সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‌●‌ সুপার থার্টি, পরিচালনা:‌ বিকাশ বহেল। অভিনয়ে:‌‌ ঋত্বিক রোশন, ম্রুনাল ঠাকুর, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, নন্দিতা সিং, বীরেন্দ্র সাক্সেনা, আদিত্য শ্রীবাস্তব।
এ–‌ও এক ধরনের ম্যাচ জেতার ছবি। টিম তৈরি করার ছবি। সব বাধাকে সরাতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার ছবি। এ ছবি আদতে যেন অন্তরে অন্তরে ‘‌কোনি’‌ ছবির আত্মীয়। শুধু খেলা নয়, এ ছবির কেন্দ্রে পড়াশশোনা, পরীক্ষা জেতার গল্প।
এ ছবিকে তা বলে ‘‌এডুকেশনাল ফিল্ম’‌ বলে ভাবলে ভুল ভাবা হবে। কারণ, নিছক পড়াশোনার গল্প এ নয়। বরং জীবনের অনেক বড় উঠোনের গল্প। যেমন উঁচু দরের স্পোর্টস ফিল্ম নিছক খেলাধুলোর গল্প বলে না। বলে জীবনের লড়াইয়ে জেতার গল্প। এ চিত্রনাট্যও তাই।
ফলে নিছক ‘‌লেখাপড়া করে যে হাতিঘোড়া চড়ে সে’‌ গোছের আপ্তবাক্য শোনানোর ছবি এটা নয়। বরং এ এক অনেক বড় লড়াইয়ের গল্প। সামাজিক লড়াই। যা চলে আসছে সেই মহাভারতের যুগ থেকে। পক্ষপাতি দ্রোণাচার্যকে বিচারক মেনে অর্জুন আর একলব্যের বিরোধের কাহিনী থেকে যেখানে শিক্ষার অধিকার হচ্ছে লক্ষ্যবস্তু। তার অধিকার অবাধ থাকবে, নাকি রাজার আর ধনীর ছেলেরাই কেবল পাবে তার অধিকার?‌ মহা–‌ভারতবর্ষের এই স্থান–‌কাল ছাপানো চিরকালের দ্বন্দ্বের গল্পটাই নতুন করে গুছিয়ে নিয়ে আবার বলেছে ‘‌সুপার থর্টি’‌ বিকাশ বহেল–‌এর (‌‘‌কুইন’‌খ্যাত)‌ পরিচালনায়।
এ চিত্রনাট্য অবশ্য নিছক কাহিনী নয়। এর একটা সত্য–‌ভিডিও আছে। বিহারের একদা ‘‌কোচিং–‌ক্লাস–‌সুপার–‌রণ–‌রক্ত–‌সফলতা’‌ তাই জীবনের সবখানি নয়। বরং বঞ্চিত মানুষের জন্য লড়াই করার মাঝে থাকে জীবনের যে ‘‌সুপক্ব যবের ঘ্রাণ’‌ তা সে বুঝতে পারে। বেরিয়ে আসে বাণিজ্যের খাঁচা ছেড়ে। শুরু হয় নতুন প্রচেষ্টা। দরিদ্র ছেলেমেয়েদের মধ্যে থেকে মেধাবী ৩০ জনকে বেছে নিয়ে তাদের বিনাপয়সায় কোচিং করিয়ে আইআইটি প্রবেশিকার জন্য তৈরি করা ফল কী হয়, তা বোধহয় অনুমান করাই যায়। কারণ সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই জীবনও বড় লড়াইয়ে বরাবর মহৎ লড়াকুর পক্ষে। আর তা থেকেই মহাকব্য হয়।
এই ঘটনার গল্পটাই বলতে গিয়ে ‘‌মহাকাব্যিক’‌ একটা ‘‌অ্যাপ্রোচ’‌ এনেছেন ছবিতে বিকাশ। যা তাঁর ‘‌কুইন’‌ ছবির উত্তর–‌আধুনিক ‘‌প্যাটার্ন’‌–‌এর থেকে আলাদা। এ ছবি বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েও ‘‌ডকু ফিচার’‌–‌এর বাস্তবধর্মী আদলে তৈরি হয়নি। বরং ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌ আদল রেখেই বাণিজ্যিক ফর্মুলা ছবির কেতায় বানানো ‘‌সুপার থার্টি’‌। সেটা অবশ্য একটু চোখে লাগছে। কারণ, সাম্প্রতিককালের যত রিয়েলিটি বায়োপিক বা বাস্তবধর্মী ঢঙেই বানানো, তাতে অহেতুক টেকনিক্যাল মাউন্টিং থাকে না। নাম ভূমিকায়ও বাছা হয় রাজকুমার রাও বা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির মতো ‘‌অ্যাভারেজ’‌ চেহারার অভিনেতাদের। এ ছবিতে সেখানে ঋত্বিক রোশন। ব্যাপক মেকআপ মুখচোখে ‘‌ডি গ্ল্যামারাইজেশন’‌–‌এর চূড়ান্ত করে ছেড়েছে। কিন্তু তবু যে ব্যাপারটা সাজানো সাজানো লাগছে, এটা মানতেই হবে। তবে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বড় গন্ডগোল করেছে, তা হল ক্রমাগত পেছনে একটা ‘‌মিউজিক’‌ বেজে চলা। সংলাপও বেশ চড়া মাপের। কোথাও কোথাও তো মনে হয়েছে এমনও যে সাতের দশকের অমিতাভ বচ্চন অভিনীত চরিত্রের সংলাপ শুনছি। যেমন, ‘লাঙড়ে ঘোড়েসে ডার্বি নেহি জিতি যাতি।’‌ ব্যাপারটা বুঝে ঋত্বিকও তাঁর অভিনয়ে কোথাও কোথাও বেশ একটা ‘‌অমিতাভ–‌উপাদান’‌ মেজাজি ভাবে যোগ করে নিয়েছেন।
ছবির গোড়াতে এই ফর্মুলার ছকটা আছেও। আনন্দের সৎপিওন বাবা (‌বীরেন্দ্র সাক্সেনা অনবদ্য অভিনয় করেছেন, ছবির সেরাও বলা যায়)‌ ছেলেকে কেমব্রিজ পাঠাতে পারেন না টাকার অভাবে। এরপর সেই দুঃখে মারাও যান। এই দৃশ্যে সাইকেলের চেন ছিঁড়ে যাওয়াটা প্রতীক হিসেবে নাটকীয় হলেও, সুপ্রযুক্ত। অভিনবও। এরপর আনন্দ শুরু করে পাঁপড় বিক্রি। এই পর্বে কেমব্রিজের আমন্ত্রণ আসা চিঠি দিয়ে পাঁপড়ের মোড়ক বানানোটা অবশ্য অতি অতি–‌নাটকীয়।
এ রকম নানা অতিনাটকীয় ব্যাপার–‌স্যাপার আছে ছবি জুড়েই। কিন্তু তবু এ ছবি সফল, কারণ বেশ কিছু মুহূর্তে চোখে জল আনে। কারণ, এ ছবি উদ্দেশ্যে ও রাজনীতিতে খুঁতহীন। শিক্ষালয়ে ঢোকার মুখে একদল সুবিধাভোগী মানুষ নিজেদের স্বার্থে যে বড় পাথরটা বাধা হিসেবে ফেলে রেখেছে, তাকে নড়াতে চেয়েছে এ ছবি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top