সম্রাট মুখোপাধ্যায়: দুই বৃদ্ধ মানুষ। আর দুই যুবক–‌যুবতী।
বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা। আর ঘর বাঁধতে চলা স্বপ্ন।
এই বিপরীতমুখী স্রোতকে এক চিত্রনাট্যে গেঁথে আদ্যন্ত পারিবারিক এক ছবি বানাতে চেয়েছেন পরিচালক লীনা‌ গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল ব্যানার্জি। যা একান্ত আজকের সামাজিক এক ব্যাধির কথা বললেও, মেজাজে–‌চলনে পুরনো পারিবারিক বাংলা ছবির কথা মনে করাবে।
‘‌সাঁঝবাতি’‌ আদতে একটি বাড়ির নাম। যে বাড়িতে কার্যত‌ একা থাকেন বয়স্কা সুলেখা দেবী (‌‌লিলি চক্রবর্তী)‌‌। তাঁর ছেলে (‌‌সুদীপ মুখোপাধ্যায়)‌‌ আমেরিকা–‌প্রবাসী ডাক্তার। মায়ের প্রতি দায়–‌দায়িত্ব সারেন ফোন–‌কলে এবং কর্মচারী রাখায়। সুলেখা দেবীর ঘরের কাজ করার জন্য আছে ফুলি (‌‌পাওলি দাম)‌‌। আর একজন ‘‌কেয়ার–‌টেকার’‌ রাখার প্রয়োজন হয়। তা সেই দায়িত্ব নিয়ে গ্রাম থেকে আসে চাঁদু (‌‌দেব)‌‌।
চাঁদু–‌ফুলি ছাড়াও সুলেখা দেবীর নিঃসঙ্গতার আরেক সঙ্গী আছে। তিনি সুলেখা দেবীর ছানাদা (‌‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌‌। একদা সুলেখা দেবীর প্রেমিক, পরে দাদাস্থানীয় অভিভাবক প্রতিম। ভারী স্নিগ্ধ উপস্থিতি নিয়ে তিনি থাকেন সুলেখা দেবীর পাশে। আছে আরও একজন। মুন্নি (‌‌সোহিনী সেনগুপ্ত)‌‌। সুলেখা দেবীর প্রয়াত ছোট ছেলের একদা সঙ্গিনী। প্রথাসিদ্ধভাবে বিয়ে হয়নি দু’‌জনের। তবু দু’‌জনে একসঙ্গে থাকত। সুলেখা দেবীর ছেলে বহুদিন মারা গেলেও আর বিয়ে করেনি বা নতুন কোনও সঙ্গী খুঁজে নেয়নি মুন্নি। বরং সময় পেলে মাঝে–‌মাঝে সে এসে দেখা করে যায়, সময় কাটিয়ে যায় সুলেখা দেবীর সঙ্গে। এই নিয়েই সাঁঝবাতি–‌র সংসার।‌
তবু সেই নিস্তরঙ্গ সংসারেও এক সময় মেঘ ঘনিয়ে আসে। স্থানীয় এক প্রোমোটারের দালাল (‌‌সপ্তর্ষি মৌলিক)‌‌ নানারকম ভয় দেখিয়ে বাড়িছাড়া করতে সচেষ্ট হয় সুলেখাদেবীকে। আর তখনই তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় চাঁদু। প্রথমে ভয় পেলেও পরে তার সঙ্গী হয় ফুলিও। চাঁদু যখন গ্রাম থেকে এই বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল, তখন ফুলির সঙ্গেই তার বিরোধ বেঁধেছিল। ফুলির মনে হয়েছিল চাঁদু তার কর্তৃত্বে ভাগ বসাবে। এই পর্বে দু’‌জনের খুনসুটি আর তার থেকে তৈরি হওয়া মজাই চিত্রনাট্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
দ্বিতীয় পর্বে সে জায়গা নিয়েছে দালালের সঙ্গে বিরোধ। আর তার পাশাপাশি চাঁদুকে ঘিরে ত্রিকোণ সম্পর্কের এক মৃদু টানাপোড়েন। যার একদিকে ফুলি, অন্যদিকে চাঁদুর গ্রামের প্রাক্তন এক বিবাহবিচ্ছিন্না প্রেমিকা (‌‌সায়নী ঘোষ)‌‌। চাঁদুর সঙ্গে ফুলির প্রেমটা অবশ্য বড্ড তাড়াহুড়ো করে মাত্র দু–‌একটা দৃশ্যের অবতারণায় করা হয়েছে। ফলে ‘‌রোমান্টিক’‌ ব্যাপারটা ততটা জমেনি। তবে দেব ও পাওলি— ‌দু’‌জনেই অন্যররম চরিত্র বেশ ভালই সামলেছেন।‌
রোমান্টিক কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থাতেই উত্তমকুমার ‘‌খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’‌ ছবিতে চাকর রাইচরণের চরিত্র করেছিলেন। দেবও সেই ঝুঁকি নিলেন, এটা খুবই বড় কথা। অভিনয়ে সচেষ্ট থেকেছেন পাশের–‌বাড়ির–‌অভাবি ছেলের ইমেজটা ধরে রাখার। পাওলির উচ্চারণে অহেতুক ‘‌শ’–‌এর‌ জায়গায় ‘‌স’‌টা  আনার দরকার ছিল না। এই মুদ্রাদোষটুকু ছাড়া পাওলিকে সাবলীল আর বিশ্বস্ত লেগেছে চরিত্রের প্রতি। 
তবে এ ছবির সম্পদ দুই বর্ষীয়ান অভিনেতা–‌অভিনেত্রী সৌমিত্র চট্টৌপাধ্যায় ও লিলি চক্রবর্তীর অভিনয়। লিলি চক্রবর্তীর কাঁধের ওপরেই মূলত দাঁড়িয়ে আছে এ ‌ছবি। স্নেহ আর দৃঢ়তাকে বড় সুন্দর মিশিয়েছেন তিনি। সৌমিত্রবাবু অভিনয়ে বেদনার সঙ্গে জীবনরসের আশ্চর্য মিশেল। মুন্নির চরিত্রে সোহিনী সেনগুপ্ত আর চাঁদুর বাবার চরিত্রে সন্তু মুখোপাধ্যায়কেও বড় সুন্দর লাগে। বাংলা ছবির হালফিলের চেনা গত পরকীয়া আর গুপ্তধন–‌রহস্যের বাইরে এসে দু’‌জন শ্রমজীবী মানুষকে নায়ক–‌নায়িকা করে এমন একটি ছবি বানানোর জন্য পরিচালকদ্বয় বিশেষ অভিনন্দন পাবেন। 

জনপ্রিয়

Back To Top