সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ পরিণীতা। পরিচালনা:‌ রাজ চক্রবর্তী। অভিনয়ে:‌ শুভশ্রী, ঋত্বিক চক্রবর্তী, গৌরব চক্রবর্তী, আদৃত রায়, লাবণী সরকার, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, তুলিকা বসু।
চেনা পিচে ফিরলেন রাজ চক্রবর্তী। ‘‌টিজ এজ’‌ প্রেমের গল্প এবং ছাড়াছাড়ির গল্পে। আর সেঞ্চুরি হাঁকালেন আবার। ‘‌চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘‌প্রেম আমার’‌–‌এর সেই পুরনো মৌতাত ফিরে এল যেন। তবে এবার দক্ষিণী ছবির চিত্রনাট্যের মশলায়‌ নয়, বরং দুই বাঙালি গল্পকার প্রিয়াঙ্কা পোদ্দার আর অর্ণব ভৌমিকের অণুগল্পে তৈরি হয়েছে এ ‌ছবির শরীর। সিনেমার জন্য চিত্রনাট্যরূপ দিয়েছেন, গল্পকে বাড়িয়েছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। গল্পে এবার অবশ্য ভরকেন্দ্র শুধুই টিম এজ প্রেম নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘‌থ্রিলার এলিমেন্ট’‌ও।
তবু বলব, সেই ‘‌থ্রিলার’‌ নয়, এ ছবির মূল আকর্ষণ বরং নিষ্পাপ প্রেমের অংশটুকু। যে–‌প্রেমের সবচেয়ে বড় ‘‌ইউএসপি’ হল তার সারল্য। আর মাটির কাছাকাছি থাকাটা। ইদানীং বেশ কিছু হিন্দি ছবি হচ্ছে যেখানে এই প্রেমের অংশটাকে যতটা সম্ভব ‘‌ডাউন টু আর্থ’‌ রাখতে পর্দায় ‘‌লোকেশন’‌ হিসাবে আনা হয় ছোট শহর বা মফস্‌সলকে। এ ছবিতে ততটা না হলেও, উত্তর কলকাতার পথঘাটগুলি, ময়দান, ট্রামলাইন, সরকারি বাস ইত্যাদিকে আনা হয়েছে মধ্যবিত্ত দৈনন্দিনের অংশ হিসেবে, আর তা ভারী সুন্দর নস্টালজিয়া বুনে দিয়ে গেছে। পাশাপাশি গা–ঘেঁষাঘেঁষি বাড়ির ছাদ আর খোলা জানলাকে যেভাবে রোমান্স বুনে তোলার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা বারবার এক পশলা খোলা হাওয়ার মতো বয়ে গেছে পর্দা জুড়ে। মনে পড়ে গেছে হৃষীকেশ মুখার্জি, বাসু চ্যাটার্জিদের সেই সব মিষ্টি রোমান্টিক ছবির কথা।
আসলে এ‌ ছবিতে যতই মোবাইল, হোয়াটস্‌অ্যাপ, ২৪×‌৭ নিউজ বুলেটিন, কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন, সাইবার অ্যাড ইত্যাদি আসুক না কেন, এ ‌ছবির গা থেকে এসব ‘‌টপিং’‌ সরিয়ে নিলে এত চিরন্তন, এত ভিজে ভিজে, লাজুক ভীরু একটা প্রেমের গল্প পাওয়া যায়, যা চিরন্তন বাংলা ছবির সঙ্গে ভারী ভাল যায়, সেটা রাজও নিশ্চিতই বুঝেছেন। আর তাই বাণিজ্যের মুখ চেয়ে রাখা থ্রিলারের পর্বটিকে তিনি বড় করতে চাননি। দ্রুত তাতে ঢুকে ও বেরিয়ে এসে ছবি শেষ করেছেন সেই রোমান্টিক চ্যাপ্টারের স্মৃতিতে ফিরেই।
পাশের বাড়ির কিশোরী মেয়ে মেহুল (‌শুভশ্রী)‌ ভালবাসে প্রাইভেট টিউটর বাবাইদাকে (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌। বাবাইদা মেহুলের থেকে বয়েসে বেশ কিছুটা বড়। এবং মনেও। মেহুলের জগতে কল্পনার প্রজাপতি ওড়াওড়ি এখনও থামেনি। সে উচ্চমাধ্যমিক দেবে। অন্যদিকে বাবাইদা কলেজ পাশ করে চাকরি শুরু করেছে। বিশাল বইয়ের আলমারি পেছনে রেখে সে শুধু ভারী ভারী বই পড়ে যায়। আর পুঁচকে বয়স থেকে দেখে আসা মেহুলকে পড়ানোর ফঁাকে ফঁাকে ভারি খাটায়ও। যেমন চা আনায়, পিঠ টেপায় ইত্যাদি। তারপর একদিন হঠাৎই বন্ধুদের সঙ্গে মেহুলকে লুকিয়ে ‘‌অ্যাডাল্ট’‌ ছবি দেখতেও আবিষ্কার করে ফেলে। আর বুঝতে পারে যে মেহুলও বড় হয়ে গেছে। তাকে নিজের মনের এক গোপন রহস্য খুলে বলবে বলে ঠিক করে বাবাই। এদিকে, ইতিমধ্যেই বাবাইয়ের কবিতার খাতা তথা ডায়েরি লুকিয়ে পড়ে মেহুলও নিশ্চিত বাবাইদা তাকেই ভালবাসে। কিন্তু ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়। আর বাবাইদা একরাশ রহস্য ছড়িয়ে একদিন গলায় দড়ি দেয়!
‌ এমন নিষ্ঠুর মুহূর্ত দিয়েই ‘‌‌পরিণীতা’‌ শুরু হয়। তার পর গল্প ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়। এই প্রেমের কী পরিণতি তা জানার পরেও দর্শকের যে এ ‌গল্প দেখতে ভাললাগে, তার কারণ এ গল্পের মূল রোমান্টিক কাহিনির পাশে তৈরি করা নানা মজার ছিন্ন–‌বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের কারুকাজ। যেমন— দুই কিশোরী বন্ধুর সঙ্গে মেহুলের নানা মজার কীর্তি, ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি, বাবাইয়ের মা–‌র (‌লাবণী সরকার)‌ ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ততা ও সেই ব্যাপারে ঘটকালিতে মেহুলকে জড়ানোর চেষ্টা। খুব মজার ছন্দে ছবির প্রথমার্ধে এই ব্যাপারগুলো ছড়িয়ে থেকেছে। ছবিতে একটা ফুরফুরে মেজাজ এনে দিয়েছে।
 আর এখানেই হয়তো ছবির দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ছন্দপতন লেগেছে। অনেকটা ঘটনার চাপ খুব দ্রুত ঘটতে থাকায় ছবির সেই ধীর মধুর লয়টা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। তবে পরিচালক রাজের তিনটি ব্যাপার খুব ভাল লেগেছে। এক, মেহুলের স্বপ্নে দম আটকে যাওয়ার দৃশ্যকল্পটি। ভয়ঙ্কর ও তীব্র। দুই, জীবনানন্দের দু‌টি কবিতার অসামান্য ব্যবহার (‌ঋত্বিক বলেছেনও ভারী ভাল)‌। তিন, ছবির মাঝে মাঝে বাবাইদাকে এনে বাস্তবতাকে ভাঙা। বাণিজ্যিক ছবির ভেতরেও এ ‌যেন অন্যরকম কাজ। এ ছবি যতটা রাজের, ততটাই শুভশ্রীরও। তিনি প্রমাণ করলেন, ‘‌চ্যালেঞ্জ’‌–‌এ যতটা সাবলীল, ততটাই সাবলীল এমন ‘‌চ্যালেঞ্জিং’‌ ছবিতেও। রাজের ছবি দিয়েই তঁার হিটের শুরু। রাজের এই ছবি দিয়েই তাঁর অভিনেত্রী সত্তার নবজন্ম হল। মৃত্যুদৃশ্যে ঋত্বিকের নিথরতা মনে দাগ কাটে। বাবাইদা হিসেবে তিনি ‘‌পারফেক্ট’‌। দাপুটে অভিনয়ে ক্ষুরধার লেগেছে গৌরব চক্রবর্তীকেও।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top