ক্যান্সার মানেই কি শেষ?‌ একেবারেই নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগোচ্ছে। পৃথিবীর বহু মানুষ এই মারণরোগকে জয় করেছেন। মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের লড়াই চলছে বিজ্ঞানের হাত ধরে। লিখলেন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অরুণাভ সেনগুপ্ত 

অচেনা সেতুবন্ধ
অফিসেই মায়ের ফোনটা এল, বাবার বায়োপ্সির ফল ক্যান্সারই। এত দূরে অন্য শহরে বসে কী করবে অদিতি গুগলে ডুব দেওয়া ছাড়া! পরের কদিন ব্যাপারটা ক্রমশ গুলোতে থাকে। কী চিকিৎসা, কোথায় চিকিৎসা, কত খরচ, বাবা ভাল হবে?  আত্মীয়দের নানা মত। বড় পিসি রেগে অস্থির, ‘‌জানিস না, বায়োপ্সিতে ক্যান্সার  ছড়িয়ে যায়! তোর মায়ের যেমন বুদ্ধি!’‌ নেট–‌দুনিয়ার সংখ্যাতত্ত্বের শতকরা হিসেবে  ঠিক তার বাবার কী হবে, তার জবাব মেলে না। ক্যান্সার ধরা পড়েছে হারান মণ্ডলের স্ত্রীরও, শহরের হাসপাতালে চিকিৎসা জরুরি। হতবুদ্ধি হারানের মুশকিল আসান হয়ে আসে চেন্নাই থেকে ‘গ্রান্টি’ দিয়ে রুগি ভাল–‌করে–‌আনা মকবুল। জমি বিক্রি, টাকাপয়সা সামলানো সবই করে সে, কিন্তু চেন্নাই গিয়ে আতান্তরে পড়ে হারান, যখন শোনে এক সফরে হবে না, যেতে হবে বারে বারে। মস্ত চাকুরে মিঃ রায় আবার খালি ডাক্তারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নন। বাড়তি বিমা হিসেবে যোগ করে নেন ভিয়েতনামি  সন্ন্যাসীদের গুপ্তজ্ঞানের নিদান। সিয়াটল থেকে ব্লগ লেখে রবিনা, মায়ের মতো একই অসুখে ভোগা অন্য রুগিদের মতামত চেয়ে।  মায়ের ডাক্তারের ব্যবস্থা তার মনঃপূত নয়।  
ছবিগুলো কাল্পনিক নয়। প্রতিনিয়ত ঘটা বাস্তব। এমনি রোগ ক্যান্সার, ধনী–‌দরিদ্র, দেশ–‌সমাজ নির্বিশেষে প্রথম ধাক্কায় সবাইকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক অজানা সেতুবন্ধের সামনে। অনিশ্চয়তা আর অজ্ঞানতার অন্ধকারে যার ওপারে দৃষ্টি চলে না সাধারণ মানুষের, এমনকী আধুনিক চিকিৎসা–বিজ্ঞানও সর্বত্র আলো ফেলতে অপারগ। তবে ছবিটা ক্রমশই পরিষ্কার হচ্ছে। এই মারণরোগ জয়ী মানুষের সংখ্যা এখন আমাদের চারপাশেই প্রচুর। 
কয়েকটি আপ্তবাক্য
আগের বাক্যটা আসলে বলতে হবে অন্যভাবে। সেটা হল, ‘সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে’ চিকিৎসা করিয়ে এই মারণরোগ জয়ী মানুষের সংখ্যা এখন আমাদের চারপাশেই প্রচুর। ওই দুটোই মোদ্দা কথা।‌ ‘‌সঠিক সময়’‌ আর ‘সঠিক পদ্ধতি’। ক্যান্সার চিকিৎসার আপ্তবাক্য। তবে এ চিকিৎসার আকার–‌প্রকার বুঝতে, জানতে হবে আরও কিছু আপ্তবাক্য। যেমন, ‘‌ক্যান্সার একটিমাত্র রোগ নয়। শরীরের এক–‌এক অঙ্গে এর এক এক রূপ, এক এক রকম উপস্থাপনা, চলন, বৃদ্ধি।’‌ সাধারণ গুনতিতেই প্রায় ২০০  রকমফেরের ক্যান্সারের কেউ সহজেই সারে, কেউ সারে না। রুগির শরীরের নিজস্বতাও এর চলন পাল্টায়। অতসী মামির স্তনের ক্যান্সার, জুবেদা বিবির স্তনের ক্যান্সার থেকে চরিত্রে এবং চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনেকটাই আলাদা হতে পারে। তাই, দ্বিতীয় আপ্তবাক্য, খুব জরুরি চটজলদি বায়োপ্সি বা ক্যান্সারটির কিছু কোষ সংগ্রহ করে তাদের আণুবীক্ষণিক পরীক্ষা। খালি ক্যান্সার নয়, এর রোজানা বিস্তর ব্যবহার হয় নানা রোগে। গ্রাম, গাঁতি, গোত্র, রংঢং না চেনা ইস্তক ঠিকই করা যাবে না তাকে শায়েস্তা করার উপায়। তিন নম্বর, ক্যান্সার চিকিৎসা সাধারণত এককালীন বা একমাত্রিক নয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পরও দরকার সহ–‌চিকিৎসা এবং নিয়মিত যাচাইয়ের। এ ব্যাপারটা না জানায় আতান্তরে পড়েন হারান মণ্ডলরা। নিঃসন্দেহে অস্মদেশীয় অবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও আর্থ–‌সামাজিক পরিস্থিতি, ক্যান্সার চিকিৎসার বেলাগাম খরচ একটা দিক তবে এ লেখাটার দৃষ্টিকোণ ডাক্তারির, শুধুই অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সচরাচর হওয়া ক্যান্সার বা ‘সলিড টিউমারদের’ বুনিয়াদি চিকিৎসার কায়দাকানুন। সব নিত্যনতুন উদ্ভাবনের খতিয়ান পেশ করা ঝকমারি, যেমন মুশকিল লিকুইড টিউমার লিউকোমিয়া ইত্যাদির খটমট চিকিৎসার স্বল্পকথায় বর্ণনা।  
কেটে, পুড়িয়ে, বিষ প্রয়োগে
চতুর্দশ শতাব্দীতক গ্রিক-রোমান, ইসলামিক, আয়ুর্বেদ সব শাস্ত্রেই মানব শব–ব্যবচ্ছেদ নিষিদ্ধ থাকায় জানা ছিল না শরীরের ভিতরের বিন্যাস ও বিভিন্ন অঙ্গের ক্রিয়াশীল সম্পর্ক, ফলে ক্যান্সারের গতিপ্রকৃতি বুঝতে না–‌পারা প্রাচীন চিকিৎসকেরা একে এক রহস্যময় মারণরোগ হিসেবে এড়িয়ে চলতেন। রেনেসাঁ–উত্তর তিন–চারশো বছরে ইউরোপীয় শারীরবিদদের গবেষণা আর অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার জন্ম দিল রোগ–‌বিদ্যার, কোষকলা পরীক্ষা করে রোগের প্রসার–‌পথ চিনতে পারার জ্ঞান।

অনেক ক্যান্সার রুগির পর্যবেক্ষণ–‌ব্যবচ্ছেদ করে শল্য চিকিৎসক আর শারীরবিদরা এক তত্ত্ব ঠাওরালেন— ‘শরীরের এক জায়গায় শুরু হওয়া ক্যান্সার কোষগুলি কেন্দ্রাতিগ বলের মতো বৃত্তাকারে পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে, প্রথমে নিকটস্থ লসিকা গ্রন্থিতে, ক্রমশ দূরে, আর শেষে রক্তবাহিত হয়ে উৎপত্তিস্থল থেকে দূরে হয় তাদের স্থানান্তরণ বা ‘মেটাস্টাসিস’।  এই তত্ত্বকে ভিত্তি করে শল্যবিদরা সিদ্ধান্ত করলেন ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের সঙ্গে চারপাশের কোষকলাসমূহ ও আঞ্চলিক লসিকা গ্রন্থিগুলোকে সমূলে বাদ দিলে ক্যান্সারের নিরাময় সম্ভব। অজ্ঞান করার পদ্ধতির আবিষ্কার আর জীবাণুক্রিয়া নিরোধক ধ্যানধারণার প্রচলন শল্যচিকিৎসাকে কিছুটা নিরাপদ করায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে আরম্ভ হল ‘‌র‌্যাডিক্যাল অপারেশন’— ক্যান্সার আক্রান্ত অঙ্গের সঙ্গে তার চারপাশের কোষকলা ও লসিকা গ্রন্থিদেরও  বাদ দেওয়া। কিন্তু চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করলেন, অস্ত্রোপচার সফল হলেও তো সর্বদা রোগমুক্তি হচ্ছে না! চিকিৎসিত রুগিদের তথ্য বিচার করে চিকিৎসকেরা বুঝলেন, রোগমুক্তি  নির্ভর করে কী অবস্থায় অস্ত্রোপচার হচ্ছে তার ওপর। অতএব দরকার হল ক্যান্সারকে তার পরিমাপ ও বিস্তারের পরিসর অনুযায়ী  বিভিন্ন পর্যায়ে বা স্টেজে ভাগ করার— প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, ও চতুর্থ। শল্যবিদদের চেষ্টা থাকত প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ অসুখটা  ছড়িয়ে পড়ার আগেই ব্যাপক অস্ত্রোপচারে  রোগের মূলোৎপাটন করা। তার অবশ্য পালনীয় শর্ত, ক্যান্সারটিকে না ছুঁয়ে নিরাপদ দূরত্বে অস্ত্রচালনা, যাতে কর্তিত কিনারাগুলো ক্যান্সার কোষমুক্ত থাকে। তত্ত্বটা যে জোরদার ছিল তার প্রমাণ, একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পদ্ধতি অগুনতি রুগিকে ভাল করেছে, এখনও করছে। বর্তমান ক্যান্সার শল্য চিকিৎসার উদ্দেশ্য সেই মূল নীতিকে ব্যাহত না করেও যথাসম্ভব কম অঙ্গহানি করে শারীরিক সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক ক্রিয়াকে অক্ষুণ্ণ রাখা। তা সফল হয়েছে নানা নতুন পদ্ধতি আর যন্ত্রের আবিষ্কার ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসার উন্নতিতে। খালি প্রস্ফুটিত ক্যান্সার নয়, যাদের সম্ভাব্য পরিণতি ক্যান্সার এমন কিছু জানা অস্বাভাবিক অবস্থা যুক্ত শরীরাংশকেও আগেই ছেঁটে ফেলে শল্যচিকিৎসা ক্যান্সার রোধ করে।  
১৮৯৫–তে রন্টজেন আবিষ্কৃত অদৃশ্য রশ্মি  এক্স–‌রে আর তার কবছর বাদেই হেনরি বেকারেল ও কুরি দম্পতির আবিষ্কৃত তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জীবকোষের ওপর অনিষ্টকর প্রভাব দেখে শুরু হল এদের সাহায্যে ক্যান্সারের কোষগুলোকে নষ্ট করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা। বিপত্তি দেখা গেল মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, শুধু ক্যান্সার  কোষই না, অদৃশ্য শক্তির বিচ্ছুরণ নষ্ট করে সংলগ্ন অন্যান্য কোষকলাও। দৈনন্দিন চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বা এক্স–রের নিহিত শক্তির সঠিক ও নিরাপদ প্রয়োগের জন্য তাই দরকার এমন উৎস ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার যাতে বিচ্ছুরণের তীব্রতা, মাত্রা, বিস্তৃতি এবং অভিক্ষেপণ নিয়ন্ত্রণ করে সংলগ্ন সুস্থ অংশের ন্যূনতম ক্ষতি করে শুধুমাত্র ক্যান্সার কোষগুলোকেই মারা যাবে। সে প্রয়োজন বহুদিন কোবাল্ট ৬০ যন্ত্র কিছুমাত্রায় মেটালেও এখন আরও উন্নত লাইনাক যন্ত্র ব্যবহার করে প্রথাগত রশ্মি চিকিৎসার সঙ্গে যোগ করা যায় নানান কায়দা, যেমন টিউমারের আকৃতি অনুযায়ী বিচ্ছুরণ (কনফর্মাল রেডিয়েশন থেরাপি); বিভিন্ন তীব্রতার নিয়ন্ত্রণী বিচ্ছুরণ (ইন্টেন্সিটি মডুলেটিং রেডিয়েশন থেরাপি) বা যান্ত্রিক প্রতিচ্ছবি নিয়ন্ত্রিত বিচ্ছুরণ (ইমেজ গাইডেড রেডিয়েশন থেরাপি)। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সব পদ্ধতিতেই নিয়ম বিকিরণের সমগ্র পরিমাণকে দৈনিক স্বল্পমাত্রায় দু–‌চার সপ্তাহ ধরে ভাগ করে দেওয়া। সাধারণভাবে বিকিরণের উৎসটি শরীরের বাইরে থাকলেও (টেলিথেরাপি) দু–একটি ক্ষেত্রে, যেমন জরায়ুর ক্যান্সার, তা শরীরের ভিতরে রাখা হয় (ব্রাকিথেরাপি)। সর্বাধুনিক ব্যবস্থা সাধারণ রশ্মির ফোটন বা আলোককণার বদলে পরমাণুর অন্তঃস্থিত প্রোটনকণার ব্যবহার। আরও নিরাপদ এবং ফলপ্রসূ তবে অত্যধিক ব্যয়সাপেক্ষ, ভারতে সবে দু–একটি হাসপাতালে চালু হচ্ছে।
শল্যচিকিৎসা বা রশ্মিচিকিৎসা শুধুমাত্র স্থানীয় ভাবে কার্যকর। ভ্রাম্যমাণ রক্তবাহিত ক্যান্সার কোষগুলোকে মারার উপায় ভেষজ বা রাসায়নিক চিকিৎসা। বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত নাইট্রোজেন মাস্টারড গ্যাসের শরীরের রক্তকণিকাদের নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা লক্ষ্য করে ১৯৪৫ নাগাদ শুরু হল লিম্ফোমা, লিউকোমিয়া ইত্যাদির রাসায়নিক চিকিৎসা, যার সুফলে উৎসাহিত হয়ে বিজ্ঞানীরা খুঁজে বার করলেন আরও নানা শ্রেণির রাসায়নিক যৌগ যারা ক্যান্সার কোষগুলির দ্রুত বিভাজন ও গঠনের চলমান চক্রকে নানা পর্যায়ে থামাতে পারে।

কিন্তু রাসায়নিক ওষুধ আক্রমণ করে সুস্থ কোষকলাকেও, বিশেষত রক্তমজ্জা ও অন্ত্রের দ্রুত বিভাজমান কোষেদের, যার ফল মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তা এড়াতে বহু গবেষণার পর প্রতিটি ওষুধের জন্য নির্ধারিত হয়েছে সর্বোত্তম মাত্রা ও প্রয়োগবিধি আর শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে দেওয়ার জন্য দুই প্রয়োগের মাঝে বিরতির সময়। তৈরি হয়েছে প্রতিটি ক্যান্সারের জন্য আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংস্থাগুলির অনুমোদিত নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপত্র। একেবারে দিনক্ষণ–মাত্রা মেপে তা সর্বদেশে চিকিৎসকেরা পালন করেন, অন্যথা শুধু  রুগির শারীরিক ও আর্থিক অবস্থার বিচারে কিছু পরিমার্জন। রক্তমজ্জাজনিত ক্যান্সার ও শিশুদের ক্যান্সারে প্রধান অবলম্বনই ভেষজ চিকিৎসা, যদিও খুবই কষ্টকর আর লম্বা সে চিকিৎসা। বাড়াবাড়ি অসুখে বেশি মাত্রায় ওষুধ দেওয়ার একটা জটিল পদ্ধতি হল ভেষজ চিকিৎসার আগে রুগির মজ্জা নিষ্কাশন করে তা হিমায়িত করে রাখা আর ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় রুগির মজ্জায় রক্ত তৈরির উপাদানগুলি নষ্ট হয়ে গেলে ওই জিয়ান মজ্জার আবার প্রতিস্থাপন। রক্তমজ্জার ক্যান্সারে এ চিকিৎসা জীবনদায়ী হলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্যান্সারে মজ্জা প্রতিস্থাপনের অভিজ্ঞতা এখনও তত উৎসাহজনক নয়। 
আরেক উপায় জৈবিক চিকিৎসা বা লক্ষ্যভেদী ওষুধের ব্যবহার— রুগির ক্যান্সার কোষগুলিকে বিশ্লেষণ করে তাদের বংশবৃদ্ধির সহায়ক প্রক্রিয়া বা সঙ্কেত ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অন্তর্ঘাত। স্তন, ফুসফুস ইত্যাদি কয়েকটি ক্যান্সারে ও রাসায়নিক চিকিৎসায় অপ্রভাবিত কিছু ক্যান্সারে এটি একটি চালু চিকিৎসা। সুবিধে হল, এদের অনেকগুলি ওষুধই ট্যাবলেট আকারে, সহজসেব্য, মুশকিল নাগাল ছাড়ানো দাম আর অনেকদিন খেতে হয়। সম্ভাবনা জাগানো নতুন রাস্তা হল শরীরের প্রতিরোধশক্তির শক্তিবর্ধন। ক্যান্সারের উৎপত্তির মূল হল মানব–‌দেহকোষের বিভাজনের নির্দেশবাহী জিনগুলির কোনটির মিউটেশন বা বিকার, তাদের নানা পথে কিছু কোষকে অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের সঙ্কেত পাঠানোর ক্ষমতা–অর্জন, আর ক্যান্সার কোষগুলিকে শরীরের অতি বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা— খোঁজো এবং মারো— থেকে লুকিয়ে রাখা। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাবৃদ্ধি করে লুকিয়ে থাকা ক্যান্সার কোষগুলিকে অকেজো করে দেওয়ার এ রকম একটি চিকিৎসায় ভয়াবহ মেলানকার্সিনমার চতুর্থ পর্যায়ে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছেন প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার।
বহুমাত্রিক চিকিৎসা
কেটে, পুড়িয়ে, অথবা বিষপ্রয়োগে—  এই তিন উপায়ের কোনটি অথবা সব কটাই লাগু হবে, তা নির্ধারণের ভিত্তি হচ্ছে বায়োপ্সি করে রোগচরিত্র নির্ণয় আর রুগিকে দৈহিক পরীক্ষা করে ও খুঁটিয়ে ছবি তুলে রোগের প্রসারের পরিমাণ মাপা বা স্টেজ ঠিক করা। এটা করতে  ব্যবহার হয় TNM পরিমাপ ব্যবস্থা (T–‌ টিউমারের মাপ, N–‌ রোগগ্রস্ত নোডের বর্ণনা,  M–‌ মেটাস্টাসিস আছে কিনা)। মানদণ্ড প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা। Breast- T3aN2bM0 লিখলে বিশ্বের যে কোনও চিকিৎসক বুঝে যাবেন, মূল টিউমার কত বড়, কটা নোড আক্রান্ত, মূল টিউমার থেকে স্থানান্তরণ হয়েছে কিনা, রোগটা কোন পর্যায়ের বা কতটা সঙ্কটজনক। প্রথম বিবেচ্য এই TNM পরিমাপ হলেও এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে নানা জৈবাণু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মায় জিনঘটিত গন্ডগোলের পরীক্ষা।  ক্যান্সারটির বিস্তৃতি ও উগ্রতা খতিয়ে দেখে ঠিক হয় চিকিৎসার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি। প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ নিরাময়, তৃতীয় পর্যায়ে রোগের প্রশমন ও চতুর্থ পর্যায়ে শুধুই রোগযন্ত্রণা ও অন্যান্য অসুবিধের উপশম। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জমাট ক্যান্সারগুলির ক্ষেত্রে আসল হিসেব হয় শল্য–চিকিৎসায় বাদ দেওয়া অংশের বিস্তারিত বায়োপ্সির পরে। সে হিসেব অনুযায়ী ঠিক হয় অস্ত্রোপচারের পর অন্য সহায়ক চিকিৎসার— রশ্মি, রাসায়নিক, বা জৈবিক, প্রয়োজন ও পরিমাণ। উল্টো কৌশলও নেওয়া হয় কিছু ক্ষেত্রে। প্রথমে রশ্মি বা রাসায়নিকের পূর্বচিকিৎসায় অসুখটাকে আয়ত্তে আনা, পরে অস্ত্রোপচার। কখনও রুগির কাছে অগ্রহণীয় অঙ্গহানি এড়াতে, যেমন স্বরযন্ত্র ইত্যাদির ক্যান্সারে, কৌশল হল সীমিত অস্ত্রোপচার করে বা আদৌ না করে শুধু রশ্মি বা ভেষজ চিকিৎসা করা।  
অদিতির বাবা ভাল হবেন? 
ওইটাই মূল প্রশ্ন, কী লাভ হবে হারানের জমি বিক্রি করে? উত্তরটা কিছু শর্তসাপেক্ষ। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যপ্রমাণে ব্যবহার হয় রোগনির্ণয়ের পর পাঁচ বছরের বেশি শতকরা কতজন রোগী ভাল থাকেন তার হিসেব (এঁদের সম্পূর্ণ আরোগ্যের সম্ভাবনা বেশি)। সে হিসেবে দেখা যাচ্ছে, আশির দশকের আগে নির্ণীত শিশুদের ক্যান্সারগুলির শতকরা ৫৮ ভাগ ভাল হত। এখন হয় ৮৩ ভাগ।

ভাল হয়ে যাচ্ছে অনেক রক্তজনিত ক্যান্সার। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সচরাচর ক্যান্সারগুলি, যেমন জরায়ু, স্তন, প্রস্টেট, মূত্রথলি, অণ্ডকোষ, থাইরয়েড, বৃহৎ অন্ত্র, ত্বক ইত্যাদির অনেক ক্যান্সার শতকরা ৮০ থেকে ১০০ ভাগ ভাল করে দেওয়ার মতো বিদ্যা এখন চিকিৎসকদের আয়ত্তে। নতুন পথের সন্ধান বেরোচ্ছে এ তাবৎ নিরাশাজনক অগ্ন্যাশয়, যকৃৎ, ফুসফুসের ক্যান্সারে। তবে দোহারের গানের ধুঁয়ার মতো একটা কথাই বারে বারে ফিরে আসে, ‘‌সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা’‌। সব ক্যান্সারের মোট ৭৫ ভাগ জোগায় এমন ১৮টি ক্যান্সার নিয়ে ৭১টি দেশজোড়া কনকর্ড–‌৩ হিসেব দেখিয়েছে, কীভাবে সহজেই ভাল হয় এমন ক্যান্সারেও সুচিকিৎসার অভাবে মানুষ মারা যায়। একটা তর্কও উঠছে, ধনী দেশগুলিতে ক্যান্সার মৃত্যুর হার এতটা কমার কৃতিত্ব উন্নত চিকিৎসার বেশি, না নানা প্রযুক্তির সাহায্যে প্রাথমিক অবস্থায় রোগনির্ণয়ের। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের আশা শীঘ্রই ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যাবে, বিশেষত মানবদেহে উপস্থিত ২৪০০০ জিনের সফল চিত্রাঙ্কন ও কোন জিনগুলির কী বিকারে কোন ক্যান্সার হয় তা চিহ্নিতকরণের পর।  ইতিমধ্যেই স্তন, ডিম্বাশয়, অন্ত্র, থাইরয়েড, ইত্যাদি ক্যান্সারের কিছু চিহ্নিত জিনবাহী মানুষজন ভেদ্য অঙ্গটিকে বাদ দিয়ে ক্যান্সার হওয়ার আগেই ‘পূর্বমুক্ত’ হচ্ছেন। পরীক্ষা চলছে খারাপ জিনদের খুঁজে মারা আর বিশেষ শিক্ষাপ্রাপ্ত ভাল জিনদের শরীরে পুনঃপ্রবেশ করানোর নানা পদ্ধতি নিয়ে। বলা যায় না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার কোনও অচিন্তনীয় উন্নতি হয়ত এই বিকারগ্রস্ত জিনদের খোঁজা ও তাদের অকেজো করার কাজটা খুব তাড়াতাড়ি নিয়মিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে এনে ফেলবে। রাস্তা দুর্গম হলেও লক্ষ্যে পৌঁছনো ক্যান্সারজয়ী মানুষের সংখ্যা ক্রমশই এতটাই বেশি যে তাঁদের স্বাভাবিক স্বছন্দ জীবনযাত্রায় একীকরণও এখন রাষ্ট্র ও সমাজের একটা বড় কাজ। 
বিকল্প চিকিৎসা
‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ ভাবধারার কিছু লোকেদের ধারণা, বিজ্ঞানলব্ধ চিকিৎসাপন্থার নাগাল সীমায়িত। অতীন্দ্রিয় পথে লব্ধ পন্থার যোগ প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে এবং তা চমৎকারে সক্ষম। তাই হঠাৎ ক্যান্সার রুগিদের ভিড় হয় কাছেই নাকালি গ্রামের মজা ঝিলের পাঁক মাখতে। তাই হলিউডের  হট্টাকট্টা অভিনেতা স্টিভ ম্যাকুইন নিষিদ্ধ  ‘ওষুধ’ লিট্রাইলের খোঁজে গোপনে ঠাঁই গাড়েন মেক্সিকোর এক স্পা’তে। বা স্কুলপালানো হ্যারি হক্সি হন ডালাসে দুনিয়ার বৃহত্তম বেসরকারি ক্যান্সার চিকিৎসা–কেন্দ্র– সহ ১৭টি ক্লিনিকের মালিক। সৌজন্যে তাদের ক্যান্সার চিকিৎসার পারিবারিক গুপ্তবিদ্যার সূত্রপাত। এক পূর্বপুরুষের দৃষ্ট তাঁর ঘোটকটির এক ধরনের লতাপাতা ঘষটে নিজের গোড়ালির ক্যান্সার সারাবার ঘটনা, এ রকম একটি পল্লবিত গল্প–‌গাথা। 
অধুনা ক্যান্সারের সংখ্যা বাড়ায় এ দেশেও অব্যর্থ ক্যান্সার চিকিৎসার হরেক প্রতিষ্ঠান। কারও পুঁজি সন্ন্যাসীদত্ত গুপ্তজ্ঞান, কারও বা আদি–‌শাস্ত্র বা দ্রব্যগুণের অনুপ্রাণিত গবেষণা। এই শহরই এরকম তিনটি গণমাধ্যম তোলপাড় করা আবিষ্কারের সাক্ষী। তর্ক উঠতে পারে, ব্যক্তিগত এষণায় বিকল্পপথে রোগ নিরাময়য়ের উপায় আবিষ্কারে আপত্তি কোথায়? আপত্তি নেই তো, বরং আগ্রহ আছে। বিজ্ঞানের আধুনিক কেন্দ্রগুলিতে বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে প্রচুর চর্চা হয় কিন্তু কোনও চিকিৎসাই এ তাবৎ ধোপে টেকেনি। বাজারে অনেক দাবিদার থাকলেও আয়ুর্বেদ বা হোমিওপ্যাথির কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থাগুলি কিন্তু ক্যান্সার জয়ের গৌরব দাবি করে না।  নানা বাস্তব পরিস্থিতিও অবশ্য অনেকের বিকল্প ব্যবস্থা সন্ধানের কারণ। বিত্তহীনের প্রথাগত চিকিৎসার মূল্য জোগাতে অপারগতা,  বিত্তবানের ‘অধিকন্তু না দোষায়’ ভাবনা, অথবা শেষ মরিয়া চেষ্টা। বিপদটা বিজ্ঞাপনে পথভোলা আমজনতার, এটা–সেটা করে দেখার প্রবণতায় সময় নষ্ট করাতে।
আরেকটি জরুরি কথা
ক্যান্সার চিকিৎসার শেষ, আসলে প্রথম, আপ্তবাক্য, ‘আরোগ্যের থেকে প্রতিরোধ শ্রেয়’‌। বৈজ্ঞানিক হিসেব, শুধু সচেতনতা ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির পালনেই আমাদের দেশে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার চল্লিশ শতাংশ কমে যাবে।‌‌‌‌
লেখক একজন বিশিষ্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট। কলকাতার নামী সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। ইন্ডিয়ান ক্যান্সার সোসাইটি, অঙ্কোলজিক্যাল সোসাইটি অফ বেঙ্গল, ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট কমিটি ইত্যাদি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী।‌

 

জেন ফন্ডা, অভিনেত্রী

ইরফান খান‌, অভিনেতা

সোনালি বেন্দ্রে, অভিনেত্রী

যুবরাজ সিং, ক্রিকেটার

জনপ্রিয়

Back To Top