সম্রাট মুখোপাধ্যায়: পরিচালনা:‌ প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য, অভিনয়ে:‌ ঋত্বিক চক্রবর্তী, অপরাজিতা ঘোষ, জ্যোতিকা জ্যোতি, রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, সোহম মৈত্র, সায়ন ঘোষ।
শরৎচন্দ্র আছেন। এবং শরৎচন্দ্র নেই।
চিত্রনাট্যের প্লটে আছেন। ব্যাখ্যায় নেই। পর্দায় নিটোল শরৎ–‌কাহিনি দেখে পারিবারিক আমোদ পাবেন ভেবে যঁারা এ ছবি দেখতে আসবেন, তঁারা হতাশ হবেন এ ছবি শেষ পর্যন্ত দেখে।
এ ছবিতে শ্রীকান্তই (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌ প্রধান চরিত্র এবং তাকে ঘিরে তার একদা ‘‌মেন্টর’‌ ইন্দ্রনাথ (‌সায়ন ঘোষ)‌, অন্নদা দিদি (‌অপরাজিতা ঘোষ)‌, রাজলক্ষ্মী ওরফে পিয়ারি (‌জ্যোতিকা জ্যোতি)‌, অন্নদা দিদির বর (‌মূল কাহিনিতে সাপুড়ে ছিল, এখানে তান্ত্রিক হয়েছে)‌ সাহুজি, শিকারী কুমারজি এখানে যার নাম হয়েছে হুকুমচঁাদ (‌রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়)‌, রাজলক্ষ্মীর অনুগত সহচর— এরা সবাই–‌ই আছে, স্ব–‌স্ব অধিষ্ঠানেই আছে, কিন্তু চিত্রনাট্যে প্রদীপ্ত এদের পরিণতিগত অবস্থানগুলোকে বদলে দিয়েছেন। কারণ তিনি আসলে যা বানাতে চেয়েছেন তা যতটা না শরৎবাবুর শ্রীকান্ত, তার থেকে বেশি ‘‌শ্রীকান্ত, ২০১৯’‌। ছবির শুরুতেই মনে করিয়ে দেওয়া হয় সদ্যই এ উপন্যাস শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। আর সে উপলক্ষেই এই ‘‌রিভিজিট’‌–‌এর আয়োজন।
প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের এ ছবি মূল শরৎ কাহিনির উদ্দেশ্য–‌বিধেয়র প্রতিপক্ষও হয়ে উঠছে। এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্তে পৌঁছচ্ছে যে তা অন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শরৎ–‌পাঠকদের তুমুল আপত্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
দু–‌একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। মূল শরৎ কাহিনিতে শ্রীকান্ত–‌ইন্দ্রনাথ–‌আখ্যানের মূল সুর অ্যাডভেঞ্চারের রোমান্টিকতা। বিশ শতকের সূচনায় গ্রামীণ পটভূমিকায় দুই কিশোরের সেই মুক্ত দামালপনা পরাধীন দেশের পাঠককে এক অন্য বন্য রোমান্টিকতার সন্ধান দিয়েছিল। এখানে সেই দামালপনা আছে, রোমান্স আছে— সবই আছে কিন্তু ছবি জুড়ে যে নৈরাশ্য থাকে বা ছবির শেষে যে ভয়াবহ ভায়োলেন্স ও ধ্বংস আসে, তা কতটা মূল শরৎ কাহিনির আত্মার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সে প্রশ্ন উঠেই যায়। মূল কাহিনিতে শ্রীকান্ত–‌রাজলক্ষ্মীরা এক হার–‌না–‌মানা মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনাকে বহন করছিল।
ইন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে শ্রীকান্তকেও দিশি মদ, উঁকিমারা যৌনতা ইত্যাদি অবাধ অভ্যস্ত করে দেখানোর জন্য তাকে পারিবারিক বৃত্তের বাইরে এনে ফেলা হয়েছে। এতে শ্রীকান্ত প্রথম পর্বের অনেকটাই এনে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এতটা অবাধ ব্যাপার–‌স্যাপারে অভ্যস্ত হওয়া গ্রামের একজন পরিচিতিসম্পন্ন পরিবারের ছেলের পক্ষে স্বাভাবিক কিনা (‌একই কথা খাটে কিশোরী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে পথেঘাটে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রেম করার ক্ষেত্রেও)‌ সে সন্দেহ থাকবেই। এর ওপর প্রায় বিনা প্রস্তুতিতেই যেভাবে সাহুজিকে মেরে ফেলে শ্রীকান্ত, তাও অবাস্তব লাগে!‌ এই ‘‌বিনা প্রস্তুতি’‌ ব্যাপারটা অবশ্য ছবি জুড়েই আছে। বহু জায়গাতেই চরিত্রগুলি যথাযথ মানবিক রক্তমাংস পায়নি, তারা চিত্রনাট্যকারের কিছু ‘‌আইডিয়া’‌র বাহক।
তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে শ্রীকান্তকে ছবির শেষে মেরে ফেলা!‌ প্রথম পর্বেই যদি শ্রীকান্ত মারা যায়, তবে এর পরের পর্বের কাহিনিগুলো আসবে কীভাবে?‌ একটি উপন্যাসকে শতবর্ষের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তার মূল চরিত্রকে মাঝপথে মেরে ফেলাটা কি নীতিগতভাবে সঙ্গত?‌ শিল্পগতভাবেও খুব সক্ষমতার পরিচয়?‌ 
অবশ্য এটাও ঠিক, প্রদীপ্ত এ কাহিনিতে সমকালীন ভারতবর্ষের ‘‌লাভ জিহাদ’‌, হিংসা ইত্যাদি ‘‌ভায়োলেন্স’–‌এর মধ্যে দিয়ে একটা ‘‌জার্নি’‌ করতে চেয়েছেন। সে ব্যাপারে তিনি সমাজ সচেতনতারই পরিচয় দিয়েছেন। চালু ছকে ফ্ল্যাটবাড়ি বা ত্রিকোণ সম্পর্কের খুনসুটিও তিনি বানাতে চাননি। তিনি ভালো করতেন এই প্লটকে বা ভাবনাকে সম্পূর্ণ মৌলিক এক চিত্রনাট্যের কাঠামোয় ধরলে। পরিচিত কাহিনির জনপ্রিয় অবলম্বনটুকু না নিলে ব্যাপারটা এত ‘‌হঁাসজারু’‌ লাগত না। আরও একটা কথা, শেষে ওই ‘‌ভায়োলেন্স’‌ বা হত্যা দেখিয়ে তিনি যদি একটা ‘‌রাজনৈতিক’‌ বক্তব্যই রাখতে চান, সে ক্ষেত্রে তঁাকেই জোরালভাবে উপস্থিত করতে পারতেন। শেষে আবার দু–‌তিন রকম বাস্তব জড়াজড়ি করে আসায়, দর্শক কোনটা নেবেন তা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। ‘‌রেজিমেন্টেড’‌ ছবির শেষ এত মুক্ত হওয়া উচিত নয় বোধহয়।
ঋত্বিক চক্রবর্তী আগাগোড়াই শুধু চরিত্রকে নয়, সিনেমাকেও ধরে রেখেছেন। তার পাশে জ্যোতিকা জ্যোতির অভিব্যক্তি বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে কম ও আড়ষ্ট লেগেছে। সায়ন ঘোষ নজর রেড়েছেন। ভাল লাগে সোহম মৈত্রকে। অপরাজিতা ঘোষের বিশেষ কিছু করার নেই চিত্রনাট্যে। রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বরং খল চরিত্রে দাপুটে লেগেছে।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top