দ্বৈপায়ন দেব: দ্য স্কাই ইজ পিঙ্ক। পরিচালনা:‌ সোনালি বসু। অভিনয়ে:‌ প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, জাইরা ওয়াসিম, ফারহান আখতার, রোহিত সুরেশ শরাফ, ঈশান জ্যোৎসি।

‘‌‌হৃদয় খুঁড়ে কে হায় বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।‌’‌
তবু হৃদয় খুঁড়ে বেদনা–‌জাগানোরই ছবি ‘‌দ্য স্কাই ইজ পিঙ্ক’‌। আকাশের রং গোলাপি।
না, কোনও পরাবাস্তবতা নয়, বরং সোনালি বোস পরিচালিত এই ছবির চিত্রনাট্য বাস্তবিক এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এক মেয়ের আজন্মের অসুস্থতা আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলা। না, সোনালির এ’‌ছবি শুধু তাকে, মানে এ বিষয়কে নিয়ে কোনও ‘‌মরবিডিটি’‌ বা  বিষাদগ্রস্ততার ছক কাটেনি। খেলেনি চেনা পথে কোনও আবেগপ্রবণতার খেলাও। বরং মৃত্যু বা বিচ্ছেদকে জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ধরে নিয়ে উদ্‌যাপন করেছেন তাকে। এ’‌যেন মৃত্যুর এক পর্দা–‌‘‌‌সেলিব্রেশন’‌। সিনেমা তথা শিল্পের জীবনী শক্তির উদ্‌যাপন।
সোনালি মূলত নারী কেন্দ্রিক ছবি বানান। এর আগের দুই ছবি ‘‌আমু’‌ আর ‘‌মার্গারিটা উইথ এ স্ট্র’‌ সোনালির পরিচালনা–‌অবস্থানকে স্পষ্ট করেছিল। তিন নম্বর ছবিতে তা স্পষ্ট হল। এ’‌ছবিও মূলত মা ও মেয়ে–‌দুই বয়সের দুই নারীর গল্প। একটি মৃত্যুকে মাঝখানে রেখে যেখানে চলছে দু’‌জনের অন্যরকম এক ‘‌ক্যাম্পফায়ার’‌। জীবনের যাবতীয় আনন্দ আর সুখকে সীমায়িত শরৎ আর হেমন্তের মধ্যে আস্বাদ করে নেওয়া। কারণ, এরপরই শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকা আসন্ন শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যাবে তারে। 
সোনালি জানতেন প্রচলিত ছকের চিত্রনাট‌্যে তাঁর এই পাল্টা জীবন–‌দর্শনকে ধরা যাবে না। তাই শুধু দৃশ্যগত ভাবে নয়, তাঁর এই ‘‌কাউন্টার ট্রিটমেন্ট’‌, ট্র‌্যাজেডিকে কমেডিতে গড়িয়ে নেওয়াটা শুরু হয়েছে চিত্রনাট্যের ‘‌ন্যারেশন’‌ থেকেই। গোটা ছবিটাই দাঁড়িয়ে আছে এক নেপথ্য–‌সূত্রধারের ‘‌ভয়েস ওভার’‌–‌এর ওপর। এই সূত্রধারটি হল আইশা চৌধুরি (‌জাইরা ওয়াসিম)‌। যে মারা গেছে আগেই, তার ১৯ বছর বয়েসেই। আর সে তার পরিবারের গল্পটা বলছে, তাঁর মৃত্যু বা আসন্ন–‌মৃত্যু, ‘‌এ ডেথ ফোরটোল্ড’‌কে কেন্দ্র করে। বিষাদ দিয়ে নয়, বরং মজার, আনন্দের এক একটা ‘‌নোট’‌কে ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে তুলে এনে। যেখানে শুধু যে গল্প তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যম্ত প্রসারিত তাই নয়, বরং তা প্রসারিত তার মৃত্যুর পরের ঘটনা পর্যন্তও। সেখানে তার বাবা–মেয়ের এই মৃত্যুর স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর মা আঁকড়ে থাকতে চাইছে সেই স্মৃতিকে। সন্দেহ নেই, এই অংশটাই ছবির প্রাণকেন্দ্র। আর এই অংশটারও বিবরণ আমরা পাই মৃত আইশার ধারাবর্ণনা সূত্রেই। সন্দেহ নেই, প্রায় লাতিন আমেরিকান গল্প–‌উপন্যাসে মতো জীবনের তাঁবুতে ‘‌কার্নিভাল’‌। মৃত্যু, বাস্তবতা এসব নিয়ে এক অদ্ভুত নকশিকাঁথা বুনেছেন সোনালি। আপাতভাবে মনে হচ্ছিল, ‘‌কেয়ার ফ্রি অ্যাটিটিউড’‌–‌এ এ’‌ছবি‌ যেন আরেক ‘‌কাল্ট’‌ মহিলা–পরিচালক জোয়া আখতারের ‘‌জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’‌ বা ‘‌দিল ধড়কনে দো’‌র আত্মীয়। কিন্তু মৃত্যু আর বাস্তবতার এই কাটাকুটি খেলাটা খেলে সোনালি দেখালেন তাঁর চিত্রনাট্য আরও গভীরে। 
চারজনের ‘‌নিউক্লিয়াস’‌ পরিবারে আইশা ছাড়াও আছে তার মা অদিতি চৌধুরি (‌প্রিয়াঙ্কা চোপড়া)‌। বাবা নীরেন চৌধুরি (‌ফারহান আখতার)‌, আর সামান্য বড় দাদা ঈশান চৌধুরি (‌‌রোহিত সুরেশ শরাফ)‌। গল্পের মাঝপথে আসে আইশার স্মল টাইম ক্রাশ করণও (‌ঈশান জ্যোৎসি)‌। যে পথে শুরু থেকে আইশার গল্প–‌বলা এগোয়, তা অভিনব!‌ আইশা নিজের নয়, শোনাতে চায় মা–‌বাবার প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের গল্প যেখানে নানা মজাদার ‘‌ক্ল্যান্তিফ্লশ’‌ মুহূর্ত যেমন মিশে আছে, তেমনই আছে নানা ভুল বোঝাবুঝি ও  যৌনতার অস্বস্তিকর মুহূর্তের গল্প। এসব গল্পও নির্বিকার চিত্তে শোনাতে ভোলে না আইশা। ফলে চেনা সম্পর্কগুলো থাকে, কিন্তু চেনা অভ্যস্ত ‘‌ইয়ুকেশন’‌গুলো বদলে যায়। যেটা এ ছবির দেখার, হয়তো বারবার দেখার আকর্ষণ তৈরি করে।
চিত্রনাট্যের পরেই এ ’‌ছবির সবচেয়ে জোরের জায়গা ‘কাস্টিং’‌। হলিউড–ফেরত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এ–’‌ছবিতে গ্ল্যামারনির্ভর হয়ে থাকতে চাননি। বরং এতখানি অসমতল আর নানারকম আলো–‌ছায়ায় কণ্টকিত চরিত্র তিনি এই প্রথম করলেন এবং অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে অনয় এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। বলিউডের ‘‌মা’‌ ভাবনায় এ’‌চরিত্র একান্তই ব্যতিক্রম। ছবির দু’‌পর্বে ফারহান আখতার দু’‌রকমভাবে আকর্ষণীয়। ফ্ল্যাশব্যাক পর্বে তারুণ্যের ছটায়। মধ্যপর্বে বিষণ্ণতা আর ব্যক্তিত্বের মিশেলে। আর জাইরা ওয়াসিম তো হর্ষে–‌বিষাদে–ছেলেমানুষিতে গভীর দৃষ্টিপাতে এ ছবিতে ‘‌চেরি অন দ্য কেক’‌। এক্ষুণি স্বেচ্ছাবসর ছেড়ে ফিরে আসুন জাইরা।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top