অদিতি রায়: ‘‌মুলক’‌ শব্দটার মধ্যেই দেশ আর সীমানার ছায়া আছে। বাংলায় আমরা যাকে বলি মুলুক। আমাদের মুলুকেরই কাহিনী এই ছবি। এমন এক অসাড় সময়ে ‘মুলক‌’‌-‌এর মতো ছবি অবশ্যই রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। যে সময়টায় জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভেদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা দ্বেষ সবই চলছে স্ব স্ব ছন্দে, সমান্তরাল ভাবেই।
ছবির শুরুতেই বারাণসীর এক মহল্লায় সুখে বাস করা মুসলিম পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান দর্শকরা। যেখানে বহুদিন ধরেই মিশ্র, চৌবেদের সঙ্গে মিলেমিশে, সামাজিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে একইসঙ্গে ওঠা-‌বসা ওই পরিবারটির উৎসবে সামিল গোটা এলাকা। এই মহল্লাতেই ‘দেশি দাওয়াই‌’‌ ফেরি করে ‘‌মুরাদ আলি মহম্মদ’‌ (ঋষি কাপুর‌)‌। হাসিখুশি, সহজ-‌সরল মুরাদ দেশি ওষুধ বিক্রি করার পাশাপাশি চায়ের কাপে ‘‌গসিপ’‌ দিয়ে মন জয় করে গোটা মহল্লার।
এই উৎসবমুখর মহল্লায় রসভঙ্গ হয় যখন জানা যায় মুরাদ আলির ভাইপো শাহিদ (‌প্রতীক বব্বর)‌ মুসলিম উগ্রপন্থার দ্বারা প্রভাবিত। কখন যে সবার আড়ালে, মনোযোগের বাইরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় শাহিদ কেউ টের পায়না। এরপরই শুরু হয় এক বিয়োগান্তক অধ্যায়, যেখানে মাসুল দিতে হয় মুরাদ আলির পরিবারকে, প্রতিবেশীদের বিশ্বাসের মূল্যে, গোষ্ঠীচ্যুত হওয়ার মূল্যে, সর্বোপরি দেশদ্রোহিতার কলঙ্কের মূল্যে।
মুলুক নিয়ে এই আবেগ, রক্তপাত, রাজনীতি তো আজকের নয়, ১৯৪৭-‌এ দেশভাগের পর থেকেই এই অসহনীয়তার বীজ বপন হয়েছিল সুকৌশলে, দিনে দিনে তা আরও গভীর, আরও রক্তাক্ত হয়েছে বৈ তো নয়!‌ এই তন্ত্রীতেই আঘাত হেনেছে অনুভব সিনহার ‘মুলক’‌।
কোনও রকম ইঙ্গিত নয়, সোচ্চারে, স্পষ্ট উচ্চারণে একথা বলেছেন পরিচালক। যদিও ছবিতে আদালতে সওয়াল জবাবের দীর্ঘায়িত দৃশ্যে আর একটু সংযমী হলেও মন্দ হতো না। পাশাপাশি, মুসলিম কমিউনিটি মানেই অঢেল সন্তান প্রসব বা নিরক্ষরতার প্রকোপ, এবং ক্রিকেটে পাকিস্তান জিতলে ওই মহল্লার উৎসবমুখর হয়ে ওঠাটা বড্ড বেশি একপেশে লাগতে পারে কারুর কারুর। যদিও এ সবেই সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করেছেন অনুভব সিনহা। কেন কিছু গোষ্ঠী নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবছে ক্রমাগত, তাঁদের প্রতি বাকিরা কেন সহিষ্ণু বা যত্নবান হচ্ছেন না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজেছেন তিনি।
‘‌মুরাদ আলি’‌র চরিত্রে ঋষি কাপুর এবং ‘‌আরতি’‌ চরিত্রে তাপসী পান্নু যথাযোগ্য, এবং সিনেম্যাটিক। অনেকদিন পর প্রতীক বব্বরকে পর্দায় দেখে ভাল লাগল। নীনা গুপ্তার প্রত্যাবর্তন আবার সমৃদ্ধ করছে হিন্দি ছবিকে। বিচারকের চরিত্রে কুমুদ মিশ্র এবং পুলিস অফিসারের চরিত্রে রজত কাপুর তাঁদের স্বাক্ষর রেখেছেন যথারীতি।
দেশপ্রেমের ঝাণ্ডা না তুলে বরং কিছু উচিত প্রশ্ন তুলেছেন অনুভব। অবসরপ্রাপ্ত উকিল, হালের ‘দেশি দাওয়াই‌’‌ বিক্রেতা মুরাদ আলি ওরফে ঋষি কাপুর যখন প্রশ্ন তোলেন, আর কত জোরে বলতে হবে আমরা ভারতীয়, আর কতবার প্রমাণ করতে হবে আমরা ভারতীয়?‌ তখনই আদালতে ল’‌ইয়ার ‘‌আরতি’‌ ওরফে তাপসী পান্নু সওয়াল করে বলেন, এই ‘আমরা‌’‌, ‘‌ওরা’‌র বিভেদ ঘুচবে কবে?‌ আর ঠিক এখানেই জিতে যায় ‘মুলক’‌। আমাদের মুলুক।‌‌

‘‌মুল্‌ক’‌ ছবির একটি দৃশ্যে ঋষি কাপুর ও তাপসী পান্নু

জনপ্রিয়

Back To Top