দ্বৈপায়ন দেব: ●‌ পানিপথ। পরিচালনা:‌ আশুতোষ গোয়াড়িকর। অভিনয়ে:‌ অর্জুন কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, কৃতি শ্যানন, জিনাত আমন।
পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। আড়ালে মারাঠি জাতীয়তা বা অস্মিতার গল্প। সেটাই আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘‌পানিপথ’‌–‌এর মূল বাণিজ্য–‌তীর।
পানিপথের তৃতীয় যু্দ্ধ। অর্থাৎ মারাঠি পেশোয়া বাহিনীর সঙ্গে আফগান আহম্মদ শাহ আবদালির যুদ্ধ। বলিউডে যেমন হয় দেশপ্রেমিক বীরের সঙ্গে বহিরাগত শত্রুর লড়াই। যে শত্রু যেন আচারে–‌বিচারে–‌সংলাপে অনেকটা রাক্ষসের মতো। ইতিহাসের বাস্তবিক গলিঘুঁজির সেখানে জায়গা নেই। বরং একতরফা অসুর–‌নিধনের দিকে এগোনোর গল্প। সিনেমা এখানে ‘‌কমিকস’‌ এবং অবশ্যই শিশুপাঠ্য।
ছবির শুরুর ফ্রেম থেকেই এই উদ্দেশ্যবাহী একমুখিনতা। সদ্য অন্য এক যুদ্ধ শেষ করে ফিরেছে সদাশিব রাও (‌অর্জুন কাপুর)‌। উৎসব নগরী জুড়ে। বলিউড সিনেমার উৎসব মানেই যেমন ‘‌ডিজাইনারস কস্টিউম’‌ পরে নাচ–‌গান, তেমনই। গ্ল্যামারের ছড়াছড়ি। এরপর নানা হিন্দু মারাঠি আচারপালন ও সদাশিবের দাম্পত্য খুনসুটি। সবটা মিলে যে অতি রঙিন প্যাকেজ, তা দেখলে মনে প্রশ্ন উঠবেই ‘‌লগন’‌, ‘‌স্বদেশ’‌, ‘‌যোধা আকবর’‌–‌এর আশুতোষ গোয়াড়িকর কী তবে শেষে সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘‌ওভার কস্টিউম ড্রামা’‌–‌র জুতোয় পা গলালেন। বছর কয়েক ধরে আশুতোষের হিট নেই। সেই হিটের খোঁজে!‌ ছয়ের–‌সাতের দশকে যাত্রায় একটা ব্যাপার দেখা যেত। ইতিহাস–‌এর কোনও এক নেতিবাচক চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে, তার ভয়ঙ্কর কার্যকলাপকে আরও নাটকীয়তর করে পালায় হাজির করা। দিলীপ চট্টোপাধ্যায়, রাখাল সিংহ, শেখর গাঙ্গুলি, শিবদাস মুখোপাধ্যায়দের বছর–‌বছর জনপ্রিয়তা বেড়েছিল এমন সব চরিত্র করে। ‘‌কালা শের’‌, ‘‌খোঁড়া বাদশা’‌, ‘‌ক্ষুধিত হারেম’‌— এমনতর নামে আসত এরা। এ ছবি ও তার ভেতরে আহম্মদ শাহ আবদালির (‌সঞ্জয় দত্ত)‌ চরিত্রটা তেমনই। পর্দায় তার প্রথম এন্ট্রিই চূড়ান্ত নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে। নৃশংস নাটকীয়তা। বিশ্বাসঘাতকতাকে  শিরস্ত্রাণে লাগানো কোহিনুর দিয়ে ঠুকে ঠুকে হত্যা করা!‌ ইতিহাসে কোনও দিনলিপিতে কোহিনুর হীরের এমনতর কোনও প্রয়োগের বৃত্তান্ত আছে কিনা জানা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যের বাইরে পরিচালক তাঁর বানানো সত্যে এ চরিত্রকে এক নৃশংস ‘‌রাক্ষস’‌ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে দেন মাত্রই প্রথম আগমনে। সঞ্জয় দত্ত যে ধারে–‌ভারে এমন ‘‌ব্যাডবয়’‌ চরিত্রকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারবেন তা বলা বাহুল্য। এ ছবি হয়ত অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের আবার নতুন করে ‘‌অভিষেক’‌ ঘটাল। এ ছবির নাম ‘‌আহম্মদ শাহ আবদালি’‌ও রাখা যেত। নায়ক সদাশিব বা অর্জুন কাপুরের চেয়েও আকর্ষণীয়তর লেগেছে তাঁকে। অর্জুন চেষ্টা করেছেন। তাঁকে শরীরগতভাবে মানিয়েছেও ভাল। কিন্তু তাঁর সংলাপ বলা আরও উন্নত করতে হবে। আর মুখ–‌চোখের অভিব্যক্তিও আরও বানিয়ে তুলতে হবে। সিনেমায় ‘‌ক্লোজ আপ’‌ বলে একটা জিনিস তো আছে, নাকি?‌
কৃতি শ্যাননকে নিয়েও একই কথা বলার। ছবি জুড়ে ‘‌ভাইব্র‌্যান্ট’‌ রঙের মারাঠি পোশাকের চোখ ঝলসানো উপস্থিতি। কিছু কিছু জায়গা দেখলে তো রীতিমতো ‘‌গারমেন্ট’‌ কোম্পানির ঝলমলে বিজ্ঞাপন বলে মনে হয়। ফলে সে সবের মোড়কে নায়িকা পার্বতীর চরিত্রে কৃতিকেও বেশ ঝলমলে লেগেছে। কিন্তু মুশকিলটা হল, গোটা ছবি জুড়ে কৃতি যেন আড়ষ্ট ‘‌বার্বি উল’‌। বীরত্বের পেছনে মনের যে ফোর্স কাজ করে, তা তাঁর অভিব্যক্তিতে পাওয়া যায়নি। বরং এ ছবির ‘‌কাস্টিং’ কিছুটা আকর্ষণীয় জায়গায় জায়গায়। ছোট ছোট চরিত্রে সাতের আর আটের দশকের দুই নামী নায়িকা জিনাত আমন আর পদ্মিনী কোলাপুরেকে দেখা গেল দুটি ছোট ছোট চরিত্রে, অনেকদিন পরে। শশী কাপুরের ছেলে কুণাল কাপুর করেছেন অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার চরিত্র। তাঁর কণ্ঠে ও চেহারায় এখন যেন ‘‌ঠাকুর্দা’‌ পৃথ্বীরাজ কাপুরের  ছোঁয়া। একইভাবে মণীশ বহেল, মিলিন্দ গুনাজি, সুহাসিনী মুলেরা নানা ছোট–‌বড় দৃশ্যে আকর্ষণীয় সংযোজন হয়েছেন।
কম্পিউটার গ্রাফিক্স এখন অনেক উন্নত। এবং সহজলভ্য। বলিউড সিনেমার বাজেটও বেড়ে গেছে অনেক গুণ (‌এ ছবির বাজেট পুরো ১০০ কোটি)‌। ফলে এখন যুদ্ধের ছবিতে একটা হলিউডি পালিশ আনা কোনও ব্যাপার নয়। দক্ষ হাতে তা সামলে দেন আশুতোষ গোয়াড়িকর। যুদ্ধ কেন, তা মাধ্যমিকে পড়া ইতিহাস–‌সূত্রে অনেকেই জানেন। যুদ্ধ কীভাবে, তা সিনেমা দেখে জানাই ভাল।
যাঁরা একটু ঝকমকে, একটু নাটকীয় ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌ ছবি দেখতে ভালবাসেন, তাঁদের এ ছবি ভালই লাগবে।  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top