সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ষোড়শ শতকের গোড়ায় এক স্বৈরশাসকের খপ্পরে পড়েছিলেন শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান পুরুষ।
এ ছবিতে লিওনার্দোকে না এনে তার জায়গায় তার এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ তৈরি করেছেন সৃজিত। শিল্পের ভাষায় যাকে ‘‌সাবভার্সান’‌ বলে। এক মেকআপ শিল্পী সে। ডাকনাম ‘‌ভিঞ্চিদা’‌। নিমেষে হাতের কাজে প্রস্থেটিক মেকআপের ব্যবহারে বদলে দিতে পারে একজন মানুষের চেহারা। লিওনার্দো মুখ আঁকতেন ছবিতে। এই ভিঞ্চি তা আঁকে আসল মুখের ওপর। এবং আসল ভিঞ্চির মতোই মনমতো প্রতিষ্ঠা পাবার ব্যাপারে সে হতভাগ্য। অতএব দুয়ে দুয়ে চার করে সিজার বোর্জিয়ার মতোই তার সামনেও এসে দাঁড়ায় আদি বোস (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌। আসে যেন ফাউস্টের সেই চিরন্তন শয়তানী শর্ত নিয়ে, যে, আমি তোমায় প্রতিষ্ঠা দেব, তুমি আমায় তোমার আত্মার ভেতরে থাকা বিবেক দাও।
এই আদি বোসের একটা ছোট্ট ভয়ঙ্কর অতীত আছে। সে আঠারো বছরের জন্মদিনে পা দেওয়ার ঠিক আধ ঘণ্টা আগে নিজের বাবাকে ঠাণ্ডা মাথায় নৃশংসভাবে খুন করে। বাবা মদ্যপ অবস্থায় মাকে মারছিল বলে। বয়সের কারণে তার জেল বা ফাঁসি হয় না। হোমে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে সে আইন নিয়ে পড়াশোনা করে। ক্রিমিনাল ল–ইয়ার হতে চায় সে। তবে আইনের পরীক্ষা দিয়ে নয়। বরং সে বেরিয়ে এসে হাইকোর্টের বাইরে চেয়ার–টেবিল নিয়ে বসে ফৌজদারি কেসের উকিলদের আইনি পরামর্শ দিতে থাকে। এবং (‌সিনেমার চিত্রনাট্য অনুযায়ী)‌ তার মুক্ত–চেম্বার রাশি রাশি পরামর্শপ্রার্থী উকিলে ভরে যেতে থাকে!‌ এই অবধি এ সিনেমায় বেশ একটা সাতের দশকের মশালা ফিল্ম গোছের ব্যাপার ছিল। সেটার ষোলোকলা আরও পূর্ণ হয় আদি বোসের জেলফেরত ‘‌রোডসাইড রবিনহুড’‌ হয়ে ওঠায়। সে পথেঘাটে ঘটে চলা নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিজস্ব স্টাইলে, যার একটি নমুনা পাওয়া যায় এক গণপিটুনি থেকে পালানো পকেটমারকে যখন সে নিজেই পিটিয়ে থানায় জমা করে আসে। আর আসার পথে আইন, নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কিছু কড়া সংলাপ শুনিয়ে দিয়ে আসে ডিসি ডিডি মারকুটে অফিসার বিজয় পোদ্দারকে (‌অনির্বাণ ভট্টাচার্য)‌।
তবে পরিচালকের নাম যেহেতু সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাই ছবি এইটুকু মশালাতে আটকে থাকেনি। চোর–পুলিস–উকিল খেলার এই ফর্মুলাকে তিনি অন্যভাবে বিচার করতে চেয়েছেন। সৃজিতের যে কোনও ছবিতেই একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বা তত্ত্বের ‘‌রেফারেন্স’‌ থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবার সৃজিত টেনে এনেছেন জার্মান দার্শনিক নিৎসের ‘‌সুপারম্যান’‌ থিওরির কথা। যেখানে নিৎসে বলেছিলেন ঈশ্বরের স্থান বর্তমান পৃথিবীতে শূন্য। তার জায়গায় শক্তির সেই ভারসাম্য রক্ষা করবে মহাশক্তির কোনও কোনও মানুষ। ইতিহাস বিষয়ে উৎসুক মানুষেরা জানেই এ রকম একটা অভিযোগ ওঠে যে নিৎসের এই ‘‌নৈরাজ্যবাদ’‌ থেকেই হিটলারের উত্থান। ‘‌সুপারম্যান’‌–এর অন্তিম পরিণতি।
এ ছবিতেও ইতিহাসের ঐ ধারাকে মান্যতা দিয়েই এক ‘‌ফ্যাসিস্ট’‌ মানুষের উত্থান দেখানো হয়। আদি বোসের বিচারে যারা অপরাধী, সেইসব মানুষদের শাস্তি দেয় আদি বোস। আর এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করে মেকআপ শিল্পী ভিঞ্চিদা। থ্রিলারের সবটা বলা বারণ, শুধু এটা বলা যায়, এই জড়ানোয় শেষ পর্যন্ত ভাল থাকতে পারে না ভিঞ্চিদা নিজেও।
ভিঞ্চিদার চরিত্রে রুদ্রনীল ঘোষ যেন মেকআপ করে অন্য চরিত্রে ঢোকেননি। প্রবেশ করেছিল অন্য চরিত্রের রক্তমাংসে। তার প্রেমিকার চরিত্রে সোহিনী সরকারকেও ভাল লাগে। তবে এ ছবির সবচেয়ে বড় তাস আদি বোসের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী। তাঁর হাঁটাচলা, সংলাপ বলা সব কিছুর মধ্যে চরিত্রের অপ্রকৃতিস্থতার জটিল ছায়াগুলো পোষা পায়রার মতো স্বচ্ছন্দে খেলা করেছে। দাপুটে অফিসারের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য সংলাপ বলার কায়দায় মাত করে দিয়েছেন। একটি দৃশ্যে ঋদ্ধি সেনও যথাযথ।
একটাই প্রশ্ন, ‘‌সুপারম্যান’‌ হয়ে ওঠার ভাবনার বিরোধিতা করতে করতে এ ছবির যে ক্লাইম্যাক্সটি গড়লেন সৃজিত, সেখানেও সেই ‘‌সুপারম্যান’‌ তত্ত্বই জোরদার হল না কী?‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top