আগস্ট মাসেই দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম এবং প্রয়াণ। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও জীবনীকার গোলাম মুরশিদ ছিলেন শিল্পীর অতি ঘনিষ্ঠজন। তিনি লিখলেন ‘‌দেবব্রত বিশ্বাস: স্বকীয়তা ও অবদান’‌। 

দেবব্রত বিশ্বাস বিখ্যাত গায়ক ছিলেন - এ কথা বলা বাহুল্য, প্রায় অর্থহীন। তিনি রবীন্দ্রনাথের শত শত গান গেয়েছিলেন এবং সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকেই জনপ্রিয়তা দান করেছিলেন - এটুকু বললেও তাঁর সম্পর্কে যথেষ্ট বলা হয় না। শিল্পী হিসেবে তাঁর স্বকীয়তা এবং বাংলা গানে তাঁর অবদান খুঁজতে গেলে আরও গভীরে ডুব দিতে হয়। কারণ বাংলা গানের ভিত্তিভূমি ধরেই তিনি নাড়া দিয়েছিলেন। সজ্ঞানে দিয়েছিলেন কিনা, সঠিক জানি না, কিন্তু দিয়েছিলেন।
বাংলা গানের সঙ্গে হিন্দুস্থানি সঙ্গীত অর্থাৎ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। এ পার্থক্য বোঝানোর জন্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হচ্ছি। তিনি হিন্দুস্থানি ধ্র‍ুপদ ও খেয়ালের উল্লেখ করে বলেছেন যে, সেগুলোর বেশির ভাগই ‘কেবলমাত্র গান, একেবারেই কাব্য নহে। কথাকে সামান্য উপলক্ষ মাত্র করিয়া সুর শুনানোই হিন্দিগানের প্রধান উদ্দেশ্য।’ কিন্তু বাংলা গানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আদৌ সেরকম নয়। তাঁর মতে, ‘বাংলায় সুরের সাহায্য লইয়া কথায় ভাবে শ্রোতাদিগকে মুগ্ধ করাই কবির উদ্দেশ্য।’ এ কেবল তত্ত্বকথা নয়। তিনি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, ‘কবির গান, কীর্তন, রামপ্রসাদী গান, বাউলের গান প্রভৃতি দেখিলেই ইহার প্রমাণ হইবে।’ রবীন্দ্রনাথ এ কথা যখন (১৮৯২) লিখেছেন, তখনও পূর্ববঙ্গের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়নি। নয়তো তাঁর দৃষ্টান্তের ফর্দে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সারি গান, জারি গান ইত্যাদিও জুড়ে দিতে পারতেন। তিনি লিখেছেন, ‘অতএব কাব্যরচনাই বাংলা গানের মুখ্য উদ্দেশ্য, সুরসংযোগ গৌণ।’
এখানে তিনি যা বলেছেন, তাকে তাঁর প্রথম দিকের চিন্তা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ তাঁর পরিণত বয়সেও তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, বাংলা গানে সুরের থেকে কথার প্রাধান্য বেশি। কিন্তু এ ধারণা তিনি কোথায় পেলেন? আমার বিশ্বাস, সতেরো/আঠারো বছর বয়সে তাঁর বিলেত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, গানে কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সুর - এ সম্পর্কে তাঁর চিন্তাকে উসকে দিয়েছিল। বিলেতে থাকাকালে তিনি যেসব ইংরেজি, আইরিশ এবং স্কটিশ গানের প্রেমে পড়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ফোক সং, এক কথায় যাকে বলা যেতে পারে কথাপ্রধান গান। অপেরার গানও তাঁর ভাল লেগেছিল। কিন্তু তাতে অভিনয়ের বদলে সুরের প্রাধান্য দেখে তিনি পিছিয়ে এসেছিলেন। দেশে ফিরে তাই তিনি বাল্মীকি-প্রতিভা রচনা করে তার মধ্যে দিয়ে অপেরার পরিবর্তে তাঁর নিজের আদর্শকে তুলে ধরেন। বাল্মীকি-প্রতিভায় সুর কথার অনুসারী, কথা সুরের অনুসারী নয়।
বস্তুত, বাংলা গানে কথার গুরুত্বের কথা তিনি কেবল বলেনইনি, নিজের গানে বারবার তার প্রমাণও দিয়েছেন। বয়স যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তাঁর গানে সুর ততই সাদামাঠা হয়েছে, ততই বেড়েছে কথার প্রাধান্য। এক কথায়, তাঁর স্বল্পসংখ্যক গান বাদ দিলে বাকি গানগুলো কথাপ্রধান। এবং তাঁর মতে, কেবল তাঁর গানই নয়, সাধারণভাবে তাবৎ বাংলা গানই কথাপ্রধান। কথা বাংলা গানের প্রাণ; তার চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
উনিশ শতকের শুরুতে পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে বাংলা গানের যেসব কথাপ্রধান ধারা প্রচলিত ছিল, তার মধ্যে নিধুবাবু একটা ভিন্ন ধরনের ধারা প্রবর্তন করেন। তিনি তাঁর গানে কথাকে গুরুত্ব দেননি। বরং তাকে গৌণ করে সুরকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনি যে-শতাধিক গান রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে বহু গানই দু-তিন পঙ্‌ক্তির। তবে তিনি বাংলা গানে সাফল্যের সঙ্গে টপ্পা নামে একটা নতুন ঐশ্বর্যমণ্ডিত ধারার পত্তন করতে সমর্থ হলেও, বাংলা গানের চরিত্রকে তিনি বদলে দিতে পারেননি। কীর্তন, কবিগান, বাউল গান, রামপ্রসাদি গান ইত্যাদি যেমন ছিল, তেমনই থেকে যায়। তা ছাড়া, তিনি বিগত হওয়ার পর, উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে ব্রহ্মসঙ্গীত এবং থিয়েটারের গানকে কেন্দ্র করে আমরা আবার কথাপ্রধান গানই পাই। 
বিশেষ করে ১৮৮০-এর দিকে যখন এই কথাপ্রধান ধারার নেতৃত্ব দিতে তরুণ রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে প্রবেশ করেন, সুর-সৈনিকরা তখন পালিয়ে বাঁচেন। বাংলা গান কথাপ্রধান গান হিসেবেই টিকে যায়। কেবল টিকে যায় বললে ভুল হবে, রাবীন্দ্রিক কাব্যগুণ তার অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হল। অতঃপর দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, নজরুল ইসলামই কাব্যপ্রধান গান রচনা করলেন, তাই নয়, বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের গীতিকারেরাও একই আদর্শ অনুসরণ করেন। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত সলিল চৌধুরি, গৌরীপ্রসন্ন, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ যেসব গান রচনা করেন, সেসব গান কাব্যিক গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে প্রমুখের কণ্ঠে এঁদের লেখা যেসব গান হিট গান হিসেবে পরিচিত হয়েছিল, বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেসব গান সুরের থেকেও বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তাদের কথার জন্যে। 
এঁদের অনেক কাল পরের একটা দৃষ্টান্ত দিই। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের একটা গান - ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই’ পশ্চিমা পরিভাষায় যাকে বলা হয় ফোক সং। এ গানটা দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল স্রেফ কথার জন্যে - সুরের জন্যে নয়। তাবৎ বাংলা গানের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত যে মনকে সবচেয়ে বেশি টানে, তার কারণ তাঁর মতো কাব্যিক গান বাংলা ভাষায় আর কেউ লেখেননি। তাই সুরের বিচারে তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও, কথার জোরে এ গান সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় (তাঁর গানের আর-একটা আকর্ষণ ঈশ্বরের প্রতি তাঁর আন্তরিক নিবেদন)।
যে-গানে কথাই গুরুত্বপূর্ণ, সে গানে তাই শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করতে হবে কথা দিয়েই। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বেশির ভাগ গায়ক-গায়িকারা কথার অর্থকে ফুটিয়ে তোলেন না। ইচ্ছে করে তোলেন না, এমন নয়। আসলে পুরোটা গানের অথবা গানের পদগুলোর অর্থ সম্পর্কে অনেক গায়ক-গায়িকা আদৌ সচেতন নন। মনে হয় না, এই শিল্পীরা গানের কথাগুলো সম্পর্কেও খুব যত্নবান - এমনকী, উচ্চারণ সম্পর্কেও। এর ফলে সুর থাকলেও গানের কথাগুলো মারা পড়ে।
একটা গানের দৃষ্টান্ত মনে পড়ছে - মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটা নজরুল-গীতি - ‘আসলো যখন ফুলের ফাগুন’। যেভাবে তিনি গানটা গেয়েছেন, তাতে মনে হতে পারে যে, গানটা বসন্তকে স্বাগত জানানোর গান - আনন্দের গান। অন্তত আমি তা-ই ভাবতাম। কারণ গানটা আমি কোনওদিন পড়ে দেখিনি। তার বহু বছর পরে নিলুফার ইয়াসমিনের কণ্ঠে গানটা শুনি লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে। শুনে প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম যে, গানটা বেদনার। প্রেমিক দুঃখ করে বলছেন যে, যেদিন ফুলের ফাগুন এল, তেমন দিনে বন্ধু কেন বন্ধুজনে ছেড়ে যায়। শুরুটা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘বনে যদি ফুটলো কুসুম নেই কেন সেই পাখি নেই কেন’ গানটার মতো।
আর-একটা গান - জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর গাওয়া - ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়।’ যেভাবে তিনি গেয়েছেন, তা থেকে বোঝা যায় না, গানটা শোকের, না আনন্দের, নাকি ভক্তির, নাকি অন্য কোনও ভাবের। আমি জ্ঞান গোসাঁইয়ের দারুণ ভক্ত। তা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, গানটার অর্থ তিনি বুঝেছিলেন কিনা, সন্দেহ হয়। অপরপক্ষে, নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠে এ গানের পুঞ্জীভূত শোক কান্নার মতো স্বতঃস্ফ‍ূর্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ রকমের শত শত দৃষ্টান্ত দিতে পারি। কিন্তু তার প্রয়োজন নেই। যে-কথাটা আমি বলতে চাই, সে হল: বহু শিল্পী শুদ্ধ সুরে গেয়েও গানের ভুল ব্যাখ্যা দেন। ভুল সুরে গাওয়ার থেকে সেটা কম দোষের নয়। বরং বাংলা গানে বেশি দোষের।
মৃত্যুর ৩৮ বছর পরে আজও দেবব্রত বিশ্বাস খুব জনপ্রিয়। কিন্তু তাঁর গান সম্পর্কে কথা উঠলে, অনেকে নাক কুঞ্চিত করেন - যেন জনপ্রিয়তা গানকে সস্তা করে দেয়। সেই ‘অনেকের’ একজন আমাকে দেবব্রত বিশ্বাসের গান সম্পর্কে অবজ্ঞার ভাব দেখিয়ে বলেছিলেন যে, উনি তো রবীন্দ্রনাথের গান ট্রান্সলেট করে গান। আমার প্রশ্নের উত্তরে ভদ্রলোক বললেন, অনুবাদ করে গান মানে নিজের মতো অর্থ করে গান। আমি বললাম, সে তো ভাল কথা। সত্যি সত্যি দেবব্রত বিশ্বাস গাইবার আগে প্রতিটি গানের অর্থ বোঝার চেষ্টা করতেন। তিনি যে-অর্থ বুঝেছেন, সে অর্থ নির্ভুল না-হতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল: তিনি অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের মতো তার ব্যাখ্যা দিয়ে সে গান পরিবেশন করেন। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন, বাংলা গান কথাপ্রধান গান, দেবব্রত বিশ্বাস যথার্থই সেই কথাপ্রধান গানের মর্যাদা রেখেছেন।
আমরা সচরাচর যে কথা বলি, সে কথার অর্থ প্রকাশ করি কী করে? এর উত্তরে বলতে হয়, কথার অর্থ সব সময়ে সুনির্দিষ্ট নয় - অনেক কথারই একাধিক অর্থ আছে।  ‘‌আমি যাব।’‌ ‘‌আমি যাব?’‌ ‘‌আমি যাব!’‌ এই তিনটে বাক্যই আমি এবং যাব - এই দুটো শব্দ দিয়ে গঠিত। কিন্তু তিনটে বাক্যের অর্থ আলাদা। কেবল তিনটে নয়, সত্যি বলতে কী, বলার ভঙ্গি দিয়ে ‘আমি যাব’ কথাটার হয়তো এক ডজন অথবা তার থেকেও বেশি অর্থ করা যাবে। তদুপরি, একটা কথার শুধু সরাসরি অর্থ নয়, সেই সঙ্গে থাকে তার ভাব, গূঢ় অর্থ, ব্যঞ্জনা। বলার ভঙ্গি এবং প্রসঙ্গ দিয়েও একটা কথার বিশেষ অর্থ বোঝা যায়। একজন গায়ক কোনও একটা গানের কথাগুলোর যে-অর্থ বুঝতে পেরেছেন, সেই অর্থ, গূঢ় অর্থ, ভাব এবং ব্যঞ্জনা প্রকাশ করেন কী কৌশলে? সে কি কেবল কথাগুলো সুর সহযোগে আবৃত্তি করে গেলেই সম্ভব? মোটেই সম্ভব নয়।
অর্থ প্রকাশ করা যায় নানা উপায়ে। তার মধ্যে একটা প্রধান কৌশল হল ছোট–বড় নানা দৈর্ঘ্যের বিরতি, ইংরেজিতে যাকে বলে পজ। অর্থ-যতি ছাড়া বাক্যের অর্থ হয় না, সঠিক অর্থ তো নয়ই। রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে - ‘প্রেম এসেছিলো নিঃশব্দ চরণে।’ তার একটা জায়গায় আছে - ‘সে তখন স্বপ্ন, কায়াবিহীন নিশীথ তিমিরে বিলীন।’ আমি পাঁচজন নাম-করা গায়কের রেকর্ড থেকে এই জায়গাটা তাঁরা কেমন করে গেয়েছেন, তা পরীক্ষা করে দেখেছি। দেখলাম, দেবব্রত বিশ্বাস ছাড়া কেউই ‘স্বপ্ন’ কথাটার পরে কোনও বিরতি দেননি। ফলে অর্থ দাঁড়িয়েছে: ‘সে তখন স্বপ্নকায়াবিহীন।’ অথচ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, প্রেমটা তখন কায়াবিহীন স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। পূর্বোক্ত পাঁচজন শিল্পীর মধ্যে দেবব্রত বিশ্বাসই এই অর্থ করেছিলেন। তাঁর গাওয়া কয়েকশো গান শুনেছি, কোথাও এ রকম যতি-বিভ্রাট লক্ষ্য করিনি। তার কারণ তিনি প্রতিটা গানের সঠিক অর্থ ধরতে চেষ্টা করতেন এবং তিনি যে-অর্থ বুঝেছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেটিই প্রকাশ করেছেন। নিন্দুক যে বলেছেন ‘ট্রান্সলেশন’, আসলে তা ট্রান্সলেশন নয় মোটেই, তা হল যথার্থ ইন্টারপ্রেটেশন।
অর্থের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে ভাব। পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে হলে তাই ভাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন। কিন্তু কজন ‘যূথীবনের দীর্ঘশ্বাসে’ কথাটার সঙ্গে যে-ভাবটি মিশে আছে, সেটি সঠিকভাবে প্রকাশ করেন, অথবা করতে পারেন? দেবব্রত সর্বত্র পেরেছেন কিনা জানি না, কিন্তু তিনি যখন গেয়েছেন, ‘ভাঙলো হাসির বাঁধ ওই ভাঙলো’, ততবারই ‘হাসি’ শব্দটি শুনে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, তিনি প্রতিবারই অভিনয় করে হাসির ভাবটি শ্রোতাদের মনে সঞ্চারিত করেছেন। বা তিনি যখন গেয়েছেন ‘হা হা হা হা! বালকের দল’(চিত্রাঙ্গদা), তখন কেবল ‘হা হা হা হা’ গাইবার সময় সত্যি সত্যি হাসি ফুটিয়ে তোলেননি, বরং সেই সঙ্গে বালক দলের প্রতি তাচ্ছিল্যের ভাবও ফুটিয়ে তুলেছেন।
বস্তুত, গানের ভাব প্রকাশের জন্যে সুরকার যেমন সপ্তস্বর (কড়ি ও কোমল ভেদে বারোটি স্বর) ব্যবহার করেন, তেমনি ব্যবহার করেন অন্যান্য সাঙ্গীতিক হাতিয়ার (টুল) - যেমন, বিভিন্ন ধরনের তান, মিড়, গমক, তাল, লয় ইত্যাদি। কিন্তু এতগুলো কৌশল ব্যবহার করা সত্ত্বেও গায়কের কণ্ঠে গানের সত্যিকার ভাবটি প্রকাশ নাও পেতে পারে, বরং গানটাকে শোনাতে পারে প্রাণহীন।
যাতে প্রাণহীন না-শোনায়, তার জন্যে গায়ককে অবশ্যই ব্যবহার করতে হয় যথাযথ প্রকাশ-ভঙ্গি। সেই প্রকাশ-ভঙ্গির মাধ্যমেই গানের প্রাণহীন কথাগুলোতে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, গানের অর্থ এবং ভাব যথাযথভাবে ফুটে ওঠে। বহু গায়ক-গায়িকা আছেন, যাঁরা গানে সঠিক প্রকাশ-ভঙ্গি প্রয়োগ করেন না, এমনকী, সে সম্পর্কে সচেতনও থাকেন না। ফলে তাঁদের গানকে মনে হয় স্বরলিপি আবৃত্তি করার মতো। অপরপক্ষে, দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর প্রতিটি গানে যথাযথ প্রকাশ-ভঙ্গি প্রয়োগ করতেন। কিন্তু সবাই এই প্রকাশ-ভঙ্গির প্রশংসা করতে পারেননি। যেমন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের শুদ্ধতা রক্ষা করার দায়িত্বে নিয়োজিত বিশ্বভারতীর সঙ্গীত পর্ষদের সদস্যরা তাঁর কণ্ঠে ‘মেঘ বলেছে যাব, যাব’ শুনে চমকে উঠেছিলেন। তাঁরা তাঁর প্রকাশ-ভঙ্গিকে অতিনাটকীয় বলে সমালোচনা করেন এবং অনুমোদন না-দিয়েই গানটি রেকর্ড কোম্পানির কাছে ফেরত পাঠান।
রবীন্দ্রনাথ একাধিক জায়গায় লিখেছেন যে, তাল হল ভাব প্রকাশের একটা অন্তরায়। তাল যেমন সুরকে নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি গানের ভাবকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে। বাল্মীকি-প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেছেন যে, এই গীতিনাট্য রচনাকালে জ্যোতিদাদাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মাত্রাগুলোকে কখনও চটুল, কখনও বা মন্থর করেছেন - ইউরোপীয় সঙ্গীতের মতো। তিনি সেই সঙ্গে এ-ও উল্লেখ করেছেন যে, একই তালের মধ্যে মাত্রাগুলোকে সময়ের মাপে কখনও লম্বা অথবা কখনও খাটো করা, এবং তাদের লয়ে হেরফের করা ভারতীয় সঙ্গীতে চলে না। কিন্তু গানের ভাব প্রকাশে তার প্রয়োজন হয় বইকি! গানের গমন-ভঙ্গিতে এই স্বাধীনতা বাঞ্ছনীয় বলে রবীন্দ্রনাথ ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাল্মীকি-প্রতিভায় তিনি সাফল্যের সঙ্গে এই পরীক্ষা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের এ কথা পড়ার পর দেবব্রত বিশ্বাস তালের প্রতিটি অঙ্গ অথবা পর্বের অন্তর্গত মাত্রাগুলোতে এই ফ্ল‍ুইডিটি বা তারল্য নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা আরম্ভ করেছিলেন কিনা, তিনি কোথাও লেখেননি। কিন্তু একটা অঙ্গে অথবা পর্বে যে-মাত্রা কয়টি থাকে, তিনি তার মধ্যে একটা তরলতা অথবা প্রবহমানতা এনেছিলেন। ফলে এক অঙ্গ/পর্বের, ধরা যাক, চার মাত্রায় যে-কথাগুলো আছে, তাদের একেবারে সমান সমান (১+১+১+১) বিভাজন করেননি, বরং সেই কথাগুলোকে কোথাও টেনে লম্বা করেছেন, অথবা ঠেসে খাটো করেছেন (যেমন, দেড়+আধ+দেড়+আধ = চার মাত্রা)। এ রকম বিন্যাসে তিনি অবশ্য শেষ পর্যন্ত চার মাত্রার হিসেব ঠিক রেখেছেন।
স্বাভাবিক কথাবার্তা বলার সময়ে অথবা অভিনয় করার সময়ে মানুষ প্রতিটি ধ্বনি অথবা প্রতিটি সিলাবল সমান মাপে উচ্চারণ করে না। বরং ভাব এবং অর্থ অনুযায়ী একটা বাক্যের বা বাক্যাংশের কতগুলো ধ্বনিকে দ্র‍ুত গতিতে, কতগুলোকে ধীরগতিতে উচ্চারণ করে। যেমন, আ মি কি- এ- ক থা- ক খ ন ও- ব লে- ছি-?  - এই বাক্যাংশের ধ্বনি কয়টি অর্থ অনুযায়ী সময়ের মাপে নানা রকমের বিন্যাসে উচ্চারণ করা যেতে পারে। কিন্তু অর্থ যাই করতে চাই না কেন ‘আ মি কি ক খ ন ও ব লে ছি’ অক্ষর (সিলাবল) গুলোকে সমান সমান মাত্রায় উচ্চারণ করব না। কারণ তা হলে সেটা হাস্যরসের খোরাক হবে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ছন্দ নিয়ে এবং গানে তাল নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছেন। এমনকী, নতুন নতুন ছন্দ এবং তাল তৈরিও করছেন। বিশেষ করে তাঁর নিজের কবিতার ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে নতুন তাল উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু তালের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালবাসা ছিল না। তিনি যদি পারতেন, তা হলে তাঁর বহু গান তিনি ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’র মতো তাল-ছাড়া অথবা ‘তাল-ভাঙা তালে’ গাইতেন। তাতে সে গানের ভাব শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার অর্থ বোঝা সহজ হত। কিন্তু তিনি সাহসী হলেও, ভারতীয় সঙ্গীতের মূল রীতি অথবা নিয়মকে ভাঙার মতো অ্যাডভেঞ্চার করতে সাহস পাননি। তবে, আমার ধারণা, তিনি সাহস পেলে তাঁর পরীক্ষা হয়তো সফলই হত, মিসঅ্যাডভেঞ্চার হত না। দেবব্রত বিশ্বাসের সবচেয়ে সাহসী পরীক্ষা–নিরীক্ষা এই মাত্রা-বিন্যাসে। শিল্পী হিসেবে বাংলা গানে একমাত্র তিনিই এই পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছিলেন। তাঁর সমালোচকরাও এটার নিন্দাতেই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ।
বাংলা গানে তিনি আর-একটা অবদান রেখেছিলেন তাঁর কণ্ঠ দিয়ে। তবে সে কৃতিত্ব তাঁর একার নয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অন্তত আরও দুজন শিল্পী - পঙ্কজ মল্লিক আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। (সম্ভবত সায়গলও।) তাঁদের আগে পর্যন্ত বাংলা গানে হালকা গলাকেই গানের গলা বলে বিবেচনা করা হত। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুল, দিনেন্দ্রনাথ প্রমুখের গলা শুনলেই আমার কথার যথার্থতা বোঝা যাবে। ১৯২০ এবং ’‌৩০-এর দশকে গাওয়া যেসব শিল্পীর রেকর্ড পাওয়া যায়, তাঁদের সম্পর্কেও এ মন্তব্য প্রযোজ্য। কিন্তু তুলনামূলকভাবে ভারী গলার প্রবর্তন করলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। তাঁর কয়েক বছর পরে আসরে নামলেন পঙ্কজ মল্লিক আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁদের পর-পরই দেবব্রত বিশ্বাস। এঁরা তিনজন ছিলেন সত্যিকার ডিপ ভয়েস অথবা ভারী গলার অধিকারী। এঁরা তিনজন মিলে মোটা গলাকে কেবল গ্রহণযোগ্য করলেন না, বরং গানের গলা হিসেবে হালকা গলাকে অচল করে দিলেন এবং ভারী গলাকেই গানের জন্যে স্ট্যান্ডার্ড গলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। দেবব্রত বিশ্বাস মারা গেছেন ৩৮ বছর আগে, কিন্তু তাঁর গলা, তাঁর গাইবার ভঙ্গি, তাঁর প্রকাশ-ভঙ্গি, সঠিক ও স্পষ্ট উচ্চারণ এবং গলার কুশলী ও বিচিত্র ব্যবহার তাঁকে আজও অমর করে রেখেছে।‌‌ ■

 

দুই কিংবদন্তি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রয়াত ডাক্তার অমর সান্যাল ও প্রয়াত ভাইডু সান্যালের বালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়েছিলেন দুই শিল্পী। ১৯৫৭ সালের কোনও এক সময়। এই ছবিটি বাড়ির রোলিকর্ড ক্যামেরায় তোলা হয়। সেদিন দুজনে অনেক একক গান গেয়েছিলেন। দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছিলেন ‘‌এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না’। রিভক্স‌ স্পুল টেপে সেইসব গান রেকর্ড করা হয়েছিল। সান্যালবাড়ি থেকে সেইসব গান ও এই ছবিটি দেবব্রত বিশ্বাস স্মরণ কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই কমিটির সৌজন্যেই আজ ছবিটি প্রকাশিত হল।

জনপ্রিয়

Back To Top