অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: আট বছর আগের একদিন। বাংলা ছবিতে এক ‘‌নতুন’‌ ভালবাসার আনন্দ, বিষাদকে নিয়ে এসেছিলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। হ্যঁা, ‘‌আরেকটি প্রেমের গল্প’‌ তথাকথিত ‘‌নারীসুলভ’‌ মানুষদের ভালবাসাবাসির কথাকে স্পষ্ট করেছিল। এইসব মানুষদের যারা প্রান্তিক করে রাখতে চায়, এইসব মানুষদের যারা ভেংচি কাটে, তাদের সপাটে থাপ্পড় দিয়েছিল ওই ছবি।
আট বছর পরে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় আবার দর্শকদের সামনে নিয়ে এলেন এমনই কিছু মানুষের গল্প, যাদের মানুষ বলেই স্বীকৃতি দিতে চায় না এই সমাজের একটা বড় অংশ। এই ছবি, ‘‌নগরকীর্তন’‌ও আরেকটি প্রেমের গল্প, অন্য এক প্রেক্ষাপটে।
‘‌আরেকটি প্রেমের গল্প’‌য় প্রধান চরিত্রে ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। পরে ঋতুপর্ণর পরিচালনায় তৈরি হয় ‘‌চিত্রাঙ্গদা’‌। ফলে ট্রান্সজেন্ডারদের আনন্দ, যন্ত্রণাকে ছুঁতে পেরেছে এই দুই বাংলা ছবি। কিন্তু প্রেমের গল্পের তো শেষ নেই। তাই এবার অন্য প্রেক্ষাপটে আর একবার গভীর আরেকটি প্রেমের গল্প বলেছেন কৌশিক, বড় পর্দায়।
এছবিতে মধু (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌ নবদ্বীপ ছেড়ে কলকাতায় এক চাউমিনের দোকানের ডেলিভারি বয়। কীর্তনের বাড়ির ছেলে সে। মন তো এক অন্য ভাবনায় থাকে। কলকাতায় কীর্তনের দলে মাঝে-‌মাঝে বাঁশিও বাজায়। সেই দলের মাস্টারের সঙ্গে ঘটনাচক্রে মধু গিয়ে পৌঁছয় এমন এর ডেরায়, যেখানে দল বেঁধে থাকে ট্রান্সজেন্ডাররা, যাদের হিজড়ে বলে চিহ্নিত করে লোকজন। সেখানে একটি মিষ্টি মেয়ে পুটিকে দেখে মন ভিজে যায় মধুর। কিন্তু, পুঁটি যে আসলে শরীরে পরিমল, সেটা জানতে পারার পর মন-‌কে কীভাবে প্রত্যাহার করবে মধু?‌ ওই পুঁটির চরিত্রে ঋদ্ধি সেন মন ভরিয়ে দিয়েছেন। খুব সূক্ষ্ম একটা রেখা ধরে চলেছে তার অভিনয়। একটুও এধার-‌ওধার হয়নি ঋদ্ধির। জাতীয় পুরস্কার যে যোগ্য অভিনেতার হাতে উঠেছে, সন্দেহ নেই।
আর, ঋত্বিক তো সেই ‘‌শব্দ’‌ থেকে যে চরিত্রে থাকেন, সেই চরিত্রের আকার ধারন করেন। নগরকীর্তনেও তাই।
ছেলেতে ছেলেতে প্রেম হয়?‌ প্রশ্নটা একসময় পুঁটিকেই করে মধু। আর, পুঁটি যখন বলে, ‘‌হল তো’‌, তখন কী নির্মল হয়ে ওঠে প্রেমের আবহ।
এই ছবিতে নিজেরই চরিত্রে এসেছেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি সোমনাথ থেকে পূর্ণ মানবী হয়ে উঠেছেন তাঁর জেদে, আত্মবিশ্বাসে। যিনি একটি কলেজের অধ্যক্ষা হয়েও ‘‌টিটকিরি’‌র মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু নিজের পথ থেকে সরে যাননি। সেই মানবীর কাছেই ছুটে আসে মধু আর পুঁটি। জানতে চায়, পুটি কীভাবে পূর্ণ নারী হয়ে উঠবে। নির্মল প্রশ্ন করে পুঁটি, খুব কি কষ্ট হবে অপারেশনে?‌ মানবী বলেন, যে কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছিস, অপারেশনের কষ্ট তার চেয়ে বেশি নয়।
এই কষ্টকে বইতে বইতে রাস্তায় হাততালি দিয়ে, গাড়ির জানলায় টোকা দিয়ে, হাত বাড়িয়ে উপার্জন করে পুঁটি ও তার স্ব-‌জনরা। পুঁটি পরচুল পরে। সেটাই ভাল লাগে মধুর। কিন্তু যদি পরচুল খুলে যায় একদিন?‌ মধুর মোহভঙ্গ হবে?‌ নাকি, বিস্ফোরণ হবে জগতে সংসারে?‌
অনেক প্রশ্ন উঠে এসেছে জীবনের সাবলীলতায়। প্রান্তিক জীবন-‌যাপনকে বড় মায়ায় স্পষ্ট করেছেন কৌশিক। শীর্ষ রায়ের ক্যামেরা যথার্থ সঙ্গী কৌশিকের। প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীত ছবির হৃদয়কে ছুঁয়ে আছে।
অভিনয়ে ঋত্বিক, ঋদ্ধি তো অনবদ্যই। কিন্তু বিস্মিত করেছেন গুরুমার চরিত্রে শঙ্করী। ভাল লাগে সুজন মুখোপাধ্যায় ও বিদীপ্তা চক্রবর্তীকে। সব মিলিয়ে বড় মায়ায় বেঁধে ফেলে নগরকীর্তন। মনে থেকে যায় মধু ও পুঁটির জীবনের গান। সে গান আনন্দের। সে গান বিষাদের।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top