শক্তি চট্টোপাধ্যায় আসতেন। আসতেন শিবনারায়ণ রায়। বুদ্ধদেব বসু, সন্তোষকুমার ঘোষরা আসতেন । আসতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ‘‌এক্ষণ’‌ দেখতে। আর আসতেন সাদা ধুতি–পাঞ্জাবিতে বিকাশ রায়। গাড়ি থেকে নেমে লিস্ট মিলিয়ে পত্রিকা কিনতেন পাঁজা করে। মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে এসেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। লিখলেন সম্রাট মুখোপাধ্যায়

হাওড়া স্টেশনে মিট করতে গেলে বড় ঘড়ি আছে। ধর্মতলা চত্বরে মেট্রো সিনেমার মুখ (‌এমনকী ভাঙার পরেও!‌)‌
কিন্তু কলেজ স্ট্রিটে ?‌
কেন, পাতিরাম আছে না?‌‌ ‘‌পাতিরাম বুক স্টল’‌।‌ চার মাথার মোড়ে এক ফালি ম্যাগাজিন স্টল। দর্শনধারীতে এমন স্টল গোটা কলকাতায় কয়েক হাজার। কিন্তু ধারে এবং ভারে ‘‌পাতিরাম’‌ এখন ‘‌হেরিটেজ প্লেস’‌। একমদ্বিতীয়ম্‌।
কারণ, এক, এই মুহূর্তের বা অদূর অতীতের বঙ্গ–সাহিত্যের এমন কোনও রথী–মহারথী নেই, যিনি কোনও না কোনও সময়ে ‘‌পাতিরাম’‌–এ আসেননি।
কারণ, দুই, বাংলা ভাষার হেন কোনও পত্রিকা নেই, যা ‘‌পাতিরাম’‌–এ আসে না। সে ‘‌বাণিজ্যিক’‌ হোক, কী ‘‌লিটল’‌। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় বললে ‘‌পাতিরাম’‌ এক ‘‌বিকল্প বাজার’‌। কারণ ‘‌বিকল্প’‌ ধারার পত্রিকা বা বই যাঁরা করছেন, তাঁরা জানেন ‘‌পাতিরাম’‌–এ এনে ফেললেই বাজার পাবেন। কারণ বিকল্প ধারার ক্রেতারা এখানে আগে থেকেই সমবেত।
কারণ, তিন, দূর জেলা–মফস্‌সল–গ্রাম থেকে আসা ক্রেতারাও জানেন নামী পত্রিকা বিশেষত লিটল ম্যাগাজিন খুঁজতে শহর বা প্রকাশকের ঘর ঢুঁড়ে ফেলতে হবে না। সম্ভার সাজিয়ে তৈরি আছে ‘‌পাতিরাম’‌। সঙ্গে আছে কুড়ি শতাংশ কমিশনের হাতছানিও। ক্রেতা–নির্বিশেষে যা দেওয়া হয়।
অতএব ‘‌পাতিরাম’‌ জিন্দাবাদ।
সেই ‘‌পাতিরাম বুক স্টল’‌–এর ‘‌সেঞ্চুরি’‌ করার আর মাত্র বছর ছয়েক বাকি।‌ এখন বয়স ৯৪।‌ অবশ্য বৃদ্ধ নয়। তারুণ্যে এখনও টগবগ করছে‌। ১৯২২ সালে জন্ম পাতিরাম পারিজার হাত ধরে। প্রোপাইটারের নামেই দোকানের নাম। আর সে নাম থেকেই নামডাক এমন ছড়াল যে এই নামের আর বিকল্প থাকল না গত ন’‌দশক ধরে।
সেই পাতিরাম পারিজাও নেই। তাঁর পরিবারের কেউই আজ আর এই দোকান চালান না। তবু দোকানের নামে বেঁচে আছেন ‘‌পাতিরাম’‌, সেটাই এ’‌দোকানের ‘‌গুডউইল’‌, যেটা সমেত ব্যবসা কিনেছিলেন বন্ধ–সহকর্মী বামনদাস ভট্টাচার্য। শর্ত ছিল দোকানের নাম বদলানো যাবে না।
ওড়িশা থেকে আসা পাতিরাম পারিজাকে স্নেহ করতেন স্বয়ং দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু। তঁার যোগাযোগেই সেই সুপারিশেই একটি দৈনিকের ‘‌সোল ডিস্ট্রিবিউটারশিপ’‌ পান। পাশাপাশি চালু করেন ‘‌পাতিরাম বুক স্টল’‌। আরও নানা পত্রপত্রিকার জন্য।
বামনদাস ভট্টাচার্য ছিলেন পাতিরাম পারিজার সহকর্মী। বামনদাসবাবু ছিলেন সেই দৈনিকের ‘‌সার্কুলেশন’‌ বিভাগে কর্মী। পাতিরামবাবু যখন ঠিক করেন বইয়ের ম্যাগাজিনের দোকানের ব্যবসা থেকে সরে যাবেন, স্বত্ব কিনে নেন বন্ধু বামনদাসবাবু। সেটা সাতের দশকের মাঝামাঝি। দোকান সামলানোর দায়িত্ব ক্রমান্বয়ে পরে তাঁর ভাইপো শ্যামল ভট্টাচার্য আর ছেলে তাপস ভট্টাচার্যের ওপর। এখন অবশ্য শ্যামল ভট্টাচার্য টেমার লেনে নিজের আলাদা দোকান ‘‌শ্যামল বুক স্টল’‌ নিয়ে ব্যস্ত। তবু ‘‌পাতিরাম’‌–এ স্মৃতিগুলো ভুলতে পারেন না। 
এখন পাতিরাম চালান তাপস ভটাচার্য। কবে থেকে ঠিক দোকানে বসছেন মনে নেই। বললেন, ৩০–৩৫ বছর তো হবেই। সঙ্গে থাকেন ‘‌কাকা’‌। এই ‘‌কাকা’‌ নামেই যিনি বিখ্যাত গোটা কলেজ স্ট্রিট চত্বরে, সেই কাকা মানে হেমরঞ্জন ভট্টাচার্য আদতে সত্যি– সত্যিই কাকা তাপসবাবুর। সহাস্যে তাপসবাবু জানালেন, ‘‌ওই যে আমি কাকা–কাকা বলে ডাকি— ওই থেকেই দোকানে আসা সকলে ‘‌কাকা’‌ নামটা তুলে নিয়েছে।’‌ সদাহাস্যময় ছোটখাটো মানুষটির অবশ্য নাম নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। সদাই ক্লান্তিহীন রাশি রাশি পত্রিকার স্তূপ থেকে উৎসুক ক্রেতার খোঁজ মতো পত্রিকাটি বের করে দিতে। লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক–সম্পাদকদের কাছে ‘‌কাকা’‌ ও এখন ‘‌পাতিরাম’‌–এর ‘‌ব্র‌্যান্ড ইক্যুইটি’‌, দূর দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের ভরসাস্থল।
এই কাকা সম্পর্কে একটা ঘটনা বলি। এই প্রতিবেদকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। কিছুদিন আগে, ‘‌নকশাল আন্দোলন’‌ বিষয়ে একটি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা নেড়েচেড়ে দেখছি। নামে ও দামে দুটোতেই বেশ ভারী সেই পত্রিকা। বেশ চকচকেও। কিন্তু দেখে–বুঝে মন ভরছে না।‌ কাকাকে সে কথা বলতে একমত হলেন। আর হদিশ দিলেন অন্য একটি পত্রিকার। স্বল্পায়তন, ততটা নামী নয়। অথচ সারগর্ভ, সেটাই কিনলাম। কাকা স্মিতহাস্যে সমর্থন করলেন।
অথচ ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ দেখলে এমনটা তো হওয়ার কথা নয়, খুশি হওয়ার তো কথা ছিল প্রথম সংখ্যাটি কিনলেই। কারণ তার দাম তিনগুণ বেশি। অর্থাৎ বিক্রি করলে বিক্রেতার লভ্যাংশও তিনগুণ বেশি।
তাপস ভট্টাচার্য বললেন, ‘‌আমরা ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু কখনও ভুলি না যে এটা বইয়ের ব্যবসা। আমার বাবাও চাইতেন বই–পড়ুয়ারা এসে যেন তাঁদের মনের খোরাকটা ঠিক খুঁজে নিয়ে যেতে পারে। আর তাই আমরা চেষ্টা করি কোনও ক্রেতা আমাদের পরামর্শ চাইলে, বুঝে–শুনে তাঁকে সাহায্য করার। তাঁর তৃপ্ত মুখটা অনেক সময়ই পয়সা–কড়ির চেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।’‌
দুপুরের দিকে গেলে দেখা যায় স্টলে গবেষকদের ভিড়। তাঁরা অনেকরকম পত্রিকা পেড়ে–পড়িয়ে দেখছেন। কেউ কেউ টুকটাক তথ্যের নোটও নিচ্ছেন। এঁরা জানেন অদূরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নেই, এমন রত্নেরও হদিশ পাওয়া যাবে এখানে। পাওয়া যাবে একেবারে হালফিলের চিন্তা–চর্চার পরিচয়ও। এঁদের কাছে ‘‌পাতিরাম’‌ যেন এক মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
তাপসবাবু আমহার্স্ট স্ট্রিটের সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। হাসতে হাসতে বললেন, ‘‌কলেজে পড়তে পড়তেই দোকানে বসা। এখানে বসে বই বেচতে বেচতেই পড়েছি। পাশও করেছি। আবার রাজনীতিও করেছি।’‌ 
লিটল প্রিন্সের রাজত্ব ‘‌পাতিরাম’‌–এর দুটো অংশ। একদিকে বাণিজ্যিক পত্র–পত্রিকা। অন্যদিকে লিটল ম্যাগাজিন। দুটি ফালি ঘর। আগে মাঝে একটা দরজা ছিল। বহুদিনই তা বন্ধ। আর সন্দেহ নেই ভারে এগিয়ে লিটল ম্যাগাজিনের অংশটাই। এটাই পাতিরামের ‘‌মৌচাক’‌।
কথাটা মেনে নিলেন তাপসবাবু। বললেন, ‘‌হ্যাঁ, এটা তো ভেবেচিন্তেই করা। আমাদের ব্যবসার মূল সপোর্টটা তো ওখান থেকেই পাই।’‌
এই কুড়ি শতাংশ কমিশন দেওয়ার ব্যাপারে আপনারাই তো পথিকৃৎ?‌
‘‌সেটা বলতে পারব না, .‌.‌.‌ তবে কমিশনের জন্য লিটল ম্যাগাজিন বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় বিষয়ের জোরে। জানবেন, বিশেষ সংখ্যা লিটল ম্যাগাজিনের কোনও মার নেই, কোনওটা শেষ হতে এক মাস লাগে। কোনওটা এক বছর, কিন্তু সব বিক্রি হয়ে যাবে।’‌
কোনটা ‘‌হিট’‌ করবে বুঝতে পারেন?‌ কীভাবে বোঝেন?‌ ‘‌হ্যাঁ, তা খানিকটা বিষয় দেখলে বুঝতে পারি। একটা আন্দাজ তো হয়েই গেছে।’‌
নিজে পড়েন না?‌
‘‌হ্যাঁ, পড়ি, লিটল ম্যাগও পড়ি মাঝে মাঝে। তবে সত্যি কথা বলব খেলার বই বেশি পড়ি, এখন অবশ্য বই পড়িই কম।’‌
এখন কত লিটল ম্যাগাজিন আসে?‌
‘‌সঠিক সংখ্যাটা বলতে পারব না। গুনি না ওভাবে, তবে ছ’‌সাতশো তো হবেই। কাউকেই ফেরাই না। নতুন হলেও চেষ্টা করি অল্প কয়েক কপি রাখতে।’‌
আর একটা ব্যাপারেও মাঝে মাঝে একটু চিন্তায় পড়েন তাপস, কাকারা, লিটল ম্যাগাজিনের দাম। বললেন, ‘‌অনেকেই দামটা বড্ড বেশি করে ফেলেন। অনেক ভাল পড়ুয়াকে চিনি। জেলা থেকে এসব পত্রিকা কিনতেই আসেন। নিম্নমধ্যবিত্ত। বুঝি পত্রিকা পছন্দ হয়েছে। কিন্তু দামটা দেখে মুখটা ম্লান হয়ে যায়।’‌
সম্পাদকদের কিছু বলবেন?‌
‘‌হ্যাঁ, বলব, সাধারণ পাঠকরা কিনতে পারে এমন দাম রাখুন। সংখ্যার বিষয়টা নিয়ে ভাবুন। সময় নিন, মনে রাখুন, পাঠকদের– ক্রেতাদের জন্য সংখ্যাটা করছেন, তাঁরা বাঁচলে আমরা বাঁচব।’‌
লিটল ম্যাগাজিন আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডাকে আপনাদের?‌
‘‌হ্যাঁ, ডাকে, সবাই ডাকে এমনটা বলব না, তবে অনেকেই ডাকে, আমরাই যাই না। আড়ালেই থাকি।’‌ 
হাতিবাগানে বাড়ি তাপসবাবুর। দুপুরের খাওয়া দোকানেই। দোকান সেরে সোজা বাড়ি, দোকানে জায়গা বাঁচাতে অনেক সময় বইয়ের ওপরেই বসেন। চেয়ার নেই। আধঘণ্টা এভাবে টানা মাটিতে বসে থেকে কোমর ধরে যায় না?‌
এককালে নিয়মিত ফুটবল খেলতাম। ব্যায়াম করতাম। ওটাই বাঁচিয়ে দিয়েছে। তবে ছেলেরা এ ব্যবসায় আসবে কিনা, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত নন তাপস।
‌‌্শ্যামল ভট্টাচার্য পুরনো গল্পের ঝাঁপি খুললেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার ‘‌মিনিবুক’‌–‌এ নাকি সাতের দশকের গোড়ায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল নকশালপন্থীরা। ‘‌পাতিরাম’‌ থেকে টেনে নামিয়ে। সে সময় শ্যামল আসেননি দোকানে, ফলে বলতে পারলেন না। তবে তাঁর স্মৃতিতে আটের দশকের গোড়ায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন ‘‌পাতিরাম’‌–‌এ আসতেন, ভিড় জমে যেত তাঁকে ঘিরে। স্টলে দাঁড়িয়ে পত্রিকা দেখতেন, কিনতেন, সবচেয়ে মজার কথা, অচিরেই জমে যেত তরুণ কবিদের ভিড়। আর শুরু হয়ে যেত ছোটখাটো কবি– সম্মেলন। ‘‌পাতিরাম’‌–‌এর সামনে শুরু হয়ে ক্রমশ তা সরে যেত বাস স্ট্যান্ডে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় আবার মেজাজে–‌মর্জিতে অন্যরকম। তিনি যখন আসতেন প্রায়শই সঙ্গে থাকতেন কবিবন্ধু অমিতাভ দাশগুপ্ত। একদিন শক্তি চট্টোপাধ্যায় এসে বললেন, ‘‌শ্যামল, আমার জন্য ‘‌ব্ল্যাক টি’–‌র বন্দোবস্ত করো।’‌ উল্টোদিকের চায়ের দোকান থেকে সেইমতো কালো চা এল। এক চুমুক দিয়ে শক্তি বললেন, ‘‌আরে!‌ এ’‌কি চিরতার জল?‌’‌ এবার চিনি দিয়ে এল। এবারও তাঁর না–পসন্দ। অবশেষে অমিতাভ দাশগুপ্ত বললেন, ‘‌ওর চাহিদার ‘‌কালো’‌ পানীয় তুমি আনতে পারছ না। দেখছি, আমিই ব্যবস্থা করছি।’‌ দুই বন্ধু হাত–‌ধরাধরি করে হাসতে হাসতে চলে গেলেন।
আবার শিবনারায়ণ রায়, নির্মাল্য আচার্যরা ছিলেন গম্ভীর, রাশভারী মানুষ। একসময় বুদ্ধদেব বসু, সন্তোষকুমার ঘোষরা আসতেন শুনেছেন তাপস, শ্যামলরা। আসতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিজের সম্পাদিত ‘‌এক্ষণ’‌ দেখতে। আর আসতেন সাদা ধুতি–পাঞ্জাবিতে বিকাশ রায়। গাড়ি থেকে নেমে লিস্ট মিলিয়ে পত্রিকা কিনতেন পাঁজা করে। শ্যামল বললেন, ‘‌মজাটা কি জানেন?‌ তখন সময়টা অন্যরকম ছিল। কৌতূহলীরা এঁদের দেখে এগিয়ে আসতেন ঠিকই। তবে এঁরা কখনও ‘‌মবড’‌ হয়ে যাননি। বরং এঁদের থেকে বেশি ভিড় হত সুনীল–‌শক্তিকে দেখলে।’‌ মনোজ মিত্রও নিয়মিত আসতেন নাটকের পত্রিকা–‌বই ইত্যাদির খোঁজ নিতে।
মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে এসেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। জানালেন তাপস। শ্যামল অবশ্য মজা করে বললেন, ‘‌সন্দীপনদা তো কথা এমনভাবে বলতেন যা বুঝতে বুঝতেই সময় চলে যেত’‌, ‌তাপস জানালেন, ‘‌কিছুদিন আগে শঙ্খ ঘোষ এসেছিলেন। পছন্দ মতো কিছু পত্রিকা নিলেন। শঙ্খ ঘোষের হাতে পত্রিকা তুলে দিচ্ছি, সত্যি কথা বলতে, এটা ভাবতেও আমার রোমাঞ্চ হয়।’‌ পূর্ণেন্দু পত্রী নিয়মিত আসতেন। পত্রিকাগুলোর প্রচ্ছদ খুঁটিয়ে দেখতেন।’‌
সুবিমল মিশ্র আবার অন্য কাণ্ড করতেন। কখনই বই বিক্রির টাকা নিতেন না ‘‌পাতিরাম’‌ থেকে। বদলে সেই টাকার পত্র–‌পত্রিকা নিতেন।
উল্টো ছবিও আছে। বিমল করের ‘‌গল্পপত্র’‌ ঘিরে তেমনই এক অভিজ্ঞতা শ্যামলের। অবশ্য তা বিমল করকে ঘিরে নয়। শ্যামল তখন পাতিরামে বসেন আর ‘‌গল্পপত্র’‌ পাতিরামে রেখে যান অন্য এক সাতের দশকের লেখক।
একবার পত্রিকার টাকা নিয়ে সামান্য তর্কাতর্কি হল। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সেই লেখক শ্যামলের নামে অভিযোগ করলেন থানায়। শ্যামলের ভাষায় ‘‌ক্ষমতা’‌ দেখাতে। ওসি–‌কে ব্যাপারটা বুঝিয়ে শ্যামল যোগাযোগ করলেন স্বয়ং বিমল করের সঙ্গে। বিমল কর নিয়মিত আসতেন ‘‌পাতিরাম’‌–‌এ একসময়। খুবই স্নেহ করতেন শ্যামলকে। অতএব, পুলিসকে বললেন ব্যাপারটা উপেক্ষা করতে।
এক দীর্ঘদনের পত্রিকা–‌সম্পাদক–‌বন্ধু যেভাবে ‘‌সামান্য’‌ কটা টাকার হিসেবের জন্য ‘‌পাতিরাম’‌–‌এ পত্রিকা রাখা বন্ধ করেছে, তা যেমন দুঃখের স্মৃতি হয়ে আছে তাপসের। ‌তবে দু’‌জনেই মানলেন, কখনই কোনও রাজনৈতিক দাদাগিরির মুখে পড়তে হয়নি তাঁদের, নানারকম রাজনৈতিক বইপত্র রেখেও।
‘‌কোনও এক সমীক্ষায় নাকি দেখা গেছে শুনলাম, এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ম্যাগাজিন স্টল ‘‌পাতিরাম’‌, জানালেন তাপস।‌ ‘‌আকারে নয়, চরিত্রে‌।’‌ দু’‌বার এর মধ্যে বিপদে পড়েছেন। প্রথমবার নোটবন্দির সময়, দ্বিতীয়বার জিএসটি নিয়ে। কাগজ, কালি–‌এসব ব্যবসার লোকেরা সমস্যায় পড়ায় ম্যাগাজিন ছাপাও বিপন্ন হয়েছে। ‘‌‌তবু পড়ার নেশা, এমনই যে এ কেউ ছাড়তে পারবে না।’‌ আত্মবিশ্বাসী তাপস ভট্টাচার্য।
যেমন আত্মবিশ্বাসী ‘‌পাতিরাম’‌–‌এর বড় করে শতবর্ষ পালন করায়। শিল্পী রমাপ্রসাদ দত্ত বই–‌পত্রিকা নিয়ে কার্টুন আর ছড়া সংবলিত এক–‌একটা পোস্টার আঁকেন, আর তা টাঙিয়ে দিয়ে যান পাতিরামের সামনে। ১৭২৫ সপ্তাহ ধরে চলছে এই প্রথা। তো, সেই পোস্টার–‌এই বেরিয়েছে ‘‌পাতিরাম’‌–‌এর ৯৪ বছর পূর্তির খবর। আর সেটা থেকে জেনে অনেক নিয়মিত ক্রেতাই তাপসকে জানিয়েছেন, শতবর্ষে ফুটপাতে ম্যারাপ বেঁধে তাঁরা পালন করবেন ‘‌পাতিরাম’‌–‌এর শতবর্ষ।
একসময় ‘‌পাতিরাম’‌–‌এর নিজেদের কবিতা– বিষয়ক পত্রিকা রাখতেন অভীক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই অভীকই পরে চালু করলেন ‘‌ধ্যানবিন্দু’‌। বিকল্প পত্রিকা–‌বইয়ের আরেক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। ভবিষ্যমান আরেক গর্বের প্রতিষ্ঠান। অভীক বললেন, ‘‌আরে পাতিরাম’‌ই তো আমাদের পথ প্রদর্শক। বিকল্প ধারার বইপত্র নিয়ে যে এমন একটা ‘‌ঠেক’‌ বানানো যেতে পারে, সে পথ তো ‘‌পাতিরাম’–‌ই আমাদের দেখিয়েছিল। সবরকম ঝুঁকি নিয়ে বাঙালির জীবনে ‘‌পাতিরাম’‌ একটি ‘‌‌ইউনিক’‌ ঘটনা।’‌
শতবর্ষের কাছে এসেও যে প্রবীণকে নবীনরা এমন ‘‌স্যালুট’‌ জানায় তার দীর্ঘজীবী হওয়া আটকায় কে?‌ ‌‌‌‌■

 

ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top