সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ ষাণ্ড কি আঁখ। পরিচালনা:‌ তুষার হিরনন্দানি। অভিনয়ে:‌ তাপসী পান্নু, ভূমি পেডনেকার, প্রকাশ ঝা, বিনীত কুমার সিং, শাদ রানধাওয়া।

‘‌লাইফ স্টার্টস অ্যাট সিক্সটি’।‌
না, শৌখিন কোনও বিজ্ঞাপনী বচন নয়। নিজের ছবির চিত্রনাট্যে এমনই দুই জীবনকে তুলে এনেছেন পরিচালক তুষার হিরনন্দানি। সেই তুষার, যিনি ‘‌হাউসফুল’‌, ‘‌মস্তি’‌, ‘‌ধামাল’‌–‌এর মতো সিরিজের চিত্রনাট্য লেখক বা এর বাইরেও লিখেছেন ‘‌অতিথি তুম কব যাওগে’‌র মতো নির্ভেজাল কমেডি বা ‘‌এক ভিলেন’‌–‌এর সাসপেন্স থ্রিলার— এ সব ফর্মুলা–‌সড়কের বাইরে এসে কিন্ত তাঁর প্রথম পরিচালনা–‌কর্ম। এমন এক কাহিনি নিয়ে, যা থেকে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে, আড়াই ঘণ্টার একটা ছবি হতে পারে। ‘‌না আছে প্রেম, না আছে অ্যাকশন, না আছে রহস্য–‌সাসপেন্স। শেষটাও বোধহয় খানিকটা অনুমান–‌যোগ্যই। তবু এ ছবির প্রতিটি মুহূর্ত থেকে নাটক নিংড়ে বের করে এনেছেন তুষার। তবে এটাও বলার, এ ছবির চিত্রনাট্য তাঁর নিজের লেখা নয়। কাহিনি পাঞ্জাবি ছবির সফল চিত্রনাট্যকার জগদীপ সিধুর। আর চিত্রনাট্য বলবিন্দার সিং জানুজার। আগে ঠিক ছিল, এই ছবির নাম হবে ‘‌ও ম্যানিয়া’‌। পরে নাম বদলানো হয়। ‘‌ষাণ্ড কি আঁখ’‌ হিন্দিতে এই নাম শুনতে যেমনই লাগুক, আসলে এই শব্দবন্ধটি এসেছে ইংরেজি ‘‌বুলস আই’‌–‌এর অনুবাদ হিসেবে। আর তা বুঝলেই বোঝা যায়, এ ছবি আসলে ‘‌শুটিং’‌–‌এর জগৎ কেন্দ্রিক। ‘‌শুটিং’‌–‌এ, মানে বন্দুকবাজিতে টার্গেটের মধ্যস্থলে চূড়ান্ত কেন্দ্রীয় বিন্দুকে বলে ‘‌বুলস আই’‌।
এ ছবি যে কোনও সফল, সার্থক স্পোর্টস ফিল্মের মতোই শুধু ম্যাচ–‌প্র‌্যাকটিস বা ম্যাচ–‌জেতার গল্পে আটকে থাকেনি।  খেলাকে উপলক্ষ করে বলেছে সমাজের, জীবনের বড় লড়াইয়ের গল্প। একজন স্পোর্টসম্যানকে যা পেরিয়ে আসতে হয়। যেখান থেকে সে নিজের ‘‌ফাইটিং স্পিরিট’‌–‌এর জ্বালানিটা সংগ্রহ করে। চ্যাম্পিয়নশিপের পেছনের এই অন্ধকার গল্পটা খুব যত্ন করে বলেছে এই সিনেমাটা।
আর সেখানেই এ ছবি নিছক ‘‌স্পোর্টস ফিল্ম’‌ হয়ে থাকেনি। এক, হয়ে উঠেছে প্রতিকূল পরিস্থিতি আর সমাজের বিরুদ্ধে এক মরণপণ লড়াইয়ের গল্প। দুই, হয়ে উঠেছে অন্দরে অবরুদ্ধ নারীদের পুরুষতন্ত্রের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার গল্প। তিন, হয়ে উঠেছে বয়েসের বিরুদ্ধেও লড়াই করে জড়তা কাটিয়ে জিতে যাওয়ার গল্প। মাও সে তুং একবার বলেছিলেন, চীনের পুরুষদের তিনটে পাহাড়ের ভার চিনে এগিয়ে যেতে হয়। আর নারীদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় চারটে পাহাড়ের ভার। সেই ‘‌চতুর্থ পর্বত’‌টি হল পুরুষতন্ত্র। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও কথাটা প্রয়োজ্য। আর এ ছবির তিনটে লড়াইই এই পুরুষতন্ত্র নামক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এ ছবিতে।
উত্তরপ্রদেশের এক যৌথ পরিবার। তিন ভাইয়ের। ভারতীয় পরিবার ব্যবস্থার সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো মেনে তার মধ্যে বড় ভাই রতনজির (‌‌প্রকাশ ঝা)‌ ইচ্ছে–‌অনিচ্ছেতেই গোটা পরিবার চলে। নিজের যৌবনকাল থেকেই (‌ছবিতে পেছনের সময়গুলোর ফ্ল্যাশব্যাক ঠিকঠাক সময় ও ইতিহাস মেনে এসেছে এবং সে পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে চমৎকার চলমান ধারাবিবরণীতে মিশিয়ে নেওয়া হয়েছে সমকালীন ভারতবর্ষের ইতিহাসকেও)‌ রতনজি যে কোনওরকম আধুনিক চিন্তা–‌ভাবনা কিংবা প্রগতি–‌বিরোধী। বন্দুক হাতে তাকে আটকান। আর এই কাহিনিতে রতনজির পরিবার চৌহদ্দি আর গোটা গ্রাম একাকার। কারণ তিনিই বাহুবলে গোটা গ্রামের ‘‌সরপঞ্চ’‌ও বটে। তার পরিবারের (‌বোঝা যায় গোটা গ্রামেরই)‌ মহিলারা একা গ্রামের বাইরে যেতে পারে না। সঙ্গে পুরুষ দেহরক্ষী নিয়ে যেতে হয়। বাইরে গেলে মুখ ওড়নায় ঢেকে যেতে হয়। পরপুরুষে (‌এমনকী বাড়ির অন্য পরুষও ক্ষেত্রবিশেষে!‌)‌ যেন মুখ না দেখে ফেলে। কালক্রমে মেয়েরা একটু–‌আধটু লেখাপড়া করলেও চাকরি করা নৈব নৈব চ। যাবতীয় দাম্পত্য ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী স্বামী। ইটভাটায় কাজ করে অর্থের জোগান দেবে সংসারকে অবশ্য মেয়েরাই!
উপায়ন্তরহীনভাবে জীবনের ৪০ বছর এভাবেই কাটিয়ে আসে রতনজির স্ত্রী ও দুই ভ্রাতৃবধূ চন্দ্র তোমর (‌ভূমি পেডনেকার)‌ ও প্রকাশী তোমর (‌তাপসী পান্নু)‌। যাবতীয় অন্যায় রীতি মুখ বুজে সয়ে এসে। নতুন হাওয়া আসে, যখন গ্রামে এক শুটিং প্র‌্যাকটিসের আখড়া খোলে গ্রামেরই ছেলে, শহর থেকে পড়াশোনা করে আসা যশপাল (‌বিনীত কুমার সিং)‌। এই আখড়া খোলার উদ্দেশ্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের বন্দুকবাজি শেখানো, যাতে সেনাতে চাকরির সুযোগে তারা এগিয়ে থাকে। মজার কথা, গ্রামের ছেলেরা এতে উৎসাহ পায় না। বরং তা শিখতে আসে চন্দ্রর নাতনি আর প্রকাশীর মেয়ে। তাদের শেখাতে নিয়ে আসার জন্য চন্দ্র আর প্রকাশী আখড়ায় আসতে শুরু করে এবং ঘটনাচক্রে শুরু হয় তাঁদের বন্দুকবাজি তথা ‘‌ষাঁড়ের চোখ’‌ বিদ্ধ করা। বলাই বাহুল্য, এই ‘‌ষাঁড়ের চোখ’‌–‌এর তাৎপর্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছবি করমুক্ত ‌করে সারা দেশে দেখানো উচিত। যে কোনও অগ্রবর্তী শিল্পকর্মের দায়িত্ব পুরনো অন্ধ ধ্যানধারণাকে আক্রমণ করা, নতুন যুগের পদধ্বনিকে ধ্বনিত করা। এ ছবি সে দায়িত্ব পালন করে ‘‌বুলস আই’‌ বিদ্ধ করেছে।
এ ছবি আদতে বায়োপিক। বাস্তবের চন্দ্রজি ও প্রকাশীজি–‌কে আমরা পর্দায় দেখিও শেষে। কিন্তু এত রকম বয়সে ছবিজুড়ে ষাটোর্ধ্ব দুই মহিলার চরিত্র যেভাবে করেন ভূমি পেডনেকার আর তাপসী পান্নু, তা যেন সাড়ে তিন দশক আগের শাবানা–‌স্মিতা জুটির কথা মনে করিয়ে দেয়। এসব ছবিই মনে করিয়ে দেয় শ্যাম বেনেগালরা ব্যর্থ হননি। তাঁদের সমাজ–‌সচেতন ছবির সেই আর্ট–‌ফিল্ম ধারা আজও নানাভাবে ফুল ফুটিয়ে চলেছে চোরাগোপ্তা।   ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top