প্যাডমান। এ ছবি শুধু মেয়েদের সমস্যা নিয়ে বানানো মেয়েদের দেখার সিনেমা নয়। এ ছবি পুরুষদের সমস্যার, পুরুষদেরও দেখার।‌ বালকির পরিচালনায় দর্শকদের প্রাপ্তি এক নতুন আশায়।
সম্রাট মুখোপাধ্যায়
●‌ প্যাডম্যান, পরিচালনা:‌ আর বালকি। অভিনয়ে:‌ অক্ষয়কুমার, রাধিকা
আপ্তে, সোনম কাপুর।
‘‌প্যাডম্যান’‌ নিছক ‘‌স্যানিটারি ন্যাপকিন’‌–‌এর গল্প নয়। পিরিয়ডের দিনগুলোতে মেয়েদের অসুবিধেয় পড়া আর তা দূর করার চেষ্টার গল্প নয়।
এ সিনেমা শুধু মেয়েদের সমস্যা নিয়ে বানানো, মেয়েদের দেখার সিনেমা নয়। এ সিনেমা পুরুষদের সমস্যা নিয়েও বানানো। আর পুরুষদেরও দেখার।
মেয়েদের সমস্যার কথা কেবলমাত্র মেয়েরাই কেন বলবে?‌ কেন পুরুষরাও বলবে না?‌ যেখানে সেই মেয়ে কোনও না কোনও পুরুষের মা, স্ত্রী, বোন বা মেয়ে। এই প্রশ্নটাই তুলেছে এই সিনেমা। এই সদর্থক অভ্যাসটাই গড়ে তুলতে চেয়েছে ‘‌প্যাডম্যান’‌।
পরিচালক আর বালকি’‌র সিনেমা মানেই কোনও না কোনও নতুন ইস্যুর উত্থাপন বা জীবনের কোনও নতুন দিকের উন্মোচন। ফলে যখন জানা গিয়েছিল সুলভে ‘‌স্যানিটারি ন্যাপকিন’‌ বানানোর দিশারি অরুচলম মুরুগানানথম–‌এর জীবন নিয়ে ছবি বানাচ্ছেন এবার বালকি, তখন বোঝাই গিয়েছিল বেশ কিছু চমক থাকছেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে সব প্রত্যাশা ছাপিয়ে গেছেন তিনি। সন্দেহ নেই এটাই এখনও পর্যন্ত তাঁর বানানো সেরা ছবি।
প্রথমত, এই প্রথম বালকি’‌র ছবিতে এভাবে, এতটা বিস্তারে গ্রামের জীবন এল। এবং সে গ্রাম বাইরে থেকে সাজানো–‌গোছানো, ‘‌ট্যুর ইন্ডিয়া’‌র বিজ্ঞাপনের মতো ‘‌এথনিক বিউটি’‌ হলেও ভেতরে–‌ভেতরে অন্ধ কুসংস্কার আর নারী–‌বিরোধী নানারকম ধারণায় ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া। এ এক অন্ধকার, ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতাবোধহীন, যুক্তি বোধহীন ভারতবর্ষ।
এ ছবি এমন এক ভারতবর্ষের কথা বলে যেখানে স্বাস্থ্যের সুরক্ষা কিনতে মাত্র ৫৫ টাকা ব্যয় করতেও মানুষ ভাবিত হয়। এ ছবি এমন এক ভারতবর্ষের কথা বলে, যেখানে অন্ধ যেসব কুসংস্কার বহন করে মেয়েরা, সেসব কুসংস্কার মেয়েদেরই কাঁধে জমে–‌জমে তাদের অসুস্থতা ও কালক্রমে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এ ছবি সেই ভারতবর্ষের কথা বলে, যেখানে সাধারণ মানুষের দুরবস্থা ঘোচানোর জন্য সহৃদয় বিজ্ঞানীর আবিষ্কার কিনে নেয় বড় ‘‌কর্পোরেট’‌ কোম্পানি। আর তারপর তারা তা পণ্য হিসেবে বাজারে এনে চড়া দামে বিক্রি করে দরিদ্র আম–‌জনতার কাছে!‌ ব্যর্থ হয় বিজ্ঞানীর সদিচ্ছা। এ সব কিছু সম্পর্কেই সচেতন করার ছবি ‘‌প্যাডম্যান’‌।‌
অরুচলমের বাস্তব জীবনের এই সদিচ্ছা, প্রয়াস এবং সাফল্যের ঘটনা নিয়ে গল্প লিখেছিলেন অক্ষয়–‌ঘরনি টুইঙ্কল খান্না। সেই কাহিনী নিয়ে ছবি বানাতে গিয়ে অরুচলমকে যেমন চিত্রনাট্যে লক্ষ্মীকান্ত চৌহান বানিয়েছেন বালকি, ঠিক তেমনই ঘটনাকেও দক্ষিণ ভারত থেকে নিয়ে গেছেন গো–‌বলয়ে। মধ্যপ্রদেশে। তা ভালই করেছেন। কুসংস্কার আর ধর্ম–‌ব্যবসার বাড়াবাড়ি–‌রকমের দাপটকে দেখাতে গেলে তা করতেই হবে। যেমন একটি দৃশ্যে দেখা যায় স্ত্রী গায়ত্রীকে (‌‌রাধিকা আপ্তে)‌‌ নিয়ে গ্রামের মেলায় ঘুরতে যায় লক্ষ্মীকান্ত (‌‌অক্ষয়কুমার)‌‌। সেখানে ভিড় এক যন্ত্রের হনুমানের সামনে। হনুমানের আদি মন্দির ফাঁকা। এই যন্ত্র হনুমানের হাতের ফোকরে পাঁচ টাকার কয়েন ফেললে মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে একটা আস্ত নারকেল পুজো হিসেবে ঢুকিয়ে দিলে, তা ভেতরে গিয়ে তারপর আবার হাতের ফোকর গলে বেরিয়ে আসছে, তবে এবার টুকরো হওয়া নারকেল বেরোচ্ছে। প্রসাদ হিসেবে ‘‌হিট‌’‌!‌ একইরকমভাবে ঈষৎ অন্য ‘‌ফর্ম’‌–‌এ ব্যবসা চলছে কৃষ্ণের এক পুতুল নিয়ে। আধুনিক ধর্ম ব্যবসা একেবারে নিম্নতম স্তরেও বিজ্ঞান আর কারিগরি বিদ্যাকে ব্যবহার করে অন্ধ বিশ্বাসকে জোরালো করছে!‌ লক্ষ্মীও ব্যাপারটা বোঝে। ওই হনুমানের মডেলের ভেতরে থাকা যন্ত্রের নকশাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে মনশ্চক্ষু দিয়ে। যে কোনও নতুন যন্ত্র বা জিনিস গড়তে লক্ষ্মীর কোনও জুড়ি নেই।
এই বিশ্লেষণীশক্তির সঙ্গে লক্ষ্মীর আছে একটা সংবেদনশীল মন। আর অযৌক্তিক কিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস। লক্ষ্মী লক্ষ্য করে ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে তাদের বাড়ির মেয়েরা বা গ্রামের মেয়েরা নোংরা কাপড় ব্যবহার করে। যা থেকে সংক্রমণ ঘটার, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা প্রচুর। অথচ এই নোংরা কাপড় নিয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই লক্ষ্মীর!‌ কারণ সে পুরুষ!‌ আর এই মেয়েলি ব্যাপার নিয়ে সে কথা বললে তা হবে হয় ‘অশুভ’‌ না হয় ‘‌অসভ্যতা’‌। বাজার থেকে গায়ত্রীর জন্য ‘‌স্যানিটারি ন্যাপকিন’‌–‌এর প্যাকেট কিনে আনে লক্ষ্মী। তার দাম ৫৫ টাকা!‌ নিম্নবিত্ত গায়ত্রী তা ব্যবহার করতে চায় না। লক্ষ্মী তখন সচেষ্ট হয় সস্তায় হাতে তৈরি ‘‌প্যাড’‌ বানানোয়। তুলো–‌কাপড়–‌আঠার কেরামতিতে। কিছুটা সফল হয়। কিন্তু চূড়ান্ত সফল হয় না। শুধু যে ‘‌প্যাড’‌ বানানোর উপকরণ জোগাড়ে সমস্যা তাই তো নয়, ব্যবহার করে গুণমান বলবে কে?‌ পরিবার থেকে গ্রাম–‌কোনও মেয়েই একজন পুরুষের থেকে ওই জিনিস নিতে রাজি নয়। উল্টে লক্ষ্মীর নামে বদনাম রটে সে ‘‌চরিত্রহীন’‌, সে ‘‌পাগল’‌, সে ‘‌বিকৃতকাম’‌। তার স্ত্রী–‌বোনেরা তাকে ছেড়ে চলে যায়। গ্রাম ছাড়তে হয় লক্ষ্মীকে।
শহরে এসেও জারি থাকে তার লড়াই। ‘‌স্যানিটারি ন্যাপকিন’‌ বানানোর কোটি টাকার যন্ত্র মাত্র ৯০ হাজারে বানাল লক্ষ্মী। কীভাবে, তা অবশ্য সিনেমা দেখে জানাই ভাল। তাতে গল্পের সাসপেন্সটা বেঁচে থাকবে। তবে লক্ষ্মীর লক্ষ্যভেদেই ছবি শেষ করে দেননি বালকি। বরং তার পরেও মিনিট ২০–র একটা পর্ব আছে ছবিতে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর ব্যবসা করার দুষ্প্রবণতা নিয়ে সচেতনতার বার্তা আছে। আর আছে খুব সংযত কিছু প্রেমের দৃশ্য। কাজের সঙ্গী পরির (‌‌সোনম কাপুর)‌‌ দূরত্বে চলে যাওয়ার বেদনা।
মজার কথা, এ ছবিতে এত প্রচারমূলক কথা থাকা সত্ত্বেও মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান–‌দেওয়া মনে হয়নি। ‘‌হিউমার’–কে ছোট ছোট সিকোয়েন্সে এমনভাবে চারিয়ে দিতে পেরেছেন বালকি। আবার এটাও ঠিক যে সেইসব মজা কখনই ভারসাম্য হারিয়ে এমন উৎকট হয়নি যে রসিকতা মাত্রা ছাড়ায়। তা হলে এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়কে ‘‌হ্যান্ডেল’‌ করতে পারতেন না বালকি। সচেতনতামূলক প্রচার, জমাটি গল্প আর রসিকতার আবেদন এই তিন মিলে এ ছবিতে যে ‘‌কেমিস্ট্রি’‌ তৈরি করেছে তার তুলনা বোধহয় একমাত্র আমির খানের ‘‌পিকে’‌। ‘‌কাস্টিং সিকোয়েন্স’‌–‌এ তিন–চারটি ‘‌কাট শট’‌–‌এ একটি চরিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়, এতটাই ‘‌জোর’‌ এ ছবির।‌ 
সন্দেহ নেই ‘‌টয়লেট’‌–‌এর পরে ‘‌প্যাডম্যান’‌–‌ যেভাবে অক্ষয় এগোচ্ছেন, তাতে তাঁর লক্ষ্য আমির–‌রাজত্বই। এ ছবি অভিনেতা অক্ষয়কে নতুন ভাবে আবিষ্কার করেছে। তাতে মজাদার চেনা অক্ষয় আছে, বিষণ্ণ মাঝবয়েসি কলপের আড়ালে না ঢাকা পাকাচুলের অক্ষয়ও আছে। সত্যিই তিনি চরিত্রে শুধু মুখ ঢেকে নয়, অভিনয়গুণেও পর্দায় পৌরুষের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করলেন।‌

জনপ্রিয়

Back To Top