অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌শাহজাহান রিজেন্সি’‌ রিলিজের আগে বারবার প্রচারে আনা হচ্ছিল, এই ছবি হল ‘‌চৌরঙ্গী’‌র ‌জাতিস্মর‌। ছবিতেও বলা হয়েছে এটা শংকরের চৌরঙ্গী নয়, চৌরঙ্গীর জাতিস্মর। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের এই নতুন ছবিটি দেখার পর কিছুতেই একথা মানা সম্ভব হল না। এই ছবি ৫০ বছর আগে মুক্তি পাওয়া ‘‌চৌরঙ্গী’‌ সিনেমার রিমেক। ৫০ বছর আগের কলকাতাকে পুনঃসৃজন করা কঠিন। তাই ঘটনাবৃত্তকে আজকের সময়ে নিয়ে এসেছেন সৃজিত। এবং পরিচালক হিসেবে সৃজিত অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর পক্ষে সম্ভব একটা পুরনো ছবিকে নতুন ঘরনায় ঝকমকে, স্মার্ট নির্মানে আজকের মতো করে নির্মান করা। সৃজিতের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না।
কিন্তু প্রশ্ন উঠবে ‌জাতিস্মর‌ প্রসঙ্গ নিয়ে। সৃজিতের অন্যতম সেরা ছবি ‘‌জাতিস্মর’‌। যখন বহু সমালোচক মুক্তির আগেই ‘‌জাতিস্মর’‌কে ‘‌অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’‌র রিমেক বলে চিহ্নিত করতে চাইছিলেন, তাঁরাও ছবি মুক্তির পর বুঝতে পেরেছেন, ‘‌জাতিস্মর’‌ কোনও রিমেক নয়, ‘‌জাতিস্মর’‌ একেবারেই সৃজিতের ভাবনার গভীরতা নিয়ে উজ্জ্বল এক নতুন গল্প। নতুন ভাবনা। সত্যিই চমকে দিয়েছিলেন সৃজিত তাঁর ‘‌জাতিস্মর’‌-‌এ। এবং মুগ্ধ করেছিলেন আমাদের।
এই ‘‌মুগ্ধতা’‌টাকে কি সৃজিত ব্যবহার করলেন তাঁর ‘‌শাহজাহান রিজেন্সি’‌র প্রচারে?‌ একজন দর্শক হিসেবে বলতে পারি, ঠিক করেননি সৃজিত। ‘‌জাতিস্মর’‌কে ‘‌জাতিস্মর’‌-‌এর মতো থাকতে দিন। ‘‌জাতিস্মর’‌ নিয়ে আমাদের মুগ্ধতাকে ব্যবহার করার ‘‌অধিকার’‌ আপনার নেই, সৃজিত।
৫০ বছর বাদে এই ছবির পুনর্নির্মান করলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। ঝকমকে ও দক্ষ নির্মাণ। কিন্তু ছবি দেখে এটা স্পষ্ট, সেই ‘‌চৌরঙ্গী’‌ সিনেমার সামগ্রিক কাঠামোটা থাকলেও, এই ছবি আজকের ছবি। ফলে চরিত্রগুলোও আজকের সময়ের। ৫০ বছর আগে ‘‌চৌরঙ্গী’‌র শংকর (‌শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়)‌ বেচু-‌বাবুর কাজে ক্লান্ত হয়ে কার্জন পার্কের বেঞ্চে শুয়ে জিরিয়ে নিচ্ছিল।

‘‌শাহজাহান রিজেন্সি’‌তে সেই শংকরের নাম পাল্টে রুদ্র করে দিয়েছেন সৃজিত। সেই রুদ্র বেকার হয়ে কার্জন পার্কের বদলে গড়িয়াহাটের মোড়ে দাবার ঠেকে এনার্জি সংগ্রহ করছে। এইভাবে ‘‌চৌরঙ্গী’‌কে সমসময়ের করে তুলেছেন সৃজিত। তারপর শুরু হয় হোটেলের ভেতর-‌মহলের গল্প। এবং এই পৃথিবী হোটেল-‌নিবাস, এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পর্বে পর্বে সাব-‌হেডিং দিয়ে ছবিটিকে সাজিয়েছেন সৃজিত। শাহজাহান হোটেলের অন্দর-‌কাহিনী পর্বে পর্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই পর্বে প্রেম আছে, ব্যবসা আছে, ব্যবসা বাড়াতে নারীকে ব্যবহারের আদিম কৌশল আছে, যৌনতা আছে এবং আছে এক অন্তর্লীন বিষাদ, যা স্পষ্টভাবেই তুলে এনেছেন সৃজিত।
‘‌চৌরঙ্গী’ ছবির পর পেরিয়ে গেছে অর্ধ-‌শতক। ফলে, সেদিনের ছবির সঙ্গে আজকের ছবির কথাবার্তা, আচার, আচরণের তুলনা করাটা ঠিক নয়। ঠিক নয় উত্তমকুমার, উৎপল দত্ত বা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই ছবির আবির চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত বা সুজয়প্রসাদের তুলনা করা। আর, সৃজিত তো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই সব চরিত্রের নাম পাল্টে দিয়েছেন। এ ছবিতে কোনও স্যাটা বোস নেই। শংকরও নেই। ফলে, তুলনাটাও অপ্রয়োজনীয়।
শাহজাহান হোটেল এক অন্য পৃথিবী। সেই পৃথিবীর গল্প আজও আকর্ষনীয়, যেটা প্রমাণ করেছেন সৃজিত। অভিনয়ে আবির চট্টোপাধ্যায় আর পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের জুটি তরতর করে এগিয়েছে। রুদ্রনীল ঘোষ আর কাঞ্চন মল্লিক একেবারে অন্যরকম এবং দুর্দান্ত। সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রথম দৃশ্যেই নজর কেড়ে নেন। ভাল লাগে অঞ্জন দত্ত ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় তাঁর চরিত্রের আনন্দ, বেদনা নিয়ে এছবিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল। মমতাশঙ্করের দক্ষতা তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়। একটি দৃশ্যে সম্মুখ-‌সমরে মমতাশঙ্কর ও স্বস্তিকা—স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবে। ঋতুপর্ণা এছবির অতিথি শিল্পী হয়েও মনে থেকে যাবেন।ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর মিউজিক উল্লেখযোগ্য।সৃজিত মুখোপাধ্যায় ‘‌শাহজাহান রিজেন্সি’‌কে আজকের সময়ে সাজিয়েছেন। তাঁর দক্ষতা, সন্দেহ নেই, প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু, রিমেক নয়, সৃজিত মুখোপাধ্যায় নিজের ভাবনা আর সৃষ্টি দিয়েই সার্থক। মনে রাখা দরকার, ‘‌জাতিস্মর’‌ কোনও পুরনো ছবি নয়। নতুন এবং চিরকালীন। সেটাই তাঁর পথ।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top