হরিপদ ভৌমিক: দেবী দুর্গা কন্যারূপে আশ্বিনে পিত্রালয়ে আসেন তিন দিনের ছুটিতে। আনন্দ–‌উৎসবের মধ্যে কখন তিনটি দিন যে কীভাবে চলে যায়, কেউ বুঝতেও পারে না। দশমীতে বরণ করে মুখে ‘‌সন্দেশ’‌ দিয়ে মেয়েকে বিদায় দিতে হবে। নীলকণ্ঠ পাখি বুঝে গেল, মা কৈলাসে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন— ফিরে যাওয়ার ‘‌সন্দেশ’‌ নিয়ে সে উড়ে গেল কৈলাসের দিকে। এটাই হল দুর্গাপূজার দশমীর ছবি।
এখানে দুটি ‘‌সন্দেশ’‌ রয়েছে, বরণ শেষে মায়ের মুখে যে ‘‌সন্দেশ’‌টি দেওয়া হয় সেটি মিষ্টি, আর নীলকণ্ঠ পাখি যে ‘‌সন্দেশ’‌ নিয়ে কৈলাসের উদ্দেশে যাত্রা করল সেটি ‘‌সংবাদ’‌। প্রাচীন বাংলায় সংবাদ অর্থে ‘‌সন্দেশ’‌ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। চৈতন্যচরিতামৃতে (‌অন্তলীলা)‌ সংবাদ অর্থে ‘‌সন্দেশ’‌–‌এর ব্যবহার এভাবে এসেছে।
‘‌শ্রীকান্ত আসিয়া গৌড়ে সন্দেশ কহিল।
শুনি ভক্তগণ মনে আনন্দ হইল।।’‌
একই সময়ে একই গ্রন্থে (‌আদিলীলা)‌ মিষ্টান্ন অর্থে সন্দেশ–‌এর ব্যবহার দেখা যায়:‌
‘‌আপনি চন্দন পরি পরেন ফুলমালা।
নৈবেদ্য কাড়িয়া খান সন্দেশ চালু কলা।।’‌
সংবাদের ‘‌সন্দেশ’‌ কীভাবে মিষ্টির সঙ্গে জুড়ে একটি মিষ্টান্ন গোষ্ঠীর নামই হয়ে গেল ‘‌সন্দেশ’‌— তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও আলোচনাই হল না এটা একটা বিস্ময়!‌
ছানা দিয়ে মিষ্টি তৈরির সময় ক্ষীর এবং চিনির সন্দেশেরও প্রচলন ছিল। ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে কবি মুকু্ন্দ মিশ্র ‘বাশুলী মঙ্গল’‌ কাব্য রচনা করেছিলেন। ‘‌কনকার কন্যাজন্মে উৎসব’‌–‌এ চিনির সন্দেশের উল্লেখ রয়েছে:‌
‘‌খিরপুলি দেই রামা করিয়া বিশেষ।
দধি মধু নারিকেল চিনির সন্দেশ।।’‌
এই সময়ে ক্ষীরের সন্দেশও প্রচলিত ছিল:‌
‘‌পাট ভোট নেত লয় ময়মল্ল গন্ডা।
ক্ষীরের সন্দেশ পুলি মধু কাকরন্ডা।।’‌
প্রাচীন বাংলায় চালের গুঁড়ো, বেসন প্রভৃতি দিয়ে মিষ্টি তৈরি করত। ব্রাহ্মণ বাড়ির শুদ্ধ অন্ন ছাড়া অব্রাহ্মণের হাতে তৈরি চালের গুঁড়ো মেশানো মিষ্টিকে অন্নযুক্ত মিষ্টি বলে গণ্য করা হত। তাই উচ্চবর্ণের মানুষ সেই মিষ্টি নিজেরাও খেতেন না, ভগবানের পুজোতেও দিতেন না।
প্রাচীন ভারতে আবার ছানা বা ছানার কোনও মিষ্টি কেউ ব্যবহার করত না, পুজোতেও দিত না— এখনও দেয় না। তখন ‘‌ছানা’‌ নামটিও ছিল না। মহারাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের এক রত্ন অমর সিংহ ‘‌অমরকোষ’‌ নামে একটি অভিধান রচনা করেছিলেন। সেখানে (‌ব্রহ্মবর্গ:‌ ২/‌৫৬)‌ বলা হয়েছে ‘‌উষ্ণ দুধে দধি যোগ করলে তাকে ‘‌আমিক্ষা’‌ বলে। তখন আরও দুটি নাম ছিল। গরম দুধে দই দিলে ধটা কেটে যে সাদা অংশ তৈরি হয় তার নাম ‘‌দধিকুর্চিকা’‌। নষ্ট দুধ অপবিত্র, নষ্ট হওয়া জিনিস খেতে নেই বা ভগবানকেও দিতে নেই।
নষ্ট, ‌কেটে যাওয়া দুধ বাংলায় ‘‌ছানা’‌ নাম পায়। দুধকে ছিন্ন করা হয় বলে ছিন্ন থেকে ছেনা বা ছানা হয়েছে। ছানা নামকরণ নিয়ে আর একটি দেশীয় মত রয়েছে, গরম দুধে দধি সংযোগে যখন জল এবং সাদা সারাংশ আলাদা হয়ে যায়, তখন সাদা সুতির কাপড়ের হালকা টুকরোতে ‘‌ছেনে’‌ জল থেকে সাদা পিণ্ডাকার বস্তুটিকে জলহীন করে বলে এর নাম হয় ‘‌ছেনা’‌ বা ‘‌ছানা’‌।
ছানা মহাপ্রভুর প্রিয় ছিল। তাঁর ভোজন তালিকায় ‘‌ছানা’‌র উল্লেখ বহুবার দেখা গিয়েছে। চৈতন্যচরিতামৃতে (‌‌মধ্যলীলা, তৃতীয়)‌ নানান খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ‘‌নারিকেল শস্য ছানা শর্করা মধুর’‌ রয়েছে। রান্না করা ভোজনের জন্য ছানার মিষ্টি রাধাগোবিন্দকে নিবেদন করে মহাপ্রভুকে দিতেন, তিনি তৃপ্তি সহকারে তা গ্রহণ করতেন।
মহাপ্রভুকে কেন্দ্র করে, গৌড় ভক্তবৃন্দের সৌজন্যে ‘‌ছানা’‌ তুলসী–‌পত্রের মতো পবিত্র জ্ঞান করল সাধারণ মানুষও। ছানা–‌প্রিয় বাঙালি বিশ্বাস করল, ছানার তৈরি মিষ্টি শুদ্ধ ও পবিত্র। নিম্নবর্ণের মানুষের ছোঁয়াতেও তা অপবিত্র হয় না, জনপ্রিয় হয়ে গেল ছানা দিয়ে তৈরি শুকনো মিষ্টি।
মধ্যযুগে বঙ্গদেশে বিবাহ অনুষ্ঠান পাকা করা হত পান–‌সুপারি দিয়ে। সমাজে যিনি প্রথম পান–‌সুপারি পেতেন তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করতেন। বিজয় গুপ্তের পদ্মাপুরাণের সময়েও এমন প্রথা ছিল— ‘‌পান সুপারি বিনে তোমার ছাড়া নাই।’‌ কবিকঙ্কণের ‘‌চণ্ডীমঙ্গল’‌ কাব্যে দেশের অন্যান্য শুভ সংবাদ দিতে চিঠি পাঠানো হত— ‘‌লিখন করিয়া পাঁতি আনাইল বন্ধু জ্ঞাতি/‌দেশে দেশে পাঠাল বার্তন।’‌
পরবর্তীকালে পান–‌সুপারির জায়গায় সন্দেশ নিজগুণে জায়গা পেয়ে গেল। স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন— ‘‌আমরা ছেলেবেলায় দেখেছি.‌.‌.‌ দেশী তুলোট কাগজে শুভ কার্যের চিঠি লাল কালি দিয়ে লেখা হইত এবং কাগজখানি চারদিকে লাল সুতা বেঁধে কিছু মিষ্টির সহিত নাপিতের হাতে যাইত।’‌
এত মানুষ থাকতে শুভকাজের চিঠি নাপিতের হাত দিয়ে পাঠানো হত কেন?‌ প্রাচীন বাংলায় লৌকিক–সাংবাদিকের সম্মান পেত নাপিতরা। দশ গ্রাম ঘুরে এরা কাজ করত, চুল কাটতে কাটতে নাপিতের মুখ থেকে শুনে নিত নানান কথা। এক গ্রামের সংবাদ এদের মুখ দিয়েই পৌঁছে যেত অন্য গ্রামে। বিয়ের শুভ সন্দেশ (‌সংবাদ)‌ চিঠির সঙ্গে শুকনো মিষ্টি ‘‌সন্দেশ’‌ তাদের হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেওয়া হত। এই সংবাদ সূত্রেই শুকনো ছানার মিষ্টিটি নাম পায় ‘‌সন্দেশ’‌।
এই মিষ্টি সন্দেশটি যেত থালায় করে। দেখা যেত রাস্তাতেই থালার সন্দেশ কিছুটা কমে যেত, তাই থালার জায়গায় এল হাঁড়ি। এ প্রসঙ্গে মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছেন— পাছে নাপিত হাঁড়ি থেকে মিষ্টি খেয়ে ফেলে এই জন্য হাঁড়ির মুখে সরাটা উল্টে দিয়ে ময়দা গুলিয়া চারিদিকে লাগাইয়া দেওয়া হইত। তাহাকে ওলপ [‌কুলুপ]‌ দেওয়া বলে ‘‌এই জন্যে মেয়েরা পরস্পর ঠাট্টা করিত। ‘‌ওলো, তুই যে মুখে ওলপ [‌কুলুপ]‌ দিয়েছিস, তোর মুখে রা নাই।’‌
চৈতন্য মহাপ্রভুর সময় থেকে ‘‌সন্দেশ’‌ নামটি মঙ্গলকাব্যের পাতায় পাতায় অনেক উল্লেখ রয়েছে। কবি রূপরাম তাঁর ‘‌ধর্মমঙ্গল’‌–‌এ সাধভক্ষণ অনুষ্ঠানে উল্লেখ রয়েছে এভাবে:‌
‘‌ছয় মাস গত হৈল সাতেতে প্রবেশ।
সাধ করি খায় রানী অপূর্ব সন্দেশ।।’‌
মধ্যযুগে ছানার সন্দেশ ছাড়া আরও দু’‌রকম সন্দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘‌বাশুলী মঙ্গল’‌ কাব্যে (‌১৫৭৭ খ্রিঃ)‌ ক্ষীরের সন্দেশের উল্লেখ দেখা যায়:‌
‘‌পাট ভোট নেত নয় মৃগময় গন্ডা।
ক্ষীরের সন্দেশ চিনি মধু কাকরন্ডা।।’‌
ওই মঙ্গলকাব্যেই পুজোতে দেওয়া চিনির সন্দেশের কথায় লেখা হয়েছে:‌
‘‌ক্ষীরপুলি দেই রামা করিয়া বিশেষ।
দধি মধু নারিকেল চিনির সন্দেশ।।’‌
ইতিহাসের কথা অনেক হল, এবার ‘‌সন্দেশ’‌ নিয়ে কিছু গল্প শোনাব। বাবু–‌কলকাতায় ঠাকুরবাড়ির নববাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্য বাবুদের টেক্কা দিতে একবার সরস্বতী পুজো করলেন, বাবুবাড়ির পুজো, আয়োজনের কোনও ত্রুটি রইল না। অন্য বাবুরা যাতে পুজোর ফুল আর সন্দেশ না পায়, তার জন্য কলকাতার বাজারে যত ফুল ছিল এবং মিষ্টির দোকানে যত সন্দেশ ছিল সব কিনে নিয়ে দোকান ফাঁকা করে রেখেছিলেন। অন্য বাবুদের সম্মান তখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা, কারণটা একালে বসে সেকালকে বোঝা যাবে না, যেতে হবে সেকালে।
আনন্দের শহর কলকাতায় তখন নিত্যনতুন আনন্দ–‌অনুষ্ঠান চাই। নববাবুরা পুজোতে বাই নাচাত, আবার বাবা–‌মায়ের শ্রাদ্ধেও বাই নাচাত। হাজার টাকার নোট দিয়ে কেউ ঘুড়ি বানিয়ে ঘুড়ি ওড়াত, কেউ হাজার টাকার নোট দিয়ে চুরোট বানিয়ে চুরোট খেত। গোলাপ জল দিয়ে তাঁরা জলশৌচ করতেন। নববাবুদের আবার নববিবি রাখতে হত, তা না হলে তাঁদের সম্মান থাকত না। ১৮২৩ খ্রিঃ ‘‌নববাবুবিলাস’‌ গ্রন্থে জানিয়েছেন, ‘‌নববাবুরা প্রায় অনেকেই রাত্রে আপন ২ ভবন পরিত্যাগ পূর্ব্বক বেশ্যাসদনে গমন করিয়া বাস করেন।’‌ বাবুর সৌজন্যে আ–‌ন–‌ন–‌দো–‌বা–‌জা–‌রে (‌বেশ্যালয়ে)‌ ঘরে ঘরে সরস্বতী পুজো হত। ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৮৬৫ সালে ‘‌সমাজ কুচিত্র’‌ নকশায় লিখেছেন— ‘‌কলকাতা শহরের সকলই সৃষ্টিছাড়া। এখানে গৃহবাড়ির চেয়ে বেশ্যাবাড়ির সরস্বতী পুজোর সংখ্যা ও জাঁকজমক শতগুণে অধিক।.‌.‌.‌ পুজোর আগের দিন বিকেলে বাড়ি বাড়ি প্রতিমা সাজানো হচ্ছে দেখে এক নববিবির হঠাৎ পুজো করার কথা মনে পড়লো। সন্ধ্যায় বাবু আসতেই বিবি অভিমান করে পুজোর আয়োজন করার আবদার করেন। বাবুর হাতে নগদ টাকা নেই। কিন্তু মান রাখতে হবে, তাই তিনি তাঁর পিতা–‌মাতার সিন্দুক ভেঙে দু’‌ছড়া চাঁদী কাটা পৈঁছা ও একটা সিন্দুরের চুপড়ি চুরি করে পুজোর ব্যবস্থা করে মান বাঁচান।’‌
‌পুজোর সব আয়োজন হয়ে গেছে, সকালবেলা গাঁদাফুল আর সন্দেশ কিনে বাবু নববিবিদের বাড়িতে যাবেন। তার আগেই এদের টেক্কা দিতে, এবং সম্মান নষ্ট করতে বাজারের সব গাঁদাফুল আর সন্দেশ দেবেন ঠাকুর কিনে নিয়েছিলেন। অন্য নববাবুদের সেদিন কী ধরনের সন্দেশ–‌বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল একবার অনুমান করে নিন।
এবার আরেক ঠাকুরের কথা বলি। অবনীন্দ্রনাথ একবার নাটোরের মহারাজার অতিথি হয়ে সেখানে গিয়েছেন। তাঁর মুখেই শোনা যাক সন্দেশ খাওয়ার গল্প:‌ ‘‌একদিন খেতে খেতে বললুম, কি সন্দেশ খাওয়াচ্ছেন নাটোর, টেবিলে আসতে আসতে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। গরম গরম সন্দেশ খাওয়ান দেখি। বেশ গরম চায়ের সঙ্গে গরম গরম সন্দেশ খাওয়া যাবে। শুনে টেবিলশুদ্ধ সবার হো হো করে হাসি। তক্ষুনি হুকুম হল, খাবার ঘরের দরজার সামনেই হালুইকর বসে গেল। গরম গরম সন্দেশ তৈরি করে দিল ঠিক খাবার সময়ে।’‌
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি হস্তান্তরের পর তিনি বেলঘরিয়ায় গুপ্ত নিবাসে চলে আসেন। ওখানে ভাল মিষ্টি পাওয়া যেত না। ভাল মিষ্টির জন্য পাঠাতে হত পানিহাটি, না হয় শ্যামবাজারে। শেষ বয়সে তাঁর মিষ্টি খাওয়া বারণ হয়ে যায়। তখনকার বিখ্যাত আলোকচিত্রী নীরদ রায় একদিন ছবি তোলার জন্য গুপ্ত নিবাসে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে গিয়ে দেখেন শিল্পী বারান্দায় বসে আছেন। তাঁকে প্রণাম করে প্যাকেটটি তাঁর হাতে দিতেই, জিজ্ঞেস করলেন, ‘‌কী আছে ওতে?‌’‌ নীরদবাবু বললেন, ‘‌নলেন গুড়ের সন্দেশ’‌। অবনীন্দ্রনাথ হাঁক দিয়ে বাড়ির কাজের লোককে ডাকলেন। ভেতর থেকে একটা প্লেট আনতে বললেন, প্লেট এল। অবনীন্দ্রনাথ কয়েকটা সন্দেশ তাতে তুলে নিলেন। টপাটপ করে সন্দেশগুলো খেতে খেতে বললেন, এখানেই ক’‌টা সন্দেশ খেয়ে নিলাম। বাড়ির ভিতরে গেলে আমাকে আর দেবে না।’‌
শ্রীরামকৃষ্ণ ‘‌সন্দেশ’‌ খাওয়ার মধ্য দিয়ে, চলে যাওয়ার ‘‌সন্দেশ’‌ দিয়েছিলেন বলে ঠাকুরের ভাগনে হৃদয় মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন বলে মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছেন এভাবে:‌ ‘‌একদিন নরেন দক্ষিণেশ্বরে গেছে। বিকেলে মামাকে জলখাবার জন্য গুটিকতক সন্দেশ দিয়েছে। মামা কোন জিনিস মাকে নিবেদন না করিয়া খাইতেন না এবং অগ্রভাগও কাহাকে দিতেন না। কিন্তু সেদিন নরেনকে আগে সন্দেশ খাওয়াইয়া পরে তিনি নিজে খাইলেন। এই কাজ দেখে ত আমি চমকে উঠলুম এবং নহবতখানার উপরে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ছিলেন তাঁকে বলিতে তিনিও চমকে উঠলেন। কারণ মামা আগে থেকেই বলেছিলেন, ‘‌দ্যাখ যখন আমি খাবারের আগভাগ অপরকে দিয়ে পরে আমি খাব তখন জানবি যে আমার দেহ আর বেশিদিন থাকবে না।’‌ একথা আমি ও শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী জানতেন তাই আমরা এত চঞ্চল হয়ে পড়লুম, সত্যি সত্যিই তাই হলো।’‌
মনটা ভারী না করে, এবার রবি ঠাকুরের কথা একটু বলে নিচ্ছি, অল্প বয়সে ‘‌সন্দেশ’‌ নিয়ে তাঁর অনবদ্য রচনাটি আবার আপনাদের একবার শুনিয়ে নিতে চাইছি:‌
‘‌আমসত্ত্ব দুধে ফেলি–‌তাহাতে কদলি দলি/‌সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে–‌/‌হাপুস হুপুস শব্দ–‌চারিদিক নিস্তব্ধ/‌পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।’‌
আর একজন বিখ্যাত মানুষের ‘‌সন্দেশ–‌প্রীতি’‌র কথা বলে নেওয়াটা প্রয়োজন রয়েছে। তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশায়, তাঁর সাহিত্যের অধ্যাপক জয়গোপাল তর্করত্ন মহাশয় প্রতি বছর বাড়িতে সরস্বতী পুজো করতেন। পুজোর দিন উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা শিক্ষকের নির্দেশে সংস্কৃত শ্লোক লিখত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লিখতে বললে, তিনি চার লাইনের একটি সংস্কৃত শ্লোক লিখেছিলেন। তার মধ্যে প্রথম দুটি লাইনের মধ্যে সন্দেশ এসেছে এভাবে–‌‘‌লুচি কচুরী মতিচুর শোভিতং/‌জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম।’‌
পুজোর কথাই যখন উঠল, তখন দক্ষিণেশ্বরে মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন ‘‌সন্দেশ’‌ নিয়ে কী অবস্থা হয়েছিল তা একবার ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুনের ‘‌সংবাদ প্রভাকর’‌ পত্রিকা থেকে অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি:‌
‘‌দক্ষিণেশ্বরের নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা
জানবাজার নিবাসিনী পুণ্যশীলা শ্রীমতী রানী রাসমণি জ্যৈষ্ঠ পৌর্ণমাসি তিথিযোগে দক্ষিণেশ্বরের বিচিত্র নবরত্ন ও মন্দিরাদিতে দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন, ঐ দিবস তথায় প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল,.‌.‌.‌ আহারাদির কথা কি বলিব, কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক, পানিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে, এমত জনরব যে ৫০০ মোন সন্দেশ হয়.‌.‌.‌ বাঙ্গালি লোক অনেক গিয়াছিল, তাহারা মিষ্টান্ন প্রভৃতি উপাদেয় দ্রব্যাদি আহারে পরিতৃপ্ত হইয়া.‌.‌.‌ বিদায় হইয়াছে।’‌
কালীপুজোর আগেই তো দুর্গাপুজো, তাই ফিরে যাই দুর্গাপুজোর বিজয়ার দিন।
প্রতি বছরই পুজো শেষে বিজয়া আসে। বিজয়া মানে মন খারাপ, একাল–‌সেকাল বলে কোনও কথা নয়, এ ব্যথা যেন চিরকালের ব্যথা। বিজয়ায় দেবী বিসর্জন নয়, আনন্দ বিসর্জন। সেকালের স্মৃতি একটু শুনি রসরাজ অমৃতলাল বসুর স্মৃতিকথায়, ‘‌বিজয়া দশমীর দিন রাত ১০টা পর্যন্ত কলকাতা বেশ সজাগ ছিল, কিন্তু তারপর শহরটা যেন নিবে গেল। নিজের বাড়ী যেন অন্ধকার আর পুজোবাড়ীর দালাল পানে চাইলে মনে হয় যেন খেতে আসছে। বড় রাস্তায় গ্যাস সে দিন মিট্‌ মিট্‌ করে জ্বলছে, গলির রাস্তার তেলের আলো দেশলাই ধরিয়ে দেখতে হয় জ্বলছে কিনা;‌ কিন্তু এই বিজয়ায়, আজকেও এই বিজয়ায় সকল বয়সের সকল অবস্থার বাঙালীর মনে জগতের সমস্ত জীবের প্রতি সহানুভূতির কি এক পবিত্র ভাব উদয় হয়।
সন্ধ্যার পর থেকে রাত প্রায় ১০টা পর্য্যন্ত খুড়তুতো ভাই, মামাতো ভাই, পিসতুতো ভাই, বাড়ীর জামাই ভাগনে অন্য আত্মীয়কুটুম্ব স্বজন প্রতিবেশী ক্রমাগত আসা–‌যাওয়া নমস্কার কোলাকুলি মিষ্টিমুখ করা চলল্‌।’‌
বিজয়ার মিষ্টিমুখ পুরনো কলকাতায় কিন্তু ছানার ‘‌সন্দেশ’‌ দিয়ে হত না— ‘‌নারকেল ছাপ’‌ দিয়ে হত। মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছেন, ‘‌বিজয়ার দিন নারিকেল ছাবা দেওয়া হইত। বিজয়ার কোলাকুলিতে সন্দেশ বা অন্য কোন খাবর চলিত না।’‌ কিন্তু সংস্কার এমন জিনিস যে, এখন পর্যন্ত নারিকেল ছাবা দেখিলে বিজয়ার রাত্রি মনে পড়ে।’‌
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব পাল্টে যায়, আজ আর নারকেল ছাবা বিজয়ার মিষ্টি হিসেবে কাউকে দেওয়া হয় না, তাই হারিয়ে গেছে সেই বিজয়ার মিষ্টি। যে ছানার সন্দেশ এক সময় বিজয়ার মিষ্টি হিসেবে মান্যতা পায়নি, সেই সন্দেশেই আজ মা দুর্গাকে বরণসময়ে মায়ের মুখমিষ্টি করানো হয়। আসল নীলকণ্ঠ পাখি আজ আর মায়ের মুখের মিষ্টি ‘‌সন্দেশ’‌ দেখে কৈলাসে ‘‌সন্দেশ’‌ দিতে উড়ে যায় না— এটাই সত্য!‌
‌‌‌‌‌‌‌‌মিষ্টি— শুধু মিষ্টান্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আনন্দময় মিষ্টি–‌ভালবাসা। এক সময় গল্পপ্রিয় নাতি–‌নাতনিরা ঠাকুরমা–‌দিদিমার মিষ্টি ভালবাসার সঙ্গে কেমন করে সন্দেশ উপহার পেত, সে কথা লিখেছেন ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ‘‌আপনার মুখ আপনি দেখ’‌ গ্রন্থে— ‘‌নববাবু রাত্রে শোবার সময় প্রাচীনা পিতামহীর নিকট ‘‌ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমি’‌, ‘‌পায়রা রাজা’‌, ‘‌‌সোনার কাঠি রুপার কাঠি’‌ প্রভৃতি গল্প শুনতেন, তাতে সন্দেশ পাইত। আদুরে ছেলে মিষ্টি বড় ভালবাসে, মিষ্টির মতন মিষ্টি হলে মন সন্তুষ্ট হত বলে নববাবুর পিতামহী ফি পয়ারে সন্দেশ প্রাইজ দিতেন। সন্দেশের লোভে তোতা পাখির মতো কতকগুলি পয়ার মুখস্থ করতেন।’‌
একটু অন্যরকম ভালবাসার কথা বলি। ঊর্মিলা দেবী লিখেছেন, তাঁরা একটি দেশীয় মিষ্টি কবিগুরুকে খাওয়ালে, তিনি মুগ্ধ হয়ে তার নাম জানতে চেয়ে যখন শুনলেন এর নাম ‘‌এলোঝোলো’‌, তখন কবি বললেন, ‘‌এই সুন্দর মিষ্টির এই নাম?‌ আমি এর নাম দিলাম ‘‌পরিবন্ধ’‌। — একেই বলে মিষ্টি ভালবাসা!‌
মিষ্টি–‌ভালবাসার আর একটি গল্প শোনাব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্নেহধন্য যোগেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘‌স্মৃতিতে সেকাল’‌–‌এর কথা থেকে—
বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার জীবনের শেষ অবস্থায় চন্দননগরে আসিয়া অবস্থান করিয়াছিলেন।.‌.‌.‌ ‌আমার পিতাঠাকুর একদিন আমাকে সঙ্গে লইয়া গিয়া উক্ত মহাপুরুষের সহিত পরিচিত করিয়া দেন এবং তদবধি আমি প্রায় প্রত্যহই প্রাতে ও বিকেলে তাঁহার নিকট যাইতাম।.‌.‌.‌
সন্দেশ নিয়ে অনেক কথা হল, এবার সন্দেশের একটু বাজার দর শোনাই। কাটোয়াতে হাতে লেখা মহাভারতের তালপাতার পুঁথির মধ্যে ১১৮৭ সালের (‌১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের)‌ দু্র্গাপূজার খরচের একটি ফর্দ পাওয়া যায়, ওই ফর্দ অনুসারে ওই দুর্গাপুজোয় মোট খরচ হয়েছিল ৮০ টাকা ১৪ আনা ২ পাই পয়সা। এর মধ্যে প্রতিমার দাম ৫ টাকা, এক মন ঘি কেনা হয়েছিল ৫ টাকা, ৪ মন ময়দা ২ টাকা ৬ আনা। ক্ষীর কেনা হয় ৫ টাকার, সন্দেশ ৭ টাকার— তবে মিষ্টির ওজনটা লেখা ছিল না।
১২৩০ সালে (‌১৮২৩ খ্রিঃ)‌ কলকাতায় নীলমণি মিত্র স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়িতে যে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে এক মন খাসা সন্দেশ কেনা হয়েছিল ১৫ টাকা দিয়ে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে এক মন সন্দেশ ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হত বলে রসরাজ অমৃতলাল বসু তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন।
যম দত্তের ডায়েরিতে (‌পৃঃ ১০৮)‌‌ যতীন্দ্রমোহন দত্ত মিষ্টির মধ্যে সন্দেশকে সেরার সেরা বলে দাবি করে কী লিখেছেন শুনুন— ‘‌সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মিষ্টান্ন হইতেছে সন্দেশ। শ্রাদ্ধ বাড়িতে কেহ পিণ্ডদানের আগে কিছু খাইতেন না ইহাই ছিল নিয়ম.‌.‌.‌ কিন্তু নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ডাব ও সন্দেশ খাইতেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বিদায়ের সঙ্গে আটটা করিয়া কাঁচাগোল্লা, না [‌দিতে] পারিলে ছানা ও চিনি দেওয়া হইত, মেয়ের বাড়ির খবর আনিতে লোক যাইবে— এক থালা সন্দেশ খোঞ্চেপোষ ঢাকা দিয়া লোক যাইত। তত্ত্বর কথা বাদই দিলাম। বিবাহে সন্দেশ না হইলে প্রায় বিবাহ হইত না। আমার নাতি হইয়াছে, পাড়ায় পাঁচ বাড়িতে সন্দেশ বিলি করা হইল। নাতির অন্নপ্রাশনের ত কথাই নাই। তোমার নাতির ভাতে সন্দেশ খাইব— এটি একটি আদরের আবদার। ছেলে পাশ করিয়াছে সন্দেশ খাওয়াও.‌.‌.‌।’‌
এহেন সন্দেশ আজ কলকাতা ও শহরতলি ও অন্যান্য শহর থেকে উঠিয়া গেল। আমাদের বাঙালীর নিজস্ব কৃষ্টির এক অধ্যায় জোর করিয়া শেষ করা হইল। বাঙালী বাঁচিবে কি করিয়া?‌ চিন্তা করুন আপনারা। আমরা হা সন্দেশ, হে সন্দেশ বলিয়া লেখা শেষ করিলাম।’‌ ‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top