সম্রাট মুখোপাধ্যায়: একটি উপন্যাস। ‘‌মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’‌। যা লেখা হওয়ার চার দশক পরেও আশ্চর্যভাবে সমান জনপ্রিয়। ছোটদের জন্য লেখা। অথচ বড়রাও সমানতালে পড়েছে। সেই ছোটরাও আজ প্রায় বুড়ো হয়ে গিয়েও পড়েছে। 
এমন একটা ‘‌মিথ্‌’‌ হয়ে যাওয়া লেখা নিয়ে সিনেমা করতে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকিরই ব্যাপার। কারণ পরিচালক হিসেবে নিজের সব ‘‌ইনপুটস‌’‌ ঢেলে‌ দেবার পরেও বোধহয় উপন্যাসটি পড়ে–‌হলে–‌ঢোকা দর্শক ভোজবাড়ির শেষ ‘‌আইটেম’‌ পান চিবোনোর মতো করে বলতে বলতেই বেরোবে, ‘‌নাঃ, মিলল না, মনের কুলুঙ্গিতে থাকা সেই ছবির সঙ্গে যেন মিলল না।’‌
এটা বুঝেই এ ছবির মেকিং–‌এ তিনটি সতর্কবার্তা রেখেছেন অনিন্দ্য। এক, মূল উপন্যাস থেকে একটুও সরে যায়নি এ ছবি। ‘‌নভেল’‌ শুধু যেন চলমান ‘‌গ্রাফিক নভেল’‌ হয়েছে। দুই, ছবির রং। সচেতনভাবে একটা ধূসর লালচে রঙের ‘‌সিপিয়া’‌মেলানো আছে এ’‌ছবির ‘‌কালার টেক্সচার’‌–‌এ, যা উপন্যাসের সঙ্গে বেরোনো জলরঙের ছবির আবেদনকে ধরতে চেয়েছে। কিছুটা ‘‌অ্যানিমেশন’ও‌ যোগ করা হয়েছে।  
এবং তিন, গল্পের থেকে এ’‌ছবিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে চরিত্রগুলো দাঁড় করানোয়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এ কাহিনী যেন একেবারে ‘‌চরিত্র চিত্রশালা’‌। একের পর এক মজাদার রঙীন চরিত্র সব। আর তাদের ‘‌এন্ট্রি–‌এক্সিট’‌ ধরে ধরে পর্দায় অ্যালবাম সাজিয়েছেন অনিন্দ্য। প্রথম পর্বে প্রায় আধ ঘণ্টা ব্যয় করেছেন এইসব চরিত্রদের একের পর এক পরিচিতিতে। চিত্রনাট্যের জমিতে করানো ‘‌র‌্যাম্প–‌ওয়াক’‌–‌এর মতো। ফলে গল্পের টানা মেজাজের অবিচ্ছিন্নতার চেয়ে অনিন্দ্য জোর দিয়েছেন টুকরো টুকরো মজাদার  ‘‌সিচুয়েশান’‌–‌এ। মূল কাহিনীতেও এই ভেঙে ফেলার হাতছানিটা ছিল। তাতেই ধরা দিয়েছে এ ছবি। আর হয়ত সেটাই এ সিনেমার পক্ষে কিছুটা ফাঁদও হয়ে গেছে। ছোট ছোট সিচুয়েশনাগুলো দেখতে কম বেশি মজা লেগেছে। কিন্তু সবটা জুড়ে একটা হারানো আধুনিক–‌রূপকথার ‘‌গ্র‌্যাঞ্জার’‌টা পায়নি। চকচকে ঘরেও কতকগুলো লুকানো বিষণ্ণতার ঝুল লেগে থাকে। এ গল্পে যেটা দারুণভাবে ছিল একসময়। পড়তি রাজার শসা খাওয়ায়, রানীর ঘুঁটে দেওয়ায় এমনকী ডাকাতদলের রাতের পদ–‌যাত্রাতেও। সেগুলো সেই মাত্রায় যেন এল না। মন খারাপ না মিশলে নস্টালজিয়াটা জমে না। সেই ‘‌নস্টালজিয়া’‌র জলছবিটা সিনেমার ভেতর থেকে ‘‌ওয়াটারমার্ক’‌–‌এর মতো উঠে এল না।
বদলে ভজহরিবাবুর (‌রজতাভ দত্ত)‌ বাজার করবার মজা কিংবা সেই ডাকাতদলের সঙ্গে মিশে নেশার ঘোরে ডাকাতি করতে যাবার মজা এসেছে। গানের মাস্টার অম্বরীশ ভট্টাচার্যর গলায় দড়ি দিতে যাওয়া। অঙ্কের মাস্টার মশাইয়ের (‌অনির্বাণ ভট্টাচার্য)‌ নিলডাউনের ভঙ্গীতে বসে পড়ানো, পিসিমার (‌সোহাগ সেন)‌ গোবরে গেঁথে যাওয়া, পুরুতমশাইয়ের মজাদার হাবভাবভঙ্গী, ‘‌ভুলোমনা’‌ চাকরের (‌প্রদীপ ভট্টাচার্য)‌ উল্টোপাল্টা জবাব, গোলোক স্যারের (‌মনোজ মিত্র)‌ প্রৌঢ় ছাত্রকেও ওঠবোস করিয়ে আনন্দ পাওয়া, কালী কীর্তন শোনা দারোগা, মনোজদের বাবার নাটকের দলে অভিনয়, ক্রিকেট ম্যাচে মনোজের ছক্কা মারা ও হ্যারিকেনের গুঁতোয় খেলা পণ্ড হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদিরা পরপর এসেছে, দর্শকদের হাসিয়েছে। হাততালিও পড়েছে প্রচুর। কিন্তু এ ছবির সেরা ‘‌শট’‌ গোয়েন্দা বরদাচরণ চরিত্রটির ‘‌মাউন্টিং’‌ করে তুলে আনা আর সে চরিত্রে ব্রাত্য বসুর আশ্চর্য টাইমিং সমৃদ্ধ অভিনয়। গল্পের অনেকগুলো ট্র‌্যাকের মধ্যে সন্দেহ নেই এটাই সেরা টুকরো। এটাই ছবিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। 
ডাকাতদলের আর রাজকুমারের (‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌ অংশটা তুলনামূলক ভাবে দুর্বল।  ফলে মনোজের (‌সোহম মৈত্র) ছবির মজাটা আসি আসি করেও এল না। রাজকুমার চরিত্রটাও ততটা গুরুত্ব পেল না। ডাকাত সর্দারের চরিত্রে শিলাজিৎ বেশ ভাল অভিনয় করেছেন পিলে চমকানো ডাকাতিয়া অভিনয়ের ক্লিশেটা থেকে বেরিয়ে এসে। তাঁর সুর এছবিতে অন্য একরকমের মজা তৈরি করেছে। মনোজের চরিত্রে সোহম মৈত্র আর সরোজের চরিত্রে পূরব শীল আচার্য যথাযথ। ছবির কাহিনীর আগে পরে একাহিনীর লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সংযোজনা বেশ অভিনব। লেখাটার রান্নাঘরে পৌঁছে যাওয়া।
সব মিলিয়ে, আজকের ছোটদের এবং বড়দের জন্যে এক আশ্চর্য গল্পকে যে বড়পর্দায় সাজিয়ে দিলেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, তার জন্যে ধন্যবাদ। এই সাজানোয় কিন্তু হৃদয় জড়িয়ে আছে। ‌ 
 

জনপ্রিয়

Back To Top