সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ সাহু, পরিচালনা:‌ সুজিত, অভিনয়ে:‌ প্রভাস, শ্রদ্ধা কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, চাঙ্কি পান্ডে, টিনু আনন্দ, নীল নীতিন মুকেশ, প্রকাশ বেলাওয়াড়ি, মহেশ মঞ্জেরেকর, মুরলী শর্মা, মন্দিরা বেদি।
‘‌কস্টিউম ড্রামা’‌র ‘‌কস্টিউম’‌টা খুলে রাখতেই খুব সাধারণ লাগল প্রকাশকে। ‘‌বাহুবলী’‌ সেজে গোটা দেশকে মাত করে দিয়েছিলেন যিনি।
এবার ‘‌বাহুবলে’‌রই ছবি। কিন্তু এমনতর বাহুবল হিন্দি সিনেমায় গত পঞ্চাশ বছরে অন্তত‌ হাজার দুয়েক বার দেখেছে দর্শক, ফলে ‘‌সাহু’‌র চিত্রনাট্যে আর নতুন করে পাওয়ার কিছু ছিল না।
‘‌বাহুবলী’‌র শুরুর পর্ব মুক্তি পেয়েছিল ২০১৪–য়। শেষ পর্ব ২০১৭–য়। ওই সময়কালের মধ্যে প্রভাসের অন্য কোনও ছবি মুক্তি পায়নি। তেমনটাই নাকি চুক্তি ছিল ‘‌বাহুবলী’‌র নির্মাতা এস এস রাজমৌলির সঙ্গে। ‘‌বাহুবলী’‌র পরেও দু’‌বছর মুক্তি পায়নি কোনও ছবি। ২০১৩–‌তে নায়ক হয়ে করেছিলেন তেলুগু ছবি ‘‌মির্চি’‌। এই ছ’‌বছর পর আবার ‘‌বাহুবলী’‌র বাইরে পর্দায় নায়ক হিসেবে পাওয়া গেল তাঁকে। এক অর্থে এও এক অন্যরকম ‘‌কামব্যাক’, কিন্তু সন্দেহ নেই তা জমল না চিত্রনাট্যের দুর্বলতায়।
‘‌বাহুবলী’‌ দেশজুড়ে প্রভাসকে পরিচিতি দিয়েছে বলে এবারের ছবি বানানো হয়েছিল ‘‌ট্রিপল ভার্সান’‌–এ। তেলুগু, তামিল এবং হিন্দি। যদিও ছবির দর্শনধারী যাবতীয় ব্যাপার–স্যাপার দেখেই মনে হয়েছে এ ছবি দক্ষিণী ছবি, স্বাদে–গন্ধে–বর্ণে, ছবি বানাতে খরচা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা!‌ ছবির একটি অ্যাকশন সিকোয়েন্স বানাতে খরচ হয়েছে ৭০ কোটি টাকা!‌ মাত্র আট মিনিটের জন্য!‌ ছবিতে অবশ্য গল্প বলতে যা কিছু তা ওই অ্যাকশন, অ্যাকশন, এবং অ্যাকশন।
ফর্মুলা ছবিতে চোর–পুলিশের তাড়া করা আর পালানোর গল্পটা কোনও নতুন জিনিস নয়। চোর–পুলিশের অদলবদল ঘটে যাওয়াটাও কোনও নতুন ঘটনা নয়। এই দ্বিতীয় ‘‌মিস আন্ডারটেকেন’‌ আইডেন্টিটি’‌র খেলাটার ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ছবি। আর প্রথম ব্যাপারটা মানে ওই ‘‌চেজিং’‌ ব্যাপারটা দেখতে লেগেছে যেন আজকালকার ভিডিও গেমের মতো, মনহীন, শুধু চোখের ব্যস্ততা।
এই চোর–পুলিশের অদলবদলের খেলাটা নিয়ে প্রথমার্ধের শেষ দিকে একটু রহস্য–মতো ব্যাপার এসেছে ঠিকই, তবে সেটা আগাম বুঝতে খুব একটা মাথা ঘামানোর দরকার নেই। প্রচুর ‘‌ক্লু’‌ ছবির প্রথম থেকেই ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া হয়েছে। আর ফর্মুলার ‘‌ভাঁজ’‌গুলোও এত চেনা যে দেখতে বসে মনে হবে, আগে দেখা অনেকগুলো নানা–সময়ের ছবির ‘‌কোলাজ’‌ দেখছি যেন। তার মধ্যে চল্লিশ বছর আগের ‘‌ডন’‌ ও আছে, আবার বছর পনেরো আগের ‘‌ধুম’‌ ও আছে। তবে এর কোনওটাই ‘‌সাহু’‌ প্রভাসকে সাহায্য করেনি। বক্স অফিসে, ৩৫০ কোটির ছবি বিশাল প্রচার আর ‘‌হল অকুপেশন’‌ সত্ত্বেও ব্যবসা করেছে ২৫০ কোটির। মানে সুপারহিট হতে এখনও অনেকটা পথ পেরোতে হবে।
‘‌বাহুবলী’‌র রাজা মহেন্দ্র দেশজুড়ে দর্শকদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিল চরিত্র–গুণে। সে চরিত্র ছিল এ’‌দেশের ধ্রুপদী সাহিত্যের নায়কের আদলে ধারোদাও। সেই চরিত্রের স্মৃতির ‘‌হ্যাং ওভার’‌ নিয়ে যে প্রভাস ভক্ত হলে ঢুকবেন, তিনিই ধাক্কা খাবেন। এ ছবিতে প্রভাস শুধু যে একজন দুঁদে চোর, তাই–ই না, বেশ নারীকাতর এবং সংলাপে ‘‌ছ্যাবলা’‌। তাঁর চরিত্রকে ঘিরে কাহিনি ও সংলাপের যে প্যাকেজটা, সেটা বেশ হালকা। প্রভাসের ভারী ‘‌ব্যারিটোন’‌ গলাও তাতে কোনও ওজন আনতে পারেনি।
তাঁর পক্ষে ছিল একমাত্র অ্যাকশন দৃশ্যগুলি। ‘‌স্টান্ট’‌–এর দৃশ্যগুলো চমকদার‌ সন্দেহ নেই, কিন্তু তাতে অবাস্তবতারই একাধিপত্য, না, কুশলী ফর্মুলা ছবির নিয়ম মেনে তাতে এমনকী ‘‌বিশ্বাসযোগ্য অবাস্তবতা’‌ও নেই। পুরোটাই অবিশ্বাস্য, পুরোটাই হলিউডি সুপার–হিরো ছবির অক্ষম ‘‌হনুকরণ’‌। এ’‌ছবিতে সাহু মানে প্রভাসের গাড়িটি দেখতে অনেকটা ব্যাটম্যানের ‘‌ব্যাট–মোবিল’‌–এর মতো। এবং সেটা আগুন ছাড়তে ছাড়তে এগোয়!‌!‌
দ্বিতীয়ার্ধে যে সাহু নামের হাইটেক চোর, প্রথমার্ধে সেই পুলিশের ‘‌আন্ডার–কভার এজেন্ট’‌ অশোক চক্রবর্তী (‌‌না, পদবি দেখে বাঙালি বলে ভুল করবেন না)‌। প্রথমার্ধে চোর নীল নীতিন মুকেশ, দ্বিতীয়ার্ধে সেই আবার পুলিশ!‌ সেই আসল অশোক চক্রবর্তী, নায়িকাকে নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন পরিচালক–কাহিনিকার সুজিত, তাই অম্রুতা মানে ছবির নায়িকা (‌‌শ্রদ্ধা কাপুর)‌ একই সঙ্গে চোর ও পুলিশ, ছবির ভেতর চমক বলতে এটাই, কে কখন চোর থেকে পুলিশ হচ্ছে বা পুলিশ থেকে চোর। ছবির শেষ পর্যন্ত এই কোর্ট বদলের খেলাই চলেছে। আর আছে জাঁদরেল অভিনেতা–অভিনেত্রী ভর্তি এক ভিলেন টিম। জ্যাকি শ্রফ, চাঙ্কি পান্ডে, মহেশ মঞ্চেরেকর, টিনু আনন্দ, মন্দিরা বেদি প্রমুখ, কিন্তু তাঁরা এতটাই দুষ্টু পুতুল–পুতুল যে এঁদের অভিনয় প্রতিভার ক্রমাগত অপচয় দেখতে খারাপই লেগেছে।       ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top