সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ টুসকি। পরিচালনা:‌ অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ে:‌ পৌলমী বসু, কাঞ্চনা মৈত্র, প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, রাজেশ শর্মা, রানা মিত্র, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়, দেবরঞ্জন নাগ, অনামিকা সাহা, সঞ্জীব সরকার
নীচের মহল। ‘‌লোয়ার ডেপথস’‌। একগাদা খেটে খাওয়া দরিদ্র, বঞ্চিত, অপমানিত মানুষ। আর তাদের আগুন পোয়ানো, হঠাৎ তেতে ওঠা বস্তির কোনও একটা ঘটনা নিয়ে। একেবারে গোর্কির ছক মেনে চিত্রনাট্যকার, পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। এবার তার এই ট্র‌্যাজি–‌কমেডিটি সাজিয়েছেন। খিস্তি–‌খাস্তা, অপমান, ঠকানো, কামড়া–‌কামড়ি সব রেখে তার পাশে রেখেছেন ছোট্ট এক টুকরো নিষ্পাপ স্বপ্নকে। ভালো একটা স্কুলে ভর্তি হবার স্বপ্নকে। সেটাই এখানে ‘‌মিশন’‌। সেটাই এ ছবির চিত্রনাট্য নামক তাঁবুকে টানটান রাখার মূল ‘‌সাসপেন্স’‌।
এ ছবি একটু চড়া মাপে বাঁধা। অভিনয়ে, সংলাপে, ঘটনার নাটকীয়তায়। 
যেমন ছবির শুরুতে টুসকির মার বাচ্চার জন্ম দেবার অতখানি শট–‌এর প্রয়োজনই ছিল না। বড় পীড়াদায়ক এ দৃশ্যটি। কিংবা মুখরা মনামাসির (‌অনামিকা সাহা)‌ মুখে ভয়ঙ্কর চড়া রকমের গালিগালাজও অস্বস্তিকর।  
টুসকি এক মা মরা মেয়ে। মানুষ হয়েছে মাসির কাছে। সে অবশ্য এ তথ্য জানে না। অটো চালক বাবা (‌রাজেশ শর্মা)‌ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রায় কর্মহীন। মা রনিতা (‌কাঞ্চনা মৈত্র)‌ বাড়ি বাড়ি কাজ করে টুসকিকে বড় করছে। লেখাপড়া শেখাচ্ছে। রনিতার কাজ করা একটি বাড়ির মালকিন হৃদয়হীনা হলেও তার মেয়ে টুয়ার সঙ্গে ভারী ভাব হয়ে যায় টুসকির। টুয়ার মা যে কোনও মূল্যে চায় মেয়েকে নামী স্কুল সেন্ট জোসেফে ভর্তি করতে। তার জন্য পাড়ার ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতার (‌রানা মিত্র)‌ সঙ্গে যে কোনও অনৈতিক কর্ম করতেও সে প্রস্তুত। এদিকে টুসকি সাধারণ স্কুলে পড়লেও পড়াশোনায় ভাল। একদিন রনিতা এক অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে চ্যালেঞ্জ করে বসে টুয়ার মাকে যে টুসকিকে সে সেন্ট জোসেফে ভর্তি করবেই।
এরপর বস্তি জুড়ে শুরু হয় তার সমর্থনে দাঁড়ানোর তোড়জোড়। টাকা তোলা, ফর্ম আনা, টুসকিকে পড়ানো। আর সেই সূত্রে পর্দায় আসতে থাকে একের পর এক মজাদার চরিত্র। মাতাল কর্নেটওয়ালা (‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌, ভিক্ষা করা দাদু, দয়ালু ড্রাইভার, পা ভাঙা বিপ্লবী। শেষমেশ দুই ফাদারও (‌কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায় ও সঞ্জীব সরকার)‌। অনেকটা যেন সেই তিরিশ বছর আগের টেলিসিরিয়ালে ‘‌নুক্কড়’‌–‌এর বস্তি। হৃদয়ের উত্তাপে ঠাসা। এমন গল্পের শেষে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাকে ঢাকতেই অনিকেত এখানে বিপ্লবীর ধরা পড়তে চলাকে ঘিরে একটা বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করেছেন।
টুয়ার মা–‌র চরিত্রে পৌলমী বসু চমকে দিয়েছেন। মঞ্চের মতো পর্দাতেও তিনি খুবই সাবলীল। টুয়ার চরিত্রে ছোট মৌমি এবং টুসকির চরিত্রে ছোট্ট প্রিয়াঙ্কা বেশ ভাল। খরাজ মুখোপাধ্যায় বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের অভিনেতাদের মতো। পার্শ্বচরিত্রে থেকে ছবি টেনে নিয়ে যান। কাঞ্চনা মৈত্র প্রয়োজনীয় ঝাঁঝ এবং ওজন যোগ করেছেন। যোগ্যসঙ্গত করেছেন রাজেশ শর্মাও। অনেকদিন পরে মন ভরিয়ে দিলেন প্রদীপ মুখোপাধ্যায় ব্যক্তিত্বের সৌম্যতায়।
থোড়–‌বড়ি–‌খাড়া মার্কা ছবির ভিড়ের মধ্যে এ গল্পের রাজনীতি–‌সচেতনতা অন্য স্বাদ দেবার চেষ্টা করে। সেটা প্রশংসনীয়।   ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top