একালের দর্শকদের জন্য। যে ছবির জন্যে আমরা অপেক্ষা করতে রাজি। যে ছবি আমাদের ‘‌ছোট’‌ বেঁচে থাকাকে বড় করতে চায়। যে ছবি ‘‌একক’‌ নয়, ‘‌একান্নবর্তী’‌ ভালবাসার কথা বলে। প্রচেত গুপ্তর গল্প নিয়ে তরুণ মজুমদারের ছবি ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌ তাই চিরকালীন।
অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: একজন ‘‌সেকেলে’‌ মানুষকে আমরা চিনি। তিনি সিনেমা পরিচালনা করেন। বহু উজ্জ্বল বাংলা ছবি তিনি উপহার দিয়েছেন আমাদের। কিন্তু এক সময় দেখা গেল, এই ‘‌সেকেলে’‌ মানুষটি তাঁর ছবির জন্যে প্রযোজক পাচ্ছেন না। বোঝা গেল, যথেষ্টই ‘‌সেকেলে’‌ হয়ে উঠেছেন তিনি, যার ফলে ‘‌একাল’‌ তাঁকে অগ্রাহ্য করছে। তবে, পুরোপুরি অগ্রাহ্য করলে ততটা বলার কিছু ছিল না। একালের একাধিক প্রযোজক কিন্তু তাঁর কাছে তখন এসেছিলেন। এবং এসেই ‘‌একালে’‌র মাপে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি ছিল, দক্ষিণী ছবির ভিসিডি দেখে-‌দেখে বাংলায় রিমেক ছবি বানিয়ে দেওয়া। এই ‘‌একেলে’‌ প্রস্তাবে রাজি হননি ‘‌সেকেলে’‌ পরিচালক। ফলে আবার অপেক্ষা। সাত বছর কোনও ছবি করতে পারেননি তিনি। তারপর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌কিন্নর দল’‌ গল্প অবলম্বনে তৈরি করলেন ‘‌আলো’‌। প্রযোজনায় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। সেই ছবি হৈ-‌হৈ করে দেখলেন একালের দর্শক। মিনার, বিজলী, ছবিঘরে ঝুলল হাউসফুল বোর্ড।
হ্যঁা, লেখাই বাহুল্য, এই পরিচালকের নাম তরুণ মজুমদার। ভাগ্যিস তিনি ততটাই ‘‌সেকেলে’‌ যে, একালের প্রযোজকের দুর্বিনীত দক্ষিণী-‌রিমেক-‌তৈরির-‌প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন অনায়াসে। এই কথাগুলো বারবার নিজেদের শোনাতে ইচ্ছে করে, এই ‘‌সেকেলে’‌ পরিচালকের ‘‌সেকালত্ব’‌কে অভিবাদন জানানোর জন্যে।
হ্যঁা, এই ‘‌সেকেলে’‌ পরিচালক আবার একটা নতুন ছবি নিয়ে হাজির বাংলার দর্শকদের কাছে। ছবির নাম—ভালবাসার বাড়ি।
এ কেমন বাড়ি?
একটা ছোটগল্প লিখেছিলেন প্রচেত গুপ্ত। গল্পের নাম ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌। এই গল্পের ভেতরকার কথাটা ছিল বল্লরী নামের এক মেয়ের মাথা উঁচু করে বাঁচার চেষ্টা এবং কলোনিতে থাকা তার বাবা, মায়ের সংসারটাকে টাকা-‌পয়সা নয়, ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখার স্বপ্ন। টাকার জোরে যে ছেলেটা তাকে সরিয়ে নিতে চায় তার বাবা, মায়ের সংসার থেকে, তাকে অগ্রাহ্য করার শক্তি আছে বল্লরীর। ভালবাসা কি বেচাকেনার সামগ্রী?‌ জুটমিল বন্ধ হয়ে চাকরিটা চলে গেছে বাবার। তাই, এখন এই বাড়িটাকেই ভালবাসার বাড়ি করে তুলতে চায় সেই মেয়ে।
প্রচেতর এই সংবেদনশীল গল্পকে কেন্দ্রে রেখেই তরুণ মজুমদার তৈরি করেছেন তাঁর নতুন ছবি—‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌। বিস্তার ঘটিয়েছেন কাহিনীর। এসেছে মূল কাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত উপকাহিনী। এসেছে নতুন কিছু চরিত্র। তরুণ মজুমদারের চিত্রনাট্য ভালবাসার বাড়ির প্রেক্ষাপটকে আরও বিস্তৃতি দিয়েছে।
বেশ কিছুদিন আগে, আমাদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, বহুদিন থেকে তাঁর মাথায় আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা গল্প—‘‌একান্নবর্তী’‌। তিনি বলেছিলেন,‌ ‘‌জানি না, এটা নিয়ে কখনও ছবি করতে পারব কি না। সময়টা তো অনেক পাল্টে গেছে গল্পের সময়ের চেয়ে।’‌
সময় পাল্টেছে, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে যে থেকে গেছে ‘‌একান্নবর্তী’‌-‌র অন্তর-‌কথা, সেটা টের পাওয়া যায় ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌তেও। হ্যঁা, তিনি তরুণ মজুমদার আজও স্বপ্ন দেখে যান সেই একান্নবর্তী বাড়ির, যেখানে চালচুলোহীন জনার্দনকাকা এসে বল্লরীর বাবার হতদরিদ্র সংসারে একচিলতে ঠাঁই করে নেন এবং দিব্যি সেই সংসারের একজন হয়ে থেকে যান অনায়াসে।
এ কেমন বাড়ির কথা শোনাচ্ছেন তরুণ মজুমদার একালের আধুনিক মানুষদের?‌ একালে, আধুনিক জীবনযাপনে বৃদ্ধ মা, বাবাই যেখানে সংসারে প্রায় অবাঞ্ছিত, পাশের ফ্ল্যাটে কে এল আর গেল, তাতে বয়েই গেল যখন, নিজেদের ছোট ছোট বাক্সে শুধু নিজেদের নিয়েই যখন ব্যস্ত এবং ‘‌সুখী’‌ এই আধুনিক সময়, তখন কোথা থেকে আধ-‌বুড়ো জনার্দনকাকাকে নিয়ে এসে বল্লরীদের নুন-‌আনতে-‌পান্তা ফুরোয় সংসারে বসিয়ে দিলেন তরুণবাবু?‌ এই ‘‌সেকেলে’‌ ভাবনাচিন্তা ‘‌একেলে’‌ মানুষদের পক্ষে সহ্য করা যে বড্ড কঠিন!‌ আর, যদি কিঞ্চিৎ সহ্য হয়, যদি একটু অনুভূতিও বেঁচে থাকে, তাহলে চোখ দুটো যে ছল-‌ছল করে উঠবে। এই ‘‌সেকেলে’‌ চোখের জলের আর একটা নাম হতে পারে—ভালবাসার বাড়ি।
ইট, কাঠ, পাথরের বাড়ি নয়
বল্লরীদের বাড়িটা সত্যিই ইট, কাঠ, পাথরে তৈরি ঝাঁ চকচকে বাড়ি নয়। সে বাড়ির আস্ত একটা পাঁচিলও নেই। বাঁশ, বাখারির বেড়া আছে। চটকল বন্ধ হয়ে বাবার চাকরি চলে গেলে গানের স্কুল খোলে বল্লরী। গানের স্কুল যখন, তখন তরুণ মজুমদারের বরাবরের অস্ত্র হল রবীন্দ্রসঙ্গীত। আর, এটা এমনই এক অস্ত্র যে, ‘‌চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’‌ হয়ে গিয়েছিল ‘‌দাদার কীর্তি’‌র গান। স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেও অনুষ্ঠানে গাইতে হয়েছে ‘‌দাদার কীর্তি’‌র এই গান। অনুরোধ এসেছে, ‘‌দাদার কীর্তি’‌র গান চাই।
এই ছবিতে তরুণবাবুর গানের মহল সামলেছেন শান্তনু বসু। ৬টি রবীন্দ্রসঙ্গীত শান্তনুর সঙ্গীত-‌আয়োজনে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে জয়তী চক্রবর্তীর কণ্ঠে। ভালবাসার বাড়ি-‌র ভেতরের সুরকে স্পষ্ট করেছেন সঙ্গীত পরিচালক শান্তনু বসু। আর, জয়তী মুগ্ধ করেছেন প্রতিটি গানে। ‘‌ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’‌ ‘‌আমার অঙ্গে অঙ্গে কে’‌ থেকে শুরু করে ‘‌বাজিল কাহার বীণা’‌—অনবদ্য। ঋতুপর্ণার লিপ-‌এ জয়তীর রবীন্দ্রসঙ্গীত এছবির একটা বড় প্রাপ্তি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সুর দিয়ে তৈরি হয়েছে বল্লরীদের বাড়ির দেওয়াল।
বল্লরীর চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আগাগোড়া বিশ্বাসযোগ্য। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের লড়াকু মেয়ে হয়ে ঋতুপর্ণা মন ভাল করে দেন। আর, তাঁর বাবার চরিত্রে অনবদ্য প্রয়াত দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চের এই অভিনেতার শান্ত, গভীর, বিষন্ন অভিনয় মনে থাকবে বহুদিন। মঞ্চে তিনি তো শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন পরিচালকও। যোগ্য পরিচালকের ছবিতে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শেষ ছবিতেও দেখিয়ে গেলেন পর্দায় অভিনয়ের পরিমিতিবোধ। তাঁর পাশাপাশি মঞ্চের আরও তিন অভিনেতা, পরিচালককেও সুন্দর কাজে লাগিয়েছেন তরুণবাবু। একজন হলেন বিভাস চক্রবর্তী, যিনি জনার্দনবাবু হয়ে বল্লরীদের সংসারে এসে দারিদ্র-‌টারিদ্রকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। তাঁর উপস্থিতি সারাক্ষণই ঝলমলে। আর একজন হলেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য। তিনি পাড়ার চায়ের দোকান সামলান। ‘‌দায়বদ্ধ’‌র সেই ডাকাবুকো লরির ড্রাইভারের মতো পর্দায় আসেন তিনি এবং ভাল লাগা আদায় করে নেন। আর এক নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা পঙ্কজ মুন্সী একটা মাত্র দৃশ্যে আসেন, দুর্ঘটনা থেকে বাঁচানো ট্রাভেল এজেন্সির বাস ড্রাইভারের চরিত্রে। এই কাজের জন্যে তাঁকে সম্মান জানানো হল ফুল দিয়ে। সেই সম্মান তো তিনি জন্মে পাননি, পাবার কথা ভাবেনওনি কখনও। ফলে, এই পরিস্থিতিতে কী অসাধারণ একটা প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠল পঙ্কজ মুন্সীর অভিনয়ে। এক কথায়, অবিস্মরণীয়।
নাটকের মঞ্চে যাঁরা দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন, তেমন দুই শিল্পী চিত্রা সেন আর রজত গঙ্গোপাধ্যায়ও মুগ্ধ করেছেন। বল্লরীর মায়ের চরিত্রে শ্রীলা মজুমদারও সুন্দর। বল্লরীর বন্ধুর চরিত্রে শ্রাবণী বনিককেও ভাল লাগে। দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন মজুমদার, রিমি সাহা যথাযথ। অর্জুন চক্রবর্তী, দেবদূত ঘোষের স্বাভাবিক অভিনয় নজর কাড়ে। ঋতুপর্ণার বিপরীতে নবাগত প্রতীকের ওপর চাপ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু ভাল অভিনয় করেছেন প্রতীক। ক্যামেরায় শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায় যথাযথ সঙ্গত করেছেন পরিচালকের সঙ্গে।
এবং অপেক্ষা
সব মিলিয়ে, ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌ তরুণ মজুমদারের ‘‌সিগনেচার টিউন’‌ নিয়েই হাজির। ‘‌বালিকা বধূ’‌, ‘‌শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’‌, ‘‌দাদার কীর্তি’‌ কিংবা ‘‌গণদেবতা’‌, ‘‌সংসার সীমান্তে’‌র তরুণ মজুমদার তো নিজের মতোই ছবি করেছেন এবং করবেন। ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌ও তাই। হয়ত মনে হতে পারে জনার্দন কাকা আর বল্লরীর বাবা যে দোকান খুললেন, সেটা একটুও দেখা গেল না কেন, বল্লরীর বান্ধবী কেন সারাক্ষণই বল্লরীর গাইড হয়ে আসবে, পাড়ার মস্তান কেন উঁকিঝুঁকি দিয়ে অদ্ভুত আচরণ করবে, ইত্যাদি। কিন্তু এইসব প্রশ্ন বা মনে হওয়া তরুণ মজুমদারের ছবির মূল সুরকে বাধা দিতে পারে না। যে একান্নবর্তী বাড়ির স্বপ্ন তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন, ‘‌সেকেলে’‌ সেই স্বপ্ন আজও তো আমাদের কাউকে কাউকে বাঁচার আশ্বাস দেয়। ৮৬ বছরের পরিচালকের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি।
ফলে, তাঁর কাছে আরও ছবির দাবি করতে চাই আমরা। এখনও তিনি পারেন ক্রেনের ওপর উঠে ক্যামেরা অপারেট করতে। এখনও পারেন আস্ত একটা ছবিকে নিজের মতো করে ভাবতে। ফলে, তাঁর এই ভালবাসার জন্যে আমাদের অপেক্ষা জারি থাকছে এখনও। তাঁর ‘‌সেকেলে’‌ ভাবনার ছবি আমাদের অন্যরকম বাঁচার স্বপ্ন দেখাক। আপাতত, ‘‌ভালবাসার বাড়ি’‌র জন্যে তাঁকে প্রণাম। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top