অদিতি রায়: এখানে শাশুড়ি-‌বৌমার ঠাণ্ডা লড়াই আছে, অনাথ মেয়ের ধনী পরিবারের ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা আছে, ব্রাহ্মণ-‌ক্ষত্রিয় ইন্টারকাস্ট বিয়ে আছে, ভীরু স্বামীর দাপুটে বৌ আছে, ষড়যন্ত্রকারী দেওর আছে, অনুগত কর্মচারী আছে, আইটেম ডান্স আছে, দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি আছে, আর আছেন কঙ্গনা রানাওয়াত। শুধু যা নেই তা হল ১৬০ বছর আগে যুদ্ধক্ষেত্রে মাতৃভূমির জন্য প্রাণত্যাগ করা এক বীরাঙ্গনার গড়ে ওঠার ইতিহাস!‌
‘মণিকর্নিকা‌’‌ ছবিতে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের ভূমিকায় কঙ্গনা রানাওয়াত কখনও ‘‌তনু ওয়েডস মনু’‌র তনুর মত উচ্ছ্বল, বেপরোয়া, কখনও ‘‌তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস’‌-‌এর দত্তোর মতো লড়াকু। মানে ওই চেনা কঙ্গনা আর কী!‌ ১৪ বছর বয়সেই বাঘের হাত থেকে ছাগশিশুকে বাঁচায় মণিকর্নিকা ওরফে রানি লক্ষ্মীবাঈ। আবার রানি হয়ে প্রজার বাছুরকে ইংরেজ সৈনিকের খাদ্য হয়ে ওঠা থেকেও রক্ষা করে, গো-‌শিশু বলে কথা!‌ নেপথ্যে ধ্বনি ওঠে ‘হর হর মহাদেব‌’।
ঝাঁসি রানির বীরত্বের কাহিনী ছোট থেকেই আমাদের পড়া, শুধু পড়াই নয়, এই কাহিনী নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীকও বটে। কিন্তু এই ছবিতে লক্ষ্মীবাঈ যে শুধুই স্টান্ট দেখালেন!‌ মাটি থেকে শূন্যে পাক খেয়ে হাতির পিঠে চড়া থেকে তলোয়ার চালনা, প্রবল গতিবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁর দিকে ধাবমান গুলিকে পেছনে ফেলে দেওয়া, কঙ্গনা চেষ্টার কসুর করেননি মোটেও। তিনি প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী, রাগ, দুঃখ, হতাশা, দেশপ্রেম সবই যথাযথ, শুধু মুশকিল একটাই, পরিচালক কঙ্গনা, অভিনেত্রী কঙ্গনার ঘাড়ে ভর করে ছবিটাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে গেছেন প্রাণপণ, ব্যর্থ হয়েছেন এখানেই!‌
কঙ্গনা রানাওয়াত ওরফে রানি লক্ষ্মীবাঈ ইংরাজিতেও কথা বলেছেন ব্রিটিশদের সঙ্গে, কিন্তু ব্রিটিশরা আবার নিজেদের মধ্যেও বেশিরভাগ সময় ‘ঠুম হামখো ঝাঁসি ডে ডো‌’‌ টাইপের হিন্দি বলে গেছে!‌ প্রেক্ষাগৃহে কয়েকজন কলেজপড়ুয়া যুবতী খিলখিল করে হেসে উঠছিল এই সব দৃশ্যে!‌ ইতিহাস আশ্রিত ‘মণিকর্নিকা‌’‌-‌তে এই ‘‌কমিক টাচ’ কি খুব প্রয়োজন ছিল?‌ যেমন গান শুরু হলেই মনে হচ্ছিল ‘আবার গান‌’‌!
অর্থাৎ নেটফ্লিক্স-‌আমাজনের বাড়বাড়ন্তের যুগে ‘মিলেনিয়াল‌-এর স্পন্দনটাও ধরতে পারেননি পরিচালক কঙ্গনা রানাওয়াত। ‘‌হাতে চুড়ি’‌ পরাটা কাপুরুষের লক্ষণ বলে ধরা হয় আজও!‌ নারীশক্তির কথা বলা হচ্ছে যে ছবিতে, সেই ছবিতেই স্বামী গঙ্গাধর রাওয়ের (যিশু সেনগুপ্ত‌)‌ ‌হাতের বালা নেড়েচেড়ে দেখছেন রানি লক্ষ্মীবাঈ!‌ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে শিল্প অনুরাগী রাজা গঙ্গাধর রাও আদপে ভীরু!‌ নাঃ এটাও ঠিক হজম হলনা।
ও হ্যাঁ, যিশু সেনগুপ্ত। যিশু এখানে কঙ্গনার স্বামী রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের ভূমিকায়। যিশুর সুন্দর চেহারা বেশ রাজকীয়, কিন্তু এখানে যিশু ‘এক যে ছিল রাজা‌’‌ নন, নেহাতই ‘‌নায়ক’‌ কঙ্গনার পার্শ্বচরিত্র। তবে যিশু শুধু নন, প্রত্যেক ফ্রেমে শুধুই কঙ্গনা রানাওয়াত, তাই ড্যানি ডেনজোংপা, কুলভূষণ খারবান্দা, অতুল কুলকার্নি, সুরেশ ওবেরয়, মহম্মদ জিশানের মতো অভিনেতারাও এখানে নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর।
হলিউড বা বিশ্ব সিনেমার পিরিয়ড ফিল্ম বা যুদ্ধের ছবির উদাহরণে নাই বা গেলাম। আমাদের দেশেও তো ‘‌বাহুবলী’‌ হয়ে গেছে, তাই ‘‌মণিকর্নিকা’‌র একঘেয়ে যুদ্ধ দৃশ্য বা দুর্বল প্রযুক্তির ভিএফএক্স উৎরে দিতে পারেনি ছবিকে। আসলে একটা সলিড স্ক্রিপ্ট খুব জরুরি ছিল। হয়ত কৃষ যখন পরিচালনা করেছিলেন তখন একটা চিত্রনাট্য ছিল, কঙ্গনা দায়িত্ব নেওয়ার পর চিত্রনাট্যের চাহিদার বাইরে গিয়েই সম্ভবত রানি লক্ষ্মীবাঈ হয়ে উঠেছেন সুপার-‌ওম্যান, যিনি অনায়াসে টেক্কা দিতে পারেন স্পাইডার ম্যানকে!‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top