সম্রাট মুখোপাধ্যায়: পরিচালনা:‌ ওম রাউথ। অভিনয়ে:‌ অজয় দেবগণ, কাজল, সইফ আলি খান, শারদ কেলকার।
এ যেন পর্দায় হলিউড লিখিত ভারত ইতিহাস। ওম রাউথের এই ছবির নামই শুধু ইংরেজিতে নয়, ‘‌তানাজি:‌ ‌দ্য আনসাং ওয়ারিয়র’‌ নামের এই ছবি মেজাজে চলনে দর্শনে সর্বত্রই নিখাদ হলিউডিয়ান।
কলমের বদলে শুধু এই ইতিহাস লেখা হয়েছে ক্যামেরায়। না, ডকু ফিচারের ধাঁচে তৈরি নয় এ ছবি। কিন্তু প্রোডাকশন ডিজাইনে সেট, সাজসজ্জা, অস্ত্রশস্ত্রাদি, রীতি, আদবকায়দা এ সবের ডিটেলিংসে প্রামাণিক ব্যাপারটা মানে মোঘল ও মারাঠাদের সেই আমলের সমস্ত ব্যাপারের হুবহুটা এত নিখুঁতভাবে ধরা হয়েছে যে সিনেমা দেখছি নাকি অবিকল ওই আমলে বসে আছি ‌বোঝা মুশকিল।
তানাজি:‌ দ্য আনসাং ওয়ারিয়র বানানো থ্রিডি প্রযুক্তিতে। এবং বলতে দ্বিধা নেই, প্রযুক্তিতে এতটা উঁচু মানের থ্রিডি ছবি হিন্দিতে এর আগে ভারতীয় দর্শক দেখেননি। আর এ কাজটা খালি গ্রাফিক্স ইঞ্জিনিয়ারদের কৃতিত্বে হয়েছে ভাবলে ভুল হবে। এক্ষেত্রে সমান সৃজন–‌বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন কেইকো নাকাহারাও, এ ছবির যিনি চিত্রগ্রাহক। নায়ক আর ভিলেনের শেষ যুদ্ধের যে পরিসমাপ্তি মুহূর্তটি, তা তো এই থ্রিডি রচিত ভাষ্য ছাড়া ভাবাই যায় না!‌
এ ছবি চিত্রনাট্যেও কিন্তু অনেকটাই হলিউডপন্থী। এ ছবি আসলে আদ্যন্ত এক স্পাই মুভি, তা সে গায়ে যতই মোঘল–‌মারাঠা দ্বন্দ্বের আলখাল্লা জড়ানো থাক। এ ছবি আসলে এক সেনানায়ক বনাম এক একক গেরিলা যোদ্ধার লড়াইয়ের গল্প। বলাই বাহুল্য, সেই যোদ্ধাই তানাজি, এ ছবির নামচরিত্র। সুবেদার তানাজি মালুসারে (‌অজয় দেবগণ)‌, মারাঠা মহারাজ ছত্রপতি শিবাজির (‌শারদ কেলকার)‌ বিশ্বস্ত বন্ধু তথা সেনানায়ক। যার ছেলের বিয়ে। কিন্তু দেশের জন্য সেই উৎসব স্থগিত রেখে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াইয়ে। তার স্ত্রী সাবিত্রীবাইও (‌কাজল দেবগণ)‌ স্বামীর সিদ্ধান্তের শরিক হয় যথার্থ বীরাঙ্গনার মতোই।
তানাজির জন্য রণাঙ্গন হয় মহারাষ্ট্রে পাহাড়ের ঢালে কোন্ধনা দুর্গ আর তার আশপাশের অঞ্চল। ওই দুর্গ এমন এক ঢালে, যেখান থেকে তোপ চালালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিবাজির দুর্গ। আর সেই লক্ষ্যেই আসে মধ্যভারতের উদয়ভান সিং রাঠোর (‌সইফ আলি খান)‌, তৎকালীন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নৃশংস সেনানায়ক। যে কুমিরের মাংস খায় রোস্ট করে!‌ যে বন্দিদের শরীরে নানারকম উৎপীড়ন করে মর্ষকামী আনন্দ পায়। যে একই সঙ্গে দুরন্ত বুদ্ধি ও আসুরিক শক্তির অধিকারী। প্রায় এক সুপার ব্ল্যাকম্যান। এই ক্রুরতার অংশগুলোতে প্রায় ‘‌শেক্সপিয়রিয়ন অ্যাক্টর’‌দের মতো কাজ করেছেন সইফ। ভয়াবহ লেগেছে তাঁকে। অজয় ওরফে তানাজির কেরামতির দিকেই ঢলে চিত্রনাট্য। তবু অভিনয় গুণে সইফই এ ছবির রাজা।
তানাজির অংশে আকর্ষণীয় হল মারাঠাদের গেরিলা লড়াই। যা ইতিহাস প্রসিদ্ধ। সিনেমায় তাতেই মিশিয়ে নেওয়া হয়েছে হলিউডের স্পাই মুভিজ–‌এর আদল। উদয়ভান যে স্থলপথ ব্যবহার করে কোন্ধানা আসছে, সে–‌পথ মারাঠা–‌বাহিনী নিয়ে অবরোধ করে তানাজি। কিন্তু খলবুদ্ধি ব্যবহার করে, সে অবরোধ এড়াতে জলপথে দুর্গে চলে আসে উদয়। এক্ষেত্রে দুই বিশ্বাসঘাতক মারাঠারও ভূমিকা থাকে। এই বিশ্বাসঘাতকার কাহিনি ছবির অন্যতম তাস। অহেতুক কিছু নাচগানের দৃশ্য হাস্যকর লেগেছে। 
এ ছবির আর একটা দুর্বলতা হল, যুদ্ধের এইসব কৃৎকৌশল দেখাতে গিয়ে ছবির ভেতরে মানবিক মুহূর্তগুলো বড্ড কম এসেছে। শুধু হলিউডি রোমাঞ্চ দিয়ে তা হয় না। বলিউডি সেন্টিমেন্ট তা পারে। কিন্তু এ ছবি ততটা বলিউডি নয় যে!‌ তার ওপর নায়কও প্রযুক্তির জালে ঘেরা। আর  সত্যি কথা বলতে কী, কাজলের এ ছবিতে তেমন কিছু করার নেই, মাঝে মাঝে বীরাঙ্গনার চরিত্রে রোল কলে সাড়া দিয়ে যাওয়া ছাড়া!‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top