সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • মিতিন মাসি। • পরিচালনা:‌ অরিন্দম শীল। • অভিনয়ে:‌ কোয়েল মল্লিক, বিনয় পাঠক,
 রিয়া বণিক, শুভ্রজিৎ দত্ত, জুন মালিয়া।
পারিবারিক বিনোদন। সিনেমা হলে দর্শকের ছবি দেখার আনন্দে এবং বক্স অফিসের আবেদনে আজও যার কোনও বিকল্প নেই। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে মজা পেতে পেতে দেখার মতো ছবি। োজাসাপটা সেই পথে হেঁটেছেন অরিন্দম শীল। বেশ একটু ‘‌ট্র‌্যাক’ পরিবর্তন করে। ওপরে বলা ‘‌ছবির মজা’‌ বলতে এখানে ‘‌রহস্য’‌। মানে মূল উপাদান গোয়েন্দা গল্প। এবং তা মূলগতভাবে সরাসরি চিত্রনাট্য নয়। বরং ছবি বলতে এখানে ‘‌বই’। মানে সাহিত্যকে পর্দায় নিয়ে আসা। পরিসংখ্যান বিচার করলে এই মুহূর্তে টালিগঞ্জে গোয়েন্দা কাহিনি মানে সাহিত্যনির্ভর গোয়েন্দা কাহিনিকে পর্দায় সফলভাবে নিয়ে আসার ব্যাপারে অরিন্দম শীলই সন্দেহাতীতভাবে এক নম্বরে। দু–‌দুটো গোয়েন্দা ‘‌ফ্র‌্যাঞ্চাইজি’‌ তিনি এর আগে সফলভাবে সামলেছেন। ‘‌ব্যোমকেশ’‌ এবং ‘‌শবর’‌। দুটোতেই হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। এবং এবার স্বাদ পাল্টে ঢুকে পড়েছেন নতুন ‘‌ফ্র‌্যাঞ্চাইজি’‌ সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘‌মিতিন মাসি’‌ সিরিজে এবং প্রথম ছবিতেই ব্যাপারটা সামলেছেন দুর্দান্ত।
সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তাঁকে দিতে হয় এ জন্য যে আগের দুটো সফল সিরিজের কোনও ‘‌হ্যাংওভার’‌ তাঁর এ ছবির ওপর নেই। না গল্পের চরিত্রে। না ‘‌কাস্টিং’‌–‌এ, না ‘‌ট্রিটমেন্ট’‌‌–‌এ। থাকা উচিতও ছিল না। কারণ শবর তো বটেই, ব্যোমকেশও অরিন্দমের হাতে পড়ে হয়ে উঠেছে ‘‌বিস্ফোরক’‌। শবর যৌনতায়। আর ব্যোমকেশ রাজনীতিতে। মূল সাহিত্য থেকে অনেকটাই স্বাধীনতা নিয়ে সরে এসে। কারণ সেক্ষেত্রে অরিন্দম জানতেন তাঁর ছবির টার্গেট দর্শক মূলত প্রাপ্তবয়স্করা। ‘‌মিতিন মাসি’‌–‌র ক্ষেত্রে তা নয়। এ ছবির দর্শক অপ্রাপ্তবয়স্করাও। যেহেতু এই চরিত্রটি সুচিত্রা ভট্টাচার্য তৈরি করেছিলেন কিশোর পাঠক–পাঠিকাদের কথা ভেবে। রহস্য গুণে তা তাদের অভিভাবকদেরও ভাল লাগে এই যা।
অরিন্দমের অন্য ‘‌থ্রিলার’‌ ছবির সঙ্গে ‌‌‌তাই এ ছবির মূল তফাত মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার গঠনে। যেটা ওঁর আগের ছবিগুলোর মূল উপাদান নাটক তৈরিতে, সেটাকেই বাদ দিয়েছেন তিনি এ ছবিতে। সেই জায়গা নিয়েছে দুটো ব্যাপার। এক মিতিন মাসির পারিবারিক জীবন। দুই, অ্যাকশন আর চেজিং, যা এ ছবির রোমাঞ্চের মূল ব্যাপারটা ধরে রেখেছে।
ছবি শুরুই হচ্ছে দারুণ এক ‘‌ফাইট সিকোয়েন্স’‌ দিয়ে। এই প্রথম দৃশ্যেই চরিত্রটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আর ধরতাইটা দারুণ পেয়েছেন কোয়েল মল্লিক। মিতিন মানে 
‌প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে একেবারে বিকল্পহীন লেগেছে তাঁকে ‘‌প্রেজেন্স’‌ এবং ‘‌মাউন্টিং’‌ গুণে। তাঁর এতদিন করা সব চরিত্রের থেকে আলাদা এ চরিত্র। বোঝা যায় শারীরিক ও মানসিকভাবে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছেন কোয়েল এ চরিত্রের রক্তমাংসে ঢুকতে।
আসলে চরিত্রটা শুধুই অ্যাকশন নির্ভর হয়ে যায়নি অরিন্দমের চিত্রনাট্যে নিজস্ব এক ‘‌টাচ’‌–‌এ। প্রথমত, বাইরের দুনিয়া সামলেও মিতিন দারুণ রকমের সংসারী। কী বাজার হবে, কাজের লোকের মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ছে, তার কী দরকার— সবকিছুই তার নখদর্পণে। কিন্তু এহ বাহ্য, দ্বিতীয় উপাদানটা আরও মানবিক। নিজেদের সন্তান না থাকার জন্য মিতিন আর তার বরের দুঃখ। খুব সংযত কিন্তু আবেদনপূর্ণভাবে এসেছে ব্যাপারটা, যা এই গোয়েন্দা চরিত্রকে ঘিরে বেদনার অন্য একটা পরত তৈরি করেছে। এই সাংসারিক পর্যায়টাতে কোয়েলকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছে পার্থ চরিত্রে শুভ্রজিৎ দত্তের অভিনয়। শুভ্রজিতের সংযত অথচ সংবেদনশীল অভিনয় মনে রাখার মতো। অন্যদিকে, ফেলুদার যেমন তোপসে, মিতিনের তেমনি বোনঝি টুপুর। সর্বকাজের সাথী। এই চরিত্রে রিয়া বণিককেও ভাল লেগেছে সপ্রতিভতায়। আর ‘‌মেন্টর’‌ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অনির্বাণ চক্রবর্তীও তাঁর বাড়াবাড়িহীন অথচ যথাযথ অভিনয় নিয়ে একেবারে ‘‌ফিট’‌। এই আরেকজন দারুণ অভিনেতা বাংলা সিনেমায় এসে গেলেন। ফলে প্রথম ছবিতেই ‘‌টিম মিতিন’‌ একশোয় একশো। ছবির গল্পে রহস্যের কেন্দ্রে আছে কলকাতায় বসবাসকারী এক পার্সি পরিবার। মিঃ ও মিসেস জারিওয়ালা তাদের একমাত্র সন্তান কিডন্যাপ হওয়ায় শরণাপন্ন মিতিনের। এই তদন্তের সুবাদে কলকাতায় বসবাসকারী পার্সিদের ‘‌কমিউনিটি’‌‌ ইতিহাস চমৎকারভাবে এসেছে ছবিতে। তবে সঙ্গে আর একটু ‘‌ভিস্যুয়াল’‌ এ ব্যাপারে থাকলে ভাল হত। মিঃ জারিওয়ালার চরিত্রে বিনয় পাঠকের মতো দুর্দান্ত একজন সর্বভারতীয় অভিনেতাকে পেলে কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়, হয়েছেও। তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে জুন মালিয়াও যথাযথ। তবে আনুষঙ্গিক দু–‌একটি চরিত্রে আরেকটু সবল চরিত্রায়ন দরকার ছিল।
এ সব ফাঁকফোকর অবশ্য ঢেকে দিয়েছে রোমাঞ্চকর সব চেজিং সিকোয়েন্স। যাকে অনেকটাই ধরে রেখেছে বিক্রম ঘোষের দুর্দান্ত ‘‌ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর’‌। দাবি উঠবেই আবার চাই ‘‌মিতিন মাসি’‌।   ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top