সল্টলেকে বইমেলা জমজমাট। প্রকাশক, পাঠক, লেখকদের মুখে হাসি। বই বিক্রি হচ্ছে। বইয়ের সঙ্গে মানুষের মেলামেশা হচ্ছে দেদার।
মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথাও। হইচই, হুল্লোড়, প্রতিবাদ, প্রেমের দিনগুলি। লিখলেন প্রবুদ্ধ মিত্র

মার্কাস স্কোয়্যার থেকে ময়দানে চলে–‌যাওয়া ‘বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন’ যখন ঝাঁপ বন্ধ করতে চলেছে পঁচাত্তর সাল নাগাদ, তখন শেষতম বছরের কবিসম্মেলনে আসর কাঁপিয়ে ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও তুষার রায়। কিন্তু, সেটা ছিল শেষ বছর। পরের বছর কী হবে, এই আতঙ্ক ও হতাশা যখন বাঙালির হৃদয়ে চেপে বসছে, তখনই ‘কলকাতা বইমেলা’ আত্মপ্রকাশ করে ছিয়াত্তরের বসন্তে।
প্রকাশক বিমল ধর ও তৎকালীন অন্যান্য বড় পাবলিশাররা বাঙালি জীবনের অন্দরে যে হাওয়া তুলে দিলেন, তা আমরা শুধু লুফে নিলাম না, একে প্রাথমিকভাবে বাঙালির অন্যতম উৎসব বলে মেনে নিলাম শুরু থেকেই।
শীতে বড়দিন, নিউ ইয়ার, চিড়িয়াখানা, ইডেনে ক্রিকেট এসব ছাপিয়ে ‘‌বই বই’‌ করে কেন যে বাঙালি পাগল হয়ে উঠল, তা নিয়ে তখন রীতিমতো ধন্দ ও গবেষণা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আসলে বইয়ের আস্তিনে এতদিন যা লুকোনো  ছিল, তা হল, চিন্তা ও তর্কের এক সন্দর্ভ, যা তার একান্ত নিজস্ব বলে মানে বাঙালি। মাঝখানে পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশক জুড়ে এপার–‌ওপার মিলিয়ে বাঙালি তরুণদের মধ্যে কবি, লেখক ও সম্পাদক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলা সাহিত্য জোয়ারের মুখ দেখেছে কি না বইমেলা শুরু না হলে আমবাঙালি তা বুঝত বলে মনে হয় না। কলকাতা বইমেলার হক আছে এই দাবি করার। সে জন্যই তো বইয়ের আকর ঘিরে যত উন্মাদনা। অবশ্য এর সবটা যে বইয়ের কেনাকাটার দোহাইতে ছিল, এমনটা মনে করার কারণ নেই। মেলা শুরুর বছরেই তা টের পাওয়া গিয়েছিল। 
রবীন্দ্রসদন বা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের উল্টোদিকে, বর্তমানে যেখানটা মোহরকুঞ্জ, সেই লম্বা মাঠটাই হল প্রথম বইমেলার মাঠ। গিল্ডের সিদ্ধান্ত ছিল, মেলায় পঞ্চাশ পয়সা প্রবেশমূল্য দিয়ে ঢুকতে হবে। মেলাকর্তাদের ধারণা ছিল না, স্টল ছাড়া ঘাসের প্রতিটা বর্গইঞ্চি এভাবে দখল করে নেবে অসংখ্য মানুষ, বই ও পত্রপত্রিকা। হই–‌হুল্লোড়ের শুরু সেখান থেকেই। বাঁশের কাঠামোয় কাপড়সাঁটা, সুদৃশ্য ইন্টিরিয়রের সঙ্গে মিশে যেত নতুন বইয়ের গন্ধ। দশ বাই দশ বা তার বেশি মাপের স্টলের ওই আকর্ষণের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল মাঠে–‌বসা তরুণদের। বড়, মেজো, ছোট মিলিয়ে কলেজ ষ্ট্রিট–‌পাড়াকে পুরো তুলে আনা সম্ভব হয়নি ওই মেলায়। যতদূর মনে পড়ে, প্রথম মেলায় ৬০টি স্টলও হয়নি!‌ প্রকাশক ছিল সাকুল্যে ৩০–‌এর কিছু বেশি হয়ত। রূপা, ফ্যামিলি, অক্সফোর্ড থাকলেও এদের মতো বড়ো বিপণির অধিকাংশের জায়গা হয়নি। অথচ, প্রথম মেলাতেই উপচে পড়ল দর্শক। কাউন্টারে শনি–‌রবির লম্বা লাইন শুরু হত বেলা গড়াতেই। প্রকাশকেরা গোড়াতেই বুঝে গেলেন, এ ভীড়ের সবটা বই খরিদের পাবলিক নয়। বইকে কেন্দ্র করে মূলত বাঙালির আর এক হুজুগ এটা। কল্পনা ও স্বপ্ন যেখানে মেলে, সেখানেই কবিতা, ঘটনা ও কল্পনার দেখা মানেই গল্প–‌উপন্যাস, চিন্তা ও তর্কের মিশেলে প্রবন্ধ বা ফিচার। এত বই মানুষ পড়বে কখন, এ প্রশ্ন অবান্তর। হাতে বই মানেই উচ্চ মার্গের, রুচিবান মানুষ। আলাদা, খানদানি পরিচয় তার। আমবাঙালি বইয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে, বইয়ের গন্ধ মেখে, চপে কামড় ও চায়ে চুমুক দিয়ে এবং সিগারেটের ফুরফুরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মেলা থেকে বেরোতেন। হাতে কেনা বই থাকুক বা না থাকুক, এখানেই কলকাতা বইমেলার সফলতা। ছিয়াত্তরের কলকাতা প্রত্যক্ষ করল একটা জাতির প্রাজ্ঞ বৈভবের এক অন্য ইতিহাস সূচনা।
দ্বিতীয় বছরেই মেলার দৈর্ঘ্য বেড়ে গেল। রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিক থেকে শুরু হয়ে তা পৌঁছে গেল বিড়লা তারামণ্ডলের উল্টোদিকের মাথা পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবেই স্টলসংখ্যা ও বইসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। পরবর্তী কয়েক বছর এটাই ছিল বইমেলার মাঠ। আর ঠিক এখান থেকেই ফি বছরের বইমেলা উত্তরোত্তর মনের খোরাক পেতে মিলনের এক বৃহত্তম চরাচর হয়ে উঠল। হই–‌হুল্লোড়ে জাঁকিয়ে বসল বাঙালির মননচর্চার উৎসব। মাঠ জুড়ে থিকথিক করছে ভিড়। বইয়ের পাশাপাশি পত্রপত্রিকা হাতে মাঠের ফাঁকা জায়গার দখল নিয়েছে তরুণতুর্কিরা। মেলার বয়স যত এগিয়েছে, ততই তার চাকচিক্য বেড়েছে। ঝাঁ–‌চকচকে হয়েছে ছোট বা মাঝারি স্টল। প্লাইবোর্ড ও নতুন রঙের গন্ধের সঙ্গে প্রকাশকের ক্যাটালগে নতুন সংযোজিত বইয়ের গন্ধ একাকার হওয়ার যে আনন্দ তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে ছাড়ত না কয়েকদিন ধরে জড়ো হওয়া কয়েক লাখ লোক। প্রকাশকের ঘর থেকে সারা বছর যা বিক্রি হয়, কদিনের মেলার বিক্রির অনেকটা জুড়ে থাকে, এটা  ঘটনা। গিল্ড তৈরি হওয়া ও বইমেলা করার উদ্দেশ্য তো এই ছিল। প্রকাশকদের সমস্ত চেষ্টা এ ব্যাপারে দুশো শতাংশ সার্থক। জানি না ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা, যা এই মেলার অনুপ্রেরণা ছিল বলে শোনা যায়, তাকে বিক্রির দিক থেকে কলকাতা বইমেলা পেছনে ফেলতে পেরেছিল কিনা শুরুর কয়‌ বছরে। কিন্তু, আগত দর্শকসংখ্যার দিক থেকে যে এই মেলা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ, তা মেলা ইতিহাসের প্রথম দশকেই প্রমাণিত। 
কিন্তু, পাশাপাশি আর একটা সত্য বেরিয়ে আসতে লাগল। এই বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিনকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি উদ্যোক্তারা। অন্তত ওই শুরুর বছরগুলিতে। তাই প্রচেষ্টা থাকত মেলার মাঠে খোলা আকাশের নিচে খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে পড়ার। আহা, এর আনন্দই যে আলাদা!‌ কি না থাকত ওই অঘোষিত উৎসবে। নিজের বা নিজেদের উদ্যোগে তৈরি চটি বই বা ছোট পত্রিকা চিৎকার করে বিক্রি। সঙ্গে তরুণদের দল বেঁধে মাটিতে বসে পড়ে আড্ডা। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস কদিন ঘাঁটি গাড়ত মেলাপ্রাঙ্গণে। এই যে, মেলা কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে বিনা অর্থব্যয়ে মেলামাঠের জায়গা দখল, এর উন্মাদনাই ছিল আলাদা। চলত অবাধ কবিতাপাঠ, গান, আড্ডা আর ধোঁয়া তরলের মিলিত আসর। তৈরি হত নতুন বন্ধুত্ব, সম্পর্কের সেতু বাঁধার ছিটেফোঁটা আলসেমি উধাও। আসলে যে বিপুল ভিড় রোজ মেলায় আসত তাকে কাছে টানার প্রতিযোগিতা চলত। হোক না বড়ো প্রকাশকের স্টলে ঢোকার লম্বা লাইন, সাইন বোর্ড বিহীন অজানা অখ্যাত কবি–‌লেখকদের নিজস্ব উদ্যোগে এক ফর্মার কাগজের কাটতি বাড়াতে গলার আওয়াজই ছিল যথেষ্ট। সে আওয়াজে ছন্দ ও তাল ছিল। নাছোড় তরুণদের এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না রসিকজনের।
তবে শুধু তরুণ, অনামী কবি–‌লেখকদের হুল্লোড়ে এই ছাউনিবিহীন সমান্তরাল মেলা নজর কাড়ত না, মেলার ভিড়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিত খোলা মাঠে সেলেবদের হাঁটাচলা।
‘ঐ দ্যাখ সুনীল যাচ্ছে !’...‌
‘‌আরে শক্তি চেঁচিয়ে কবিতা পড়ছে!‌’  
প্রতিদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামতেই ঋজু, চোয়াড়ে সন্দীপনকে পাওয়া যেত সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। সঙ্গে একমেবদ্বিতীয়ম পৃথ্বীশদা (শিল্পী পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়)। এই জুটির আকর্ষণ গ্ল্যামারাস সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চেয়ে কিছু কম ছিল না। এঁদের কাছ ঘেঁসতে পেন্ডুলামের মতো ভিড় এদিক থেকে ওদিক করত গোটা বিকেল সন্ধে জুড়ে। সন্দীপনের ‘মিনিবুক’ ফেরির ঘটনা বইমেলার ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। যাঁরা স্মৃতি হাতড়াতে পারবেন, তাঁরা ফিরে দেখবেন, কী অসামান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক আদব–‌কায়দা ছিল তাঁর ‘মিনিবুক’ বিক্রির ধরনে। ‘পাবলিককে অ্যাড্রেস করতে হবে’ বলে চেয়ার, টেবিল হাতের সামনে যা পাওয়া যেত, তার ওপর উঠে পড়তেন। একদিন মেলার ইলেকট্রিশিয়ানের হেফাজত থেকে একটা মই জোগাড় করে উঠে পড়লেন। নিচ থেকে মই ধরে রাখলেন কয়েকজন। সন্দীপনের হাতে পতপত করে উড়ছে ‘বিপ্লব ও রাজমোহন’। সঙ্গে হুঙ্কার। হাততালি আর চিৎকারে ফেটে পড়ল মেলার ওই অংশ।
অন্য সব উৎসবকে মাথায় রেখেই বলছি, বছরের এই সময়টার অপেক্ষায় থাকত আপামর রসিক বাঙালি। এই একটা সময় এলেই বইমেলার মাঠে পা রাখতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে বাঙালি। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। আমি পার্ক ষ্ট্রিটের উল্টোদিকের মেলাপর্বে পরে আসছি। ওই পুরোনো জায়গার মেলায় আগত জনতার আত্মিক উল্লাস মাঠে ঢুকেই ঘটত। সঙ্গে একটা অনাস্বাদিত মুক্তির স্বাদ।
মনে আছে, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গান গাইছে একদল তরুণ। তারা প্রতিদিন আসর জমাত মেলার একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। গানের সঙ্গে শরীর জুড়ে ছন্দে তৈরি হত কবি নিশীথ ভড়ের লাইন অনুযায়ী ‘মাতাল চরণমালা’। মেলায়–‌ওড়া ধুলো থেকে বাঁচতে নাকে রুমাল থাকত ঠিকই। কিন্তু, নতুন প্রেমে–‌পড়া যুগল কোমর জড়িয়ে নাচতে দ্বিধা করত না। বাজত বাউলের একতারা। পূর্ণিমার চাঁদের রুপোলি ঝলক মেলার আলো–‌আঁধারি কোণগুলোতে পড়লেই দেখা যেত মুক্তিকামী তরুণ–‌তরুণীরা সার বেঁধে বসে কবিতা পড়ছেন। তাঁদের গলা কখন যে তরলাইত হয়েছে, তা তাঁরা নিজেরাই খেয়াল করেননি। সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মুখগুলো যে আত্মিক মুক্তির অপেক্ষায় ছিল সারা বছর, তা বইমেলা না শুরু হলে বোঝাই যেত না।
এই গানের সঙ্গে বইয়ের আত্মিক যোগ নিশ্চয়ই ছিল বলেই ময়দানের মেলায় নব্বই দশকে আমরা পেয়েছিলাম ‘মঁমার্ত’–‌কে। অল্পদিনের  মধ্যেই ‘মঁমার্ত’ই হয়ে উঠল হাত ছেড়ে হারিয়ে যাওয়া যুগলের পুনর্মিলন কেন্দ্র। 
প্রতিবাদের আঁতুড়ঘর
সত্তর দশকে কলকাতার বুকে রাজনৈতিক উথালপাতাল মাথায় রেখে বলতে দ্বিধা নেই, বইমেলা সময় গড়াতে গড়াতে হয়ে উঠল প্রতিবাদের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। মিছিলনগরী তার চরিত্র বজায় রেখে রাজপথ ছেড়ে বইয়ের শহরে চলে আসত কদিনের জন্য। মেলার মাঠে প্ল্যাকার্ড হাতে ছোটখাট মিছিল লেগেই থাকত। চিন্তায়, তর্কে, প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে সময় নেয়নি বইমেলা। কেন জানি না প্রতিবাদও যেন আত্মিক উৎসবের অংশ হয়ে উঠতে পেরেছিল। এই যে, লিটল ম্যাগাজিনের জায়গা না পাওয়া এবং যার ফলে মেলার মাঠে সমান্তরাল বিকিকিনি, এও তো প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবাদকেও উৎসব বানিয়েছে কলকাতা বইমেলা। 
এক ব্যাগ বই
মনে আছে, মেলার এক প্রবীণ কর্মকর্তাকে মেলার মাঠে একা পেয়ে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, ‘মেলায় কমিশন কবে বাড়াবেন, অনেকদিন তো হল?’ জবাবে এমন একটা হাসি উনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যার সাতরকম মানে হতে পারে। এটা যে ওঁর হাতে নেই, তা অন্তত  ঠারে ঠোরে বুঝিয়ে ছিলেন। মাত্র দশ পার্সেন্ট দামে সুবিধে কি আর এমন আহা মরি ব্যাপার, কলেজ ষ্ট্রিট থেকে সারা বছর যেখানে কুড়িতে পাওয়া যায়!‌ এই ছিল আম খদ্দেরের মনের কথা। কিন্তু, বই হাতে নিয়ে দেখতে তো কোনও পয়সা লাগে না। তাক থেকে বই নামিয়ে পাতা ওল্টাতে–‌ওল্টাতে সদ্য তরুণীর মনে হল, পাশে দাঁড়ানো গালে হালকা দাড়ি–‌ওঠা ছেলেটি একই বইয়ের আর একটি কপি নিয়ে ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে। শক্ত বোর্ড বাঁধাইয়ের মোটা কুড়ি–‌বাইশ ফর্মার বই। দাম তখনকার বাজারে ১৮০। ছাড় বাদ দিয়ে দেড়শো টাকার ওপর। আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগে। পকেট থেকে ওয়ালেট বা  ভ্যানিটি ব্যাগের জেব, কোনওটাই উন্মুক্ত হল না। অবিক্রিত হয়ে দুটি বই–‌ই আবার তাকে ফিরে গেল। আর্থিক সঙ্গতিতে আটকে গেল পছন্দের বই কেনা। বই দুটি তাকে ফেরত দিয়ে পাশের সেল্‌ফে এগোনোর সময় কখন যেন ওই চারটে চোখ এক বিন্দুতে আটকে গেল।  হৃদয়কে বাদ দিয়ে যে বইমেলা হয় না। এই যুগল সেদিন একব্যাগ বই নিয়ে মেলা থেকে বাড়ি ফিরতে পারেনি। কিন্তু, তারা অন্য কিছু নিয়ে ফিরেছিল বলেই আজ তারা সুখী দম্পতি। প্রতি বছর বইমেলায় আসে তারা।
শিশুসাহিত্য বরাবরই জমজমাট বাণিজ্য করে, সেই প্রথম যুগের মেলার সময়কাল থেকে। দেব সাহিত্য কুটীর বা শিশু সাহিত্য সংসদের স্টলে কচিকাঁচাদের হাত ধরে তাদের বাবা–‌মায়েরা রীতিমতো কালঘাম ঝরিয়ে ঢুকতে পারত। ব্যাগভর্তি বই নিয়ে সেখান থেকে বেরোত তারা। সেখানেই ব্যাপারটার ইতি ঘটত না। 
‘ওই তো। ওই তো উনি বসে আছেন।’ সমবেত চিৎকার থেকে বোঝা গেল, ‘উনি’ যে সে কেউ নন। স্বয়ং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। সুতরাং ছুটতে হবে ওইদিকে। হঠাৎ, একঝাঁক অটোগ্রাফ–‌শিকারীর কবলে পড়লে যে কোনও সেলেব লেখক ঘাবড়ে যেতে পারেন। উনিও অপ্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু, এসব মাঝে–‌মাঝেই সামলাতে হয় ওঁদের। তাই অভ্যস্ত হাতে কাজ শুরু করতে দেরি করলেন না। কাকে ফেরাবেন এই আবদার থেকে!‌ কেনই বা ফেরাবেন!‌ এটা যে বিশ্বের সেরা দর্শক সমাগমের বইমেলা। একটা অটোগ্রাফই তো ওই শিশুদের সারাজীবন বইমুখী করে রাখবে। এদের মধ্যে থেকেই তো কেউ কেউ ভাবীকালের লেখকও বটে। 
একটা কথা সবাই মানবেন। বই কিনে খাবারের দিকে যাওয়ার একটা আলাদা মজা আছে। তাই বইয়ের ব্যাগ হাতে কফি হাউসের দিকে পা বাড়ানো। কফি হাউস তো মেলার অন্যতম আড্ডার জায়গা বরাবরই। দেখা হয়ে যায় চেনা মুখের সঙ্গে। ফি বছর তো এই দেখা হওয়ার টানেই মানুষ আসে। মিলনে আড্ডায় মেলায় মাত্র একটি দিন যে যথেষ্ট নয় তা বেরোনোর সময় সবাই মনে করতে বাধ্য। টিকিট কেটে ঢোকার লাইন আর বেরোনোর সময় হাতে নতুন বই থাকলে ক্যাশ মেমো দেখিয়ে বেরোনো ছিল রোজকার রুটিন। কেন বেরোনোর সময় এত ঝকমারি, তা ছোটরা কৌতূহলে জানতে চাইত। বাবা–‌মায়েরা শুধু বলত মেলায় পয়সা দিয়ে বই কেনে না এমন কিছু  ‘দুষ্টু লোক’ তো ভিড়ে মিশে থাকতেও পারে। যাদের পোশাকি নাম ‘শপ্ লিফ্‌টার’‌। 
এসব থাকলেও সস্তায় বই খরিদের সুযোগ আসত শেষ দিকে। ক্রমশ দিন ফুরোলেও শেষদিকে মেলা জমে উঠত ঐ কারণে। শেষ দু দিন পুরোনো বইয়ের ঢালাও বিক্রির হাট বসে যেত ‘বইবাজারে’। তেমন ঝানু পাঠক হলে অত্যন্ত মূল্যবান বই নামমাত্র দামে বগলদাবা করার সুযোগ থাকত। এও কম আনন্দের নয়। শেষদিনের শেষ সময় মানে রাত নটার ঘণ্টা। হতাশার কোনও জায়গা নেই। সমবেত হাততালির ক্যাকোফোনিতে কয়েক লক্ষ মানুষ পরের বার মিলনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেবারের মতো মাঠ ছাড়ত। শেষদিন তারকাদের গা–‌ঘেঁষা হয়ে যেত আমজনতা। নতুন বইপ্রেমী নিশ্চয়ই উঠে আসত। এটাই তো তখনকার ‘ক্যালকাটা বুক ফেয়ারের’ অবদান।
পার্ক স্ট্রিট জ্যাম জমাট
এই যে এক ফালি জায়গার জন্য হাহাকার এক দশকেরও বেশি সময় জুড়ে, এর নিরসনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রূপায়িত হতে বইমেলার একটা যুগ পেরিয়ে গেল। সম্ভবত ৮৮ সাল নাগাদ কলকাতা বইমেলা ময়দানের হৃদয়ে জায়গা করে নিল। বিশাল সবুজকে গিল্ড তার কর্মদক্ষতায় মেলাপযোগী করে ফেলতে সক্ষম হল। একলাফে কয়েক হাজার বর্গফুট থেকে কয়েক একরের হয়ে গেল এশিয়ার সর্ববৃহৎ বইমেলা। লোকসমাগমের নিরিখে বিশ্বের সেরা বইমেলা। দেশের গণ্ডি ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিকতার হাতছানি। অনেক আগেই এই মেলা বসন্ত থেকে শীতে চলে এসেছিল। সুতরাং, দুর্গাপুজো বাদ দিলে এটা কোলকাতার বুকে বাঙালির শ্রেষ্ঠ মিলনমেলা হয়ে উঠল দ্রুত।
বইমেলার একাল–‌সেকাল নিয়ে তুলনা টানা এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়। কিছু ব্যাপার রয়ে গেল অতীত হয়ে। যা এই প্রজন্ম অবশ্য জানতেই পারল না। বইমেলা ক্রমশ আকারে ও ব্যঞ্জনে বড় হত না, যদি না এর প্রতি ভালবাসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেত। কিন্তু, কীরকম সেই ভালোবাসা? এর অনেক অলিগলি খানাখন্দ আছে। শুধু বইয়ের টানে একসময় বিপুল ভাবুক বাঙালি এখানে একত্রিত হয়ে ছিল ঠিকই। বইপ্রেমীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এটাই মেলামুখো লাখো লাখো মানুষের মূল ধারা বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। বইবিক্রির হিসেব দেখলে জানা যায়, এক–‌এক বছরের রেকর্ড পরের বছর ভেঙে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই পার্ক স্ট্রিটের উল্টোদিকের ময়দানই এ পর্যন্ত কলকাতা বইমেলার সেরা জায়গা। ধারে, ভারে ও অভিনবত্বে এত বিরাট মেলা  আর এর একমাত্রিক চরিত্র ধরে রাখতে পারল না। আশির দশকের শেষদিকে বিনোদনের অনেক মাধ্যম এর সঙ্গে মিলিত হলে এ এক বহুমাত্রিক চেহারা নিতে শুরু করল। তবু এই সময়েই হত বইয়ের জন্য বারো দিনের মেলার প্রথম রবিবার সকালে শহরের উত্তর–‌দক্ষিণ দুই প্রান্ত থেকে দুটো পদযাত্রা এসে মিলত পার্ক স্ট্রিটের মেলাপ্রাঙ্গণে। বিশিষ্টদের অংশগ্রহণ কোনও খামতি ছিল না। বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের দৌলতে মেলার টাটকা খবর জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ত নিমেষে। আর দুপুর গড়াতেই মেলার বিভিন্ন গেটে কয়েক লাখ লোক জড়ো হয়ে যেত পাঁচ টাকা মূল্যের টিকিট কাটতে। সদাব্যস্ত মধ্য কোলকাতার চৌরঙ্গি পার্ক ষ্ট্রীট রবীন্দ্রসদন জুড়ে দেখা যেত দীর্ঘ সময়ের যানজট। মেট্রো রেলের রেকগুলো ভিড়ে উপচে পড়ত। উৎসব আর কাকে বলে!‌
শুরুর পঞ্চাশ পয়সা থেকে পাঁচ টাকার প্রবেশমূল্য গুনে দশ–‌বারো লাখ লোক মেলায় প্রবেশ করেই নাকে রুমাল চাপা দিত। 
একসময়ে মেলার প্রবেশমূল্য তুলে দিল গিল্ড। নিঃসন্দেহে সাধু পদক্ষেপ। এর ফলে মেলায় সাধারণের অংশগ্রহণ অনেক বেড়ে গেল। কিন্তু, একনাগাড়ে দু দশক কাটিয়ে দেওয়ার পর কেন প্রশ্ন উঠল পরিবেশ দূষণের, ব্রিটিশদের তৈরি করা ভিক্টোরিয়া সৌধ কি বইয়ের কারণে কলুষিত হবে, চারপাশে এত কিছু দূষণ থাকা সত্ত্বেও? এ প্রশ্ন আজও নাড়া দেয়। আবার জায়গা–‌বদল হয়েছে। আবারও হবে হয়ত। সেদিনের শিশুটি আজ বড় হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক বলেই হয়ত যাযাবর হতে সে আর ভয় পায় না।
হই–‌হুল্লোড়ে বারো দিন
এই পর্বে বইপ্রেমীদের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ঘটেছিল একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও লিটল ম্যাগাজিনের জন্য আলাদা চত্বর। এত দিনে যেন পূর্ণতা পেল বইমেলা। ‘কলকাতা বইমেলা’ হয়ে গেল ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা’‌। সসম্মান লিটল ম্যাগাজিন মেলার খোলা মাঠের ঘাস ছেড়ে উঠে এল ছাউনি–‌ঘেরা টেবিলে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বর হয়ে উঠল কবি–‌লেখকদের সম্বৎসরের বকেয়া আড্ডা ও নতুন লেখালেখির চুলচেরা বিশ্লেষণের পবিত্র ভূমি। যে পরম্পরা আজও চলছে। রণপায়ে হেঁটে বুকে পোস্টার সেঁটে প্রচার চলত পত্রপত্রিকা ও নতুন প্রকাশিত গ্রন্থের।
নতুন প্রজন্ম একটা জিনিস রেডিমেড পেয়ে গেল। তা হল অসংখ্য বাংলা ছোট প্রকাশক ও বিদেশি প্রকাশকদের একসঙ্গে পাওয়া। যা প্রথম যুগের বইমেলায় সহজলভ্য ছিল না। গণমাধ্যমের সুসজ্জিত স্টলে হাজির হয়ে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডকে হাতের নাগালে পাওয়া। ‘মঁমার্তে’ সেলেবদের মুখোমুখি হতে পারা আর গানে, গল্পে, আড্ডায় মেতে থাকার অজস্র ঘাঁটি পেয়ে যাওয়া। আর যা মিস করল, তা হল, না পাওয়ার অভিমান। যা প্রথম যুগে আমরা পেয়েছি। অপ্রাপ্তি, অভিমান ইত্যাদি থেকে যে সুপ্ত বিদ্রোহ ও তা থেকে সঙ্ঘবদ্ধ থাকা, বইমেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, ওটাই ছিল তরুণ বয়সে আমাদের প্রাণশক্তি। চার যুগ কেটে যাওয়ার পরও তাই বইমেলা আমাদের প্রেম। যে শিশু পাঠকটি কান্নাকাটি করে তার চাহিদা মতো কমিক স্ট্রিপ আর ছড়ার বই কিনে সেদিন বাড়ি ফিরেছিল, সে হয়ত আজ নবীন লেখক। তার হাতে উঠে এসেছে তারই রচনার নতুন গ্রন্থ। অটোগ্রাফ শিকারীর সামনে সেও তো পড়তে চলেছে!‌ ফি বছরে বারো দিনের হই–‌হুল্লোড় শেষে এইটাই ঘটাতে পেরেছে আমাদের প্রেম। কলকাতা বইমেলা।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top