অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়‌

স্বাদবদলের গল্প শোনালেন মীরাতুন নাহার। পনেরোটি গল্প যেন পনেরোটি জানলা। জীবনের জানলা। শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহারের সমাজ–‌সচেতনতা তাঁর লেখাতেও প্রতিবিম্বিত, একটু ঘনিষ্ঠতার স্পর্শ নিয়ে। সেই ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি লেখকের সচেতন নৈর্ব্যক্তিকতাও সদা উদ্যত। যেসব কাহিনিতে আত্মজীবনের ছায়া পড়েছে, সেখানে তিনি সযত্নে‘আত্ম’–‌র চেয়ে ‘জীবন’–‌‌কে বড় করে তুলেছেন। এরকম দ্রষ্টাভাব বজায় রেখে লিখে যাওয়া সহজ নয়।
বইটি পড়তে গিয়ে লেখকের এই গুণটি সবার আগে নজর কাড়ে। আগেই বলেছি, গল্পগুলি যেন জীবনের জানলা। ভূমিকায় লেখক স্পষ্টতই বলেন, ‘‌ভ্রাম্যমাণ এই পথিক–‌জীবনের নিত্যদিনের পথচলায় কত দেখা, কত শোনা, কত হাসি, কত কান্না, কত দহন, কত সহন, প্রতি ক্ষণে, প্রতি পদে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মনের গহনে।’‌ সেইসব ঘটনা ও চরিত্র ‘‌কাহিনিরূপে সেজে ওঠার তাড়নায় পীড়ন করেছে অহরহ মনপাহারাদারকে’‌ এবং তারই ফলস্বরূপ জন্ম নেয় গল্পগুলি। কাজেই এগুলো শুধু জানলা দিয়ে অলস দেখামাত্র নয়, এর পেছনে আছে ‘‌মনপাহারাদারের’‌ সুস্পষ্ট তাড়ন— তাঁর মতো সমাজসচেতন কর্মীর কাছ থেকে তো এটাই প্রত্যাশিত! ‘‌আজান ও মেহেরজান’‌–‌এর মেহের, ‘‌নীলকণ্ঠী’‌-র গীতা, ‘‌মিথ্যে মামলা’‌–‌র তারিক, ‘‌মাঝ–‌দুপুরের সুখ’‌–‌এর দাদিন বা ‘‌রূপান্তরের রূপকথা’‌–‌র রূপম— এরা প্রত্যেকে জীবনের জানলা থেকে দেখা এমন একেকটি চরিত্র, যারা আমাদের পরিচিত বাস্তব থেকে উঠে–‌আসা চেনা মানুষ এবং যাদের মধ্য দিয়ে সমাজের কোনও না কোনও অসঙ্গতি বা অন্যায় ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে ভাল লাগে, এর আঙিনার বিশুদ্ধ প্রসারতা— যে ভারত মানুষকে ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়, মানুষের পরিচয়ে চেনে, মীরাতুন নাহারের চরিত্রগুলি সেই ভারতের মাটিতে গড়া।
তাই মেহের–‌তারিক–‌গীতা–‌রূপমকে অনায়াসে মিনতি–‌তপন–‌গুলশন–‌রূপেশ করে দেওয়া যেতে পারে, কোথাও এতটুকু ঠোক্কর না খেয়ে। চরিত্রের এই সার্বজনীনতা গল্পগুলিকে আলাদা মূল্য দেয়। ‘‌আজান ও মেহেরজান’‌ আমার মতে এই সঙ্কলনের সেরা গল্প। ইসমত চুঘতাইয়ের অনুবাদে ‘‌কাফির’‌ও যার‌পর‌নাই ভালো লাগে। আশা করি, মনপাহারাদারের তাড়নে আরও কিছু গল্প পাকশালে তৈরি হচ্ছে এবং গল্পকার মীরাতুন নাহারকে এমন অন্তরঙ্গভাবে জানার সুযোগ পাঠক ভবিষ্যতে আবার পাবেন। ■ 
স্বাদবদলের গল্প • মীরাতুন নাহার • কাগজের ঠোঙা • ১২০ টাকা ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top