অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: অতিদূর দিগন্তের দিকে/‌ যেভাবে মিলিয়ে যায় ট্রেনের লাইন/‌ সেভাবেই মিশে গেছ তুমি.‌.‌.‌/‌ ফিরে আসে ট্রেন, তুমি কখনও ফেরনি।
জীবনে কখনও অন্যরকমও ঘটে। ‘‌কাকে বলে ফিরে আসা, কাকে বলে যাওয়া’‌, এসব কঠিন প্রশ্ন পেরিয়েও দেখা হয়ে যায় দুজন মানুষের। হঠাৎ কখনও। বহু বছরের দুরত্ব পেরিয়ে তখন কি কোনও ম্যাজিক তৈরি হয়?‌
এক রবিবার সকালে এভাবেই, ১৫ বছর বাদে দেখা হয়ে যায় অসীমাভ আর সায়নীর। এভাবেই শুরু হয় অতনু ঘোষের ছবি ‘‌রবিবার’‌। এক সকালবেলার কফি-‌ঘরে দেখা হয় অসীমাভ (‌প্রসেনজিৎ)‌ আর সায়নীর (‌জয়া আহসান)‌।
দু’‌এক টুকরো ফ্ল্যাশব্যাকে অসীমাভকে কয়েক মূহূর্তের জন্যে দেখা গেলেও, অসীমাভ-‌সায়নীর সম্পর্কের কোনও ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করেননি পরিচালক। ফলে, তাদের কথাবার্তার মধ্যে দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের ছেড়ে যাওয়া সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। তাতে একটুও বুঝতে অসুবিধে হয় না অসীমাভ এবং সায়নীর সম্পর্কের অতীত তীব্রতা এবং আজকের দূরত্ব। এই পদ্ধতিটাকেই সামগ্রিকভাবে মান্যতা দিতে পারতেন পরিচালক। দু-‌এক টুকরো অতীতের অসীমাভ না এলেও অসুবিধে ছিল না।
অসীমাভ মোটেই সোজাসাপটা লোক নয়। তার জীবনজোড়া রহস্য। তাকে থানায় হাজিরা দেওয়ার জন্যে তাগাদা দিতে পুলিস এসে হাজির হয়। জীবনের অন্ধকার দিকে  অনেকখানি এগিয়ে যাওয়ার চিহ্ন সায়নী স্পষ্ট বুঝতে পারে। ১৫ বছর আগে অসীমাভর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির সেটাই তো কারণ। আজও সেই ধারণা পাল্টে যাওয়ার কোনও কারণ ঘটেনি সায়নীর। ফলে, বারবারই সে, এই রবিবারেও, চলে যেতে চায় অসীমাভর নাগাল থেকে দূরে। কখনও জোর করে আটকে রাখে অসীমাভ। কখনও জোর করে না। চলে যায় সায়নী। কিন্তু আবার ফিরে আসে। কেন?‌ এখানেই ‘‌রবিবার’‌-‌এর এবং অসীমাভর রহস্য।
দুজনকে ঘিরেই ছবি। সাবপ্লটে যে চরিত্রগুলো এসেছে অল্প সময়ের জন্যে, তারা এই দুটো চরিত্রকে স্পষ্টই করেছে। শুধু সুপারি কিলার চরিত্রের খুব একটা প্রয়োজন বোধহয় ছিল না। সে একটা ছমছমে রহস্যের মোচড় দিতে চেয়েছে এই ছবিতে, কিন্তু এই রহস্য খুব একটা যুক্তিযুক্তভাবে আসেনি।
তবে, প্রবল যুক্তিযুক্ত লোক তো নয় অসীমাভ। বহু কাজ, যা সমাজ-‌গ্রাহ্য নয়, অবলীলায় সে করে ফেলতে পারে। সেটাই তার রহস্য। সেজন্যেই রাস্তার ছেলেকে ঘরে এনে মানুষ করার কাজটাও সে অবলীলায় করে ফেলে। সেই ছেলেটা বাঁশি বাজায় আর অদ্ভুত গোয়েন্দার দৃষ্টিতে চমকে দেয় অনেককেই। এছবিতে ফুরফুরে একটা সজীব বাতাস এনে দেয় এই ছেলেটা ভেলভেলেটা হয়ে শ্রীমান শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ‘‌সোনার পাহাড়’‌ ছবিতে তনুজার সঙ্গী হয়ে মন ভরিয়ে দিয়েছিলেন।
অসীমাভকে ঘিরেই এই ছবি। এবং সেই রহস্যময়, অকাজ করতে পটু অসীমাভর চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ। অতি নাটকীয় চরিত্র অসীমাভ, কিন্তু অভিনয়ে অতি নাটকীয়তাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে জ্যান্ত চরিত্র হয়ে উঠেছেন প্রসেনজিৎ। এবং তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় এই অসীমাভ। তাঁর সঙ্গে সুন্দর সঙ্গত করেছেন জয়া আহসান। অসীমাভর একেবারেই উল্টো মেরুর চরিত্র সায়নী। সেটা তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়ে স্পষ্ট করেছেন জয়া। আর ছোট্ট শ্রীজাত এছবির টাটকা বাতাস।
দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত এছবির অনেক মূহূর্তকে স্মরণযোগ্য করে তুলেছে।
সোজাসাপটা গল্প বলার ছবি করতে চান না অতনু ঘোষ, ‘‌রবিবার’‌ তার বড় দৃষ্টান্ত। সম্পর্কের নানান মূহূর্তকে ধরতে চেয়েছেন অতনু। কোনও সরল রৈখিক গল্পকে নয়। সেভাবেই দুটো চরিত্রের টানাপোড়েন, কাছে আসা, কাছে থাকতে না চাওয়ার নানান মূহূর্ত স্পষ্ট হয়েছে ‘‌রবিবার’‌-‌এ।
 এবং প্রশ্ন তৈরি হয়, এত অমিল সত্ত্বেও কীভাবে এরপরেও কাছে থাকতে পারে দুটো মানুষ?‌ আদৌ কি থাকতে পারে?‌ দরকার কি কোনও ম্যাজিকের, যে ম্যাজিক জীবনের, জীবনের রহস্যের?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top