অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: তিনি এক মিষ্টি প্রবীণা। মিষ্টি, কিন্তু খিটখিটে। ভেতরের ভালবাসা চাপা থাকে তাঁর বাইরের কাঠিন্যে। এই ‘‌উপমা’‌র সঙ্গে কোনও মিল নেই ‘‌দেয়া নেয়া’‌ কিংবা ‘‌তিন ভুবনের পারে’‌র তনুজার। কিন্তু, ‘‌সোনার পাহাড়’‌-‌এর উপমার চরিত্রে যেন তাঁকে ছাড়া আর কাউকেই ভাবা যাচ্ছে না। ছবিটা দেখার পরে তো নয়-‌ই। এবং ‘‌সোনার পাহাড়’‌-‌এ উপমার চরিত্রে তাঁকে নির্বাচন করে পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় যে যথার্থ কাজটাই করেছেন এবং এই চরিত্রে তনুজাকে পাওয়া বাংলা ছবির দর্শকদের একটা বড় প্রাপ্তি, সন্দেহ নেই।
এ-‌ছবি নেহাৎ-‌ই মা, ছেলে এবং পুত্রবধূর কূটকচালির গল্প নয়। হ্যঁা, এ ছবিতে মায়ের সঙ্গে ছেলের দূরত্বের কথা আছে, পুত্রবধূকে একেবারে মেনে না-‌নেওয়া শাশুড়ির গল্প আছে। কিন্তু এই ছবি এক সুদূরপ্রসারী ভাবনার গল্প বলে। সেই গল্পের কেন্দ্রে আছে এক অনাথ বালক বিটলু (‌শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়)‌। আছেন অনাথ আশ্রমের পাশে দাঁড়ানো এক চকলেট-‌দাদু (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌। যে চকলেট-‌দাদুর সঙ্গে  পাড়ার মেয়ে উপমার চেনা-‌জানা সেই কবে থেকে। মাঝখানে চলে গেছে অনেকগুলো বছর। আবার হঠাৎ দেখা। তিরতিরে মন-‌কেমন করা এক সম্পর্ক। কিন্তু স্পষ্ট করা হয়নি কোথাও। অথচ, বিচ্ছু বিটলু একদিন দুম করে উপমাকে বলে দেয়, ‘‌চকলেট-‌দাদু তোমার বয়ফ্রেন্ড’‌। এই বুড়ো বয়সেও ভারী লজ্জা পান উপমা!‌ আর, আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। 
এই ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌এন্ট্রি’‌টাও চমকপ্রদ। অনাথ আশ্রমের অনুষ্ঠান। সেখানে বিটলুকে নিয়ে বসে আছেন উপমা। মঞ্চে প্রবেশ চকলেট-‌দাদুর। তাঁর কণ্ঠে গান— ‘জীবনে কী পাব না’‌। সৌমিত্র-‌তনুজার একটুকরো নস্ট্যালজিয়া যেন আস্তে ছুঁয়ে যায় দর্শকদের।
একা থাকেন উপমা। বনিবনা নেই ছেলে (‌যিশু সেনগুপ্ত)‌ আর ছেলের বউয়ের (‌অরুণিমা ঘোষ)‌ সঙ্গে। তারা থাকে আলাদা ফ্ল্যাটে। একদিন, ঘটনাচক্রে, ছেলের বন্ধু (‌পরমব্রত)‌ এসে উপস্থিত উপমার ফ্ল্যাটে। সে এক এন জি ও-‌র সঙ্গে যুক্ত, যারা অনাথ ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা করে। তাদেরই একজন বিটলু, নিয়মিতভাবে সারাদিনের জন্যে ‘‌আশ্রয়’‌ পায় উপমার বাড়িতে। সন্ধ্যায় বিটলু ফিরে যায় অনাথ আশ্রমে। এই ব্যবস্থাটা প্রায় বাধ্য হয়েই যেন মেনে নেন উপমা। তারপর, ক্রমশ, বিটলুর সঙ্গে উপমার এক গাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
উপমা যেমন এক মিষ্টি এবং খিটখিটে বৃদ্ধা, বিটলু তেমনি এক মিষ্টি এবং বিচ্ছু ছেলে। উপমার সঙ্গে বিটলুর বিচ্ছুপনা এবং বন্ধুত্বের নানা টুকরো কোলাজে উজ্জ্বল এই ছবি। ফ্ল্যাশব্যাকে আসে উপমার সঙ্গে তাঁর ছেলের ছোটবেলার নানান দৃশ্য।
এই ছবির চরিত্রগুলোকে নেহাৎ-‌ই সাদা কিংবা কালোয় আঁকেননি পরিচালক। কাঠিন্য কিংবা দূরত্বের পাঁচিলের ভেতরে মানুষের যে বিষাদ এবং একাকীত্ব লুকিয়ে থাকে, সেটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত। না হলে উপমার ছেলে (‌যিশু)‌ কেন হিংসে করবে ওইটুকু  বিটলু (‌শ্রীজাত)‌কে। কেন বিটলুকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাববে?‌
পরিচালক পরমব্রতর আগের তিনটি ছবির সঙ্গে  এই ছবির নির্মানে কোনও মিল নেই। কাহিনী এবং চিত্রনাট্যে পরমব্রত এবং পাভেল গভীর একটা পথে হাঁটতে চেয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। ছবির শেষে ‘‌কাঞ্চনজঙ্ঘা’‌র দৃশ্যটি হয়ত সত্যজিৎ রায়ের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ছবির গল্পের পরিণতির আভাসও হয়ত আগেই আঁচ করা যায়। কিন্তু, তাতে কী আসে যায়!‌ চমক তো এছবিতেও আছে। উপমা, বিটলুর নিরুদ্দেশ যাত্রাই তো তার প্রমাণ। কিন্তু  শুধু বিষন্নতা নয়, বিষন্নতায় মিশে যাওয়া আনন্দ দিয়েই ছবিটা শেষ করতে চেয়েছেন পরিচালক। এবং সেই সোনার পাহাড় অনেক কথা বলে যায় দর্শকদের।
এ ছবির সিনেমাটোগ্রাফি (‌শুভঙ্কর ভড়)‌ ও বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। সঙ্গীত (‌নীল দত্ত)‌ও  প্রশংসনীয়।
এ ছবিতে তনুজার প্রত্যাবর্তন এক বড় প্রাপ্তি সন্দেহ নেই। তাঁর অভিনয় মনে থেকে যাবে। যথারীতি উজ্জ্বল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ভাল লাগে যিশু, পরমব্রত, অরুণিমাকে। স্বল্প অবকাশে মনে থেকে যান গার্গী রায়চৌধুরি। ট্যাক্সিওয়ালার চরিত্রে লামাও খুব ভাল। আর, নিষ্পাপ মুখের বিচ্ছু বালক বিটলুর ভূমিকায় ক্লাস টু-‌এর মাননীয় শ্রীযুক্ত শ্রীজাত বন্দ্যোপাদ্যায়কে অসাধারণ বললেন কম বলা হয়। মনে হয়, বিটলুর সঙ্গে আমাদেরও কেন বন্ধুত্ব হয় না।   ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top