সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‘‌যকের ধন’‌–‌এ হেমেন্দ্রকুমারের স্মৃতি লেগে আছে। আর সাগরদ্বীপে তা আনতে যাওয়ার গপ্পো চিত্রনাট্যকার সৌগত বসুর। দুয়ে মিলে ‘‌সাগরদ্বীপে যকের ধন’‌।
না, এ গল্পে বিমল–‌কুমার থাকলেও, অ্যাডভেঞ্চার থাকলেও, এ ছবি মেজাজে হেমেনবাবুর হুবহু অনুসরণকারী নয়। বরং ট্রাভেলগ, ভিনগ্রহী, বিজ্ঞানীর পাতালঘর— সব মিলিয়ে এ ছবি অনেকটা আজকের কিশোর পত্রিকার পুজো সংখ্যায় বেরোনো রহস্য উপন্যাসের মতো। যাতে কল্পবিজ্ঞানের ছোঁয়াটুকুও আছে।
গুপ্তধনের চরিত্রটাও তার সঙ্গে মিলিয়েই করা হয়েছে। রাজ–‌রাজড়াদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি নয়। এখানে বরং তা তরল পারদ, যা হয়ে উঠতে পারে পেট্রোলিয়ামের বিকল্প জ্বালানি। যার সন্ধান পেলে দখলদারি নিয়ে বঁাধতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
এ ধরনের রহস্য–‌রোমাঞ্চ ছবিতে পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল এখন এক প্রতিষ্ঠিত নাম। বছর দুয়েক আগে হেমেন রায়ের ‘‌যকের ধন’‌ দিয়ে তঁার এ ধরনের ছবিতে ঢোকা। সে ছবিরও চিত্রনাট্য করেছিলেন সৌগত বসু। তঁার চিত্রনাট্যে তিনি অধিকন্তু–‌ন–‌দোষায়’‌ ভেবে বিমল–‌কুমারের পাশে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এক নতুন চরিত্র।
হিরণ্ময় বসু। খানিকটা ফেলু মিত্তিরের সিধু জ্যাঠার মতোই সবজান্তা। তবে হিরুদা শুধু ঘরে বসে জ্ঞান দেয় না, অভিযানে সঙ্গীও হয়। এবারও হিরুদা (‌কৌশিক সেন)‌ আছে।
‘‌যকের ধন’‌–‌এর শেষেই ইঙ্গিত ছিল, নতুন অভিযানে বেরোবে বিমল আর কুমার। ওই ছবিতে তো কুমারের এক বান্ধবীও (‌প্রিয়াঙ্কা)‌ জুটিয়ে দিয়েছিলেন সায়ন্তন। এবার কুমার চরিত্রের অভিনেতা বদলে গেছে। আগেরবার ছিল রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার গৌরব চক্রবর্তী। সে বান্ধবীও ভ্যানিশ। বরং নতুন বান্ধবী পেয়েছে এবার বিমল (‌পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)‌। সে বান্ধবীর নাম রুবি চ্যাটার্জি (‌কোয়েল মল্লিক)‌। তরল পারদের খোঁজে নেমেই রুবির সঙ্গে আলাপ বিমলের। ‘‌যকের ধন’‌–‌এর পরে ‘‌আলিনগরের গুপ্তধন’‌ বা ব্যোমকেশ ছবি করছিলেন সায়ন্তন। হেমেন রায় ‘‌ফ্র‌্যাঞ্চাইজি’‌তে ফিরলেন ঠিকই, তবে সিরিজের ক্রম মেনে ‘‌আবার যকের ধন’‌ এল না। এল অন্য গল্প। এ ছবির শেষে তেমন কোনও ইঙ্গিতও নেই যে তা ফিরবে।
তবে বিমলের টিম এবার তাদের ‘‌ট্রায়ো’‌ এবং রুবির বাইরে আরও দু‌জন সদস্যকে পেয়েছে। ‘‌কমিক রিলিফ’‌ হিসেবে পেট্রল ব্যবসায়ী বঁাকাশ্যামবাবু। বোকা–‌বোকা মন্তব্য আর কার্যক্ষেত্রে ভীতুপনায় এ চরিত্র ফর্মুলা মেনে আদতে সেই লালমোহন বংশের। ব্যাপারটাকে বেশ ভাল সামলেছেন ও দর্শকদের হাসিয়েছেন কাঞ্চন মল্লিক। এ ছবির ঘটনার ডেটলাইন থাইল্যান্ড। সেখানকার এক লোকাল গাইড হিসেবে গল্পে এসেছে আল মাহারি (‌রজতাভ দত্তকে মানিয়েছেও ভাল)‌। এই পুরো টিমটা অঁাট বেঁধেছে ভাল। পরের ছবিতে গোটা টিমটাকেই ভাবতে পারেন সায়ন্তন। সম্প্রতি থ্রিলার ছবিতে দারুণ আবহ করছেন বিক্রম ঘোষ। এ ছবিতেও দর্শকদের মনের ‘‌পালস্‌’‌কে তিনি নিজের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছেন। সায়ন্তন নিজেই ছবির সম্পাদনার দিকটা দেখেছেন। তাতে ছবি দৈর্ঘ্যে একেবারে মাপে মাপে লেগেছে। আর বাকি কাজটুকু সেরে দিয়েছে থাইল্যান্ডের অনবদ্য সাগর–‌পাহাড়–‌জঙ্গল ঘেরা লোকেশন। জলের তলায় আন্ডার ওয়াটার শুটিংয়ের কাজও খুব ভাল।
আগেরবার ‘‌যকের ধন’‌–‌এ খানিকটা তীরে এসে তরী ডুবেছিল। গোটা অভিযানটা জমজমাট আর নাটকীয় হয়েও, শেষে যকের ধনের গুহাটা বড় কঁাচা হয়ে গিয়েছিল। এবার এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হয়েছেন সায়ন্তন। ‘‌রেড মার্কারি’‌র গুহাটির সেটটি করেছেন অপূ্র্ব। তা সে কী উপরিতলের মন্দির হোক, কী মাটির নীচের গুহা। তা ভেঙে পড়ার দৃশ্যটিতেও মুনশিয়ানা আছে। ‘‌গ্রাফিক্স’‌–‌এর কাজে কোনও গোঁজামিল রাখেননি সায়ন্তন।
ছবির শুরুর দিকটায় খালি মূল প্লটে ঢুকতে একটু যেন দেরি হয়েছে। আর কথার ভারও একটু বেশি লেগেছে। ছোটদেরও অনেকে দেখবে এ ছবি, দ্রুত অ্যাকশনে ঢুকে যাওয়াটাই ভাল। পরীক্ষা শেষ। এ ছবি ছোটদের তৃপ্তি দেবে। বড়দের দেবে ‘‌নস্টালজিয়া’‌, হেমেন্দ্রকুমারের ‘‌নস্টালজিয়া’‌।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top