়ে তৈয়ার হইতাছে। এই রাস্তার সঙ্গে কানেকশন হইব পদ্মা সেতুর। পদ্মা সেতু জানেন ত? আমাগো চ্যালেঞ্জ। জাপান টাকা দিব বইলাও পিছাইয়া গ্যাছে। কইছে, এই পাগলা নদীতে এত লম্বা ব্রিজ করা নাকি অসম্ভব। তহন আমরাই করতাছি। চীন, কোরিয়া দ্যাশের ইঞ্জিনিয়াররা দিবারাত্র কাম করতাছে। আমরা কইরাই ছাড়ুম!’ বলতে বলতে ওর মুখে আলো ফুটে উঠল।
আস্তে আস্তে রাস্তার ট্রাফিক পাতলা হচ্ছে। শহর ছেড়ে গ্রাম, দুদিকে আদিগন্ত ধানখেত, মাঝে মাঝে কলাবাগান, তাল, নারকেল, খেজুর গাছ। হাইওয়ের কাজও চলেছে পাশে পাশে। চুপ করে নিসর্গ উপভোগ করছি। শুধু চুন্নু নিজের মনে বকবক করে চলেছে, ‘দাদা, হেইবার ধলেশ্বরী ব্রিজ আইতাছে। অর পরেই মুন্সিগঞ্জ। আর বেশি দেরি নাই। ঘাটে ভাত খাইবেন ত?’
‘নিশ্চয়ই। সেইজন্যেই তো আসা। ইলিশ মাছ শুধু শুধু খাব!’
‘ইন্ডিয়ায় ইলিশ কম উঠে বুঝি?’
‘ওঠে। তবে এদেশের মতো টেস্ট নেই। আগে তোমাদের পদ্মার ইলিশ কলকাতায় যেত, এখন আর যায় না।’
‘জানি দাদা। আপনেরা তিস্তার পানি চুক্তি সই করেন নাই, তাই হাসিনা আপা ইলিশ পাঠানো বন্ধ কইরা দিছেন।’...
মুন্সিগঞ্জ ঢুকে পড়েছি। নরম বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। মসৃণ ফাঁকা রাস্তা। গাড়ির স্পিডোমিটার একশো ছাড়াল।
হঠাৎ ম্যাজিকের মতো আকাশের বুকে জেগে উঠল আড়াআড়ি এক দৈত্যাকৃতি সেতু! তার মস্ত মস্ত পিলার!
‘ওই যে দাদা, দ্যাখছেন? আমাগো পদ্মাসেতু। এপারে বেশিদিন কাজ শুরু হয় নাই। জাজিরার দিকে মাঝনদী পর্যন্ত আইয়া পড়ছে।’
তার পরপর এসে পড়ল অথৈ সমুদ্রের মতো জলরাশি। পদ্মা। আঠারো বছর পরে তার সঙ্গে দেখা। কুয়াশায় আবছা ওপারের তটরেখা। গাড়ি এসে থামে মাওয়া ঘাটের সামনে।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণের জন্যে হারিয়ে গেছিলাম রোজকার এই জগৎ, এই সময় থেকে অন্য কোথাও অন্য কোনও দুনিয়ায়। গোয়ালন্দে রাতের অন্ধকারে যে দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়নি, আজ সেটাই প্রতীয়মান হল। আদিগন্ত রুপোলি জলে হুইশল দিতে-দিতে চলাচল করছে বিশাল বিশাল জলযান। এসে দাঁড়াচ্ছে ঘাটে, তাদের পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে বড় বড় বাস, ট্রাক, গাড়ি, শয়ে শয়ে মানুষ। কোনওটা যাচ্ছে বরিশাল,  কোনওটা খুলনা, কোনওটা চলল কুমিল্লা, কোনওটা আবার নোয়াখালি।
এষা গুগল সার্চ করতে করতে বলল, ‘কী পাপা? হাঁ হয়ে গেলে? জানো, মাওয়া হচ্ছে এদেশের সবচেয়ে বড় ফেরি টার্মিনাল। তোমায় আমরাই নিয়ে এলাম।’
শাশ্বত হেসে বলল, ‘সময় থাকলে এখান থেকেই ভেসে পড়তাম। জলপথে দেশটা ঘোরা হয়ে যেত। চলো, আর পারছি না। যা গন্ধ ছেড়েছে, পেটে ছুঁচোয় ডনবৈঠক দিচ্ছে!’
সত্যিই, মাওয়া ঘাটের বিশাল চৌহদ্দিজুড়ে ইলিশের গন্ধ! সার সার টিন চালার হোটেল। নদীর কাঁচা ইলিশ থরে থরে সাজানো। চাক চাক করে কাটা হচ্ছে, বড় বড় চাটুর ওপর তেলে সাঁতলানো হচ্ছে। সে যে কী লোভনীয় দৃশ্য, বলে বোঝানো যাবে না।
চুন্নু আমাদের নিয়ে গেল ওর পরিচিত এক হোটেলে। বলল, ‘মিয়াঁভাই, ইনারা আমার মালিকের দোস্ত। ইন্ডিয়া থেকে আইছেন। আমাগো মেহমান। ঠিকঠাক মাছ দিয়, নয়তো মান থাকব না।... বয়েন, বয়েন।’
এষাকে পাগল-পাগল দেখাচ্ছে! চোখ–মুখ বলে দিচ্ছে, ও এখন ইলিশ দুনিয়ার বাসিন্দা। বলছে, ‘যা যা আছে, সব দাও। আমি ইলিশ ভাজা, ভর্তা, তেল, ঝাল, ডিমভাজা সব খাব।’
‘আরে,  একসঙ্গে সব অর্ডার দিস না এষা। খেতে পারবি না, নষ্ট হবে।’
শাশ্বতর কথায় সে প্রবলবেগে মাথা নাড়ে, ‘পারব। আলবত পারব। পেট ফেটে মরে গেলেও খাব। এ সুযোগ তো বারবার পাব না।...  চাচা, ওইগুলো কী?’
‘সব নদীর মাছ আপা। পাঙ্গাস, কাচকি, টাকি, চিংড়ি।’
‘আমায় সব মাছের ভর্তা একটা করে দাও। আমি টেস্ট করব।’ মেয়েটার সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তারপর?... সে এক আশ্চর্য ঘটনা, এখন ভাবলে স্বপ্ন মনে হয়। একলপ্তে বসে কী করে যে অতগুলো ইলিশ খেলাম, কে জানে। ইলিশ ভাজা আর তার তেলে কাঁচালঙ্কা ডলে গরাস গরাস ভাত, ঘন পেঁয়াজের ডাল দিয়ে ইলিশের ডিম ভাজা, ইলিশের ভর্তা...ইলিশের ঝাল...খেয়েই যাচ্ছিলাম। একেকজন কতগুলো করে ইলিশ যে খেয়েছি, গুনিনি।
হোটেলের জাহিদ, তনভির...ওরা আমাদের আগ্রাসী চেহারা উপভোগ করছিল। মিষ্টি-মিষ্টি হেসে আন্তরিকভাবে বলছিল, ‘ভাল লাগতাছে সার? আর দুইমুঠা ভাত দেই তবে!’
দাম দিতে গিয়ে ফের তাজ্জব। এত কিছু খাওয়ার পরে বিল হয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র ২৪০০ টাকা। দুবার জিগ্যেস করলাম, কোনও ভুল হচ্ছে না তো! ওরা মাথা নাড়ল।
আর ওদের আপ্যায়ন, আতিথেয়তা আর অমলিন হাসি! তার কি কোনও আলাদা মূল্য হয়?‌‌‌‌

 

ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top