অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একেবারেই চালাক নন। তাঁরা আর একবার সেটা প্রমাণ করলেন তাঁদের নতুন ছবি ‘‌হামি’‌তে। অতি-‌চালাকির যুগে চালাক না-‌সাজার দৃষ্টান্ত তাঁরা আর একবার রাখলেন। চালাক নন, কিন্তু বুদ্ধির সঙ্গে হৃদয়কে  তাঁরা মেশাতে জানেন। এবং প্রমাণ করলেন আর একবার, বুদ্ধি থেকে হৃদয়কে বাদ দিয়ে যে চালাকি, সে পথে তাঁরা হাঁটতে চান না। চান না বলেই, আর একবার তাঁদের ছবি ‘‌হামি’‌ স্পর্শ করছে দর্শকদের হৃদয়। দর্শকদের হাসাচ্ছে এবং কাঁদাচ্ছে। আর, কে না জানে, চোখের জলে কোনও চালাকি মিশে থাকে না।
দুই
‘‌মিস আমি প্রেগন্যান্ট’‌। একটি ফুটফুটে বছর আষ্টেকের মেয়ে ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে দিদিমণিকে যদি এই কথা বলে, তখন আপনি হাসবেন না কাঁদবেন?‌ আর কী অপাপবিদ্ধ সেই প্রশ্ন!‌ আমরা, বড়রা যে কতটা বোকা, কত প্রশ্নের উত্তর যে আমাদের জানা নেই, ছোটদের কত প্রশ্ন যে আমরা এড়িয়ে  যেতে চাই এবং এড়িয়ে বেঁচে থাকতে চাই নিজেদের বৃত্তে, তারই কিছু গাঢ় অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ‘‌হামি’‌। আর এমন প্রশ্ন  যদি করে তনুরুচির মতো একটা মিষ্টি মেয়ে, আমরা বোধহয় মুখ লুকোনোর জায়গা খুঁজে পাই না। চিনির মতো একটা মেয়ে তেতো করে দিতে পারে আমাদের লোক-‌দেখানো ‘‌আভিজাত্য’‌কে।
আর, ওই বছর আষ্টেকের ছেলেটি, যখন তার চোখ বুজে-‌বুজে আসছে, ভাল করে হাঁটতে পারছে না, টাল খেয়ে যাচ্ছে, তখন মনে হয়, ক্লাস রুমে বোধহয় অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। দিদিমণি শঙ্কিত হয়ে যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘‌কী হয়েছে তোমার’‌, তখন সে বলে, ‘‌আমার টিপসি লাগছিল’‌। প্রথমে শুনে দিদিমণির যেমন, আমাদেরও কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। টিপসি?‌ কী বলছ তুমি?‌ ছেলেটি তখন সব প্রশ্নের মীমাংসা করে জানায়, ‘‌স্কচ খেলে টিপসি হয়!‌’‌ সে তো বাড়িতে বাবার স্কচের গন্ধ শুঁকেছে। ফলে, তার টিপসি হতে অসুবিধে কোথায়?‌ হাসির শব্দ ওঠে প্রেক্ষাগৃহে। সেই শব্দের মধ্যে কোথায় একটা যেন থাপ্পড়ের আওয়াজ ছিল!‌
তিন
‘‌প্রেগন্যান্ট’‌ হওয়া দোষের নয়, স্কচ খাওয়াও পাপ নয়। কিন্তু, আমরা, বড়রা অনেক সময় ভুলে যাই, ছোটদের সামনে কোন কথাটা ঘটা করে বলতে নেই, কোন আচরণটা বড়লোকি দেখাতে গিয়ে ভুলে যেতে নেই। আমাদের আচরণটা যখন কোনও ছোট হুবহু অনুকরণ করে, তখন সেই‘‌গাধা’‌টাকে পিটিয়ে ‘‌‌মানুষ’‌ বানিয়ে তুলতে আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাই। শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাই। সেই শাকটা যদি সরিয়ে দেন শিবপ্রসাদ আর নন্দিতা রায়, তাহলে মাছটা আর ঢাকা থাকে না।
চার
মাস্টার মশাইয়ের ভঙ্গিতে কোনও জ্ঞান দেবার চেষ্টা করেননি নন্দিতা, শিবপ্রসাদ। বরং, কমেডির একটা চালচিত্র তৈরি করে এগিয়েছেন ‘‌হামি’‌ ছবিতে। কমেডির জন্যে কষ্টে-‌সৃষ্টে কমেডি করতে হয়নি। চিত্রনাট্যে নানান সিচ্যুয়েশন তৈরি করেছেন তাঁরা, যা সাবলীলভাবেই কমেডি হয়ে উঠেছে। আর সত্যিকারের কমেডি-‌ই তো  পারে জীবনের নানান অসঙ্গতিকে আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট করে তুলতে।
রামধনু-‌র সেই মধ্যবিত্ত লালটু (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ আর মিতালি (‌গার্গী রায়চৌধুরি)‌ সত্যিই যেন কয়েকটা বছর পেরিয়ে আবার আমাদের সামনে। এখন লালটু মধ্যবিত্ত-‌র আর্থিক সীমানা ভেঙে ঢুকে পড়েছে উচ্চমধ্যবিত্তের বৃত্তে। ফলে ছেলে ভুটু তথা বোধিসত্ত্বর (‌ব্রত)‌ জন্মদিনে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করার ক্ষমতা তার আছে এবং বাড়িতে ফিরে এত টাকা খরচ করার আফসোসও আছে। দুরন্ত রসায়ন শিবপ্রসাদ আর গার্গীর। তাঁদের অভিনয় বড্ড জীবন্ত করে তুলেছে এই দুটো চরিত্রকে। আর, স্কুলের সামনে কণীনিকার সঙ্গে চুলোচুলির দৃশ্যে কিংবা স্কুলের প্রিন্সিপালের ঘরে ‘‌অভিজাত’‌ চূর্ণীকে তুই-‌তোকারি করে নাস্তানাবুদ করার দৃশ্যে অনবদ্য গার্গী। অন্যদিকে দাপুটে ক্ষমতাবান কাউন্সিলার (‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌-‌এর দাপুটে বউ হিসেবে কণীনিকাও দারুণ। আর, খরাজ?‌ একটাই শব্দ তাঁর জন্যে—অতুলনীয়। খরাজ এবং শিবপ্রসাদের প্রথম মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা, চিত্রনাট্য ও সংলাপ বাংলা ছবিতে একটি সেরা কমেডি দৃশ্যের মর্যাদা পাবে। চুর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় সুন্দর। ‘‌প্রিন্সিপাল’‌ তনুশ্রীশঙ্কর, শিক্ষিকা অপরাজিতা আঢ্য খুব ভাল। সুজন মুখোপাধ্যায় ও দেবলীনা কুমারকে ভাল লাগে। দেবলীনা দত্ত অল্প অবকাশেই মনে থেকে যাবেন। আর, স্কুলের বাসের ‘‌চাচাজি’ মাসুদ আখতারকে ভোলা যাবে না।
পাঁচ
 তবে, ‘‌হামি’‌র প্রাণভোমরা হল এ-‌ছবির ছোটরা। ভুটু তথা বোধিসত্ত্ব হয়ে ব্রত ব্যানার্জি তো দাপিয়ে বেড়িয়েছে ছবি জুড়ে। তনুরুচি হয়ে তিয়াসা মন ভরিয়ে দিয়েছে আমাদের। আর, যে ছেলেটি প্রায় গুপ্তচরের ভূমিকা নিয়ে দিদিমণিদের খালি নালিশ করে বেড়ায়, তার নাম এখানে অজাতশত্রু!‌ এই চরিত্রে অভিরাজ করণও দারুণ সুন্দর। ঠিক যেন এক পাক্কা অভিনেতা। ‘‌টিপসি’‌ হয়ে একটা দৃশ্যেই নজর কেড়ে নিল অভিরাজ গাঙ্গুলি। আরও অনেক ছোট্ট শিল্পী এ ছবি জুড়ে ছোট, বড় নানান ভূমিকা পালন করেছে। সবাই এত সাবলীল যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এতজন ছোটকে সামলানো তো চাট্টিখানি কথা নয়। দুই পরিচালক সেটা দারুণ পেরেছেন। এবং তাদের দক্ষতার সঙ্গে ক্যামেরায় ধরেছেন এছবির সিনেমাটোগ্রাফার সুপ্রিয় দত্ত।
এছবির গানে কথায়, সুরে জমিয়ে দিয়েছেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। শুরুতেই ভুটু ভাইজানের জন্মদিনের গান তো জমজমাট। আর, চারটে, পাঁচটা, দশটা, বারোটা হামি তো ভোলা যাবে না।
ছয়
 হ্যাঁ, ‘‌হামি’‌। হামি এ-‌ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং হামি যে চুমু নয়, এটাও আমরা জানি। কিন্তু সাত-‌আট বছরের একটা বাচ্চা যদি দিদিমণিকে এসে বলে, এটা ওই হামি নয়, এটা ‘‌জি এফ’‌, ‘‌বি এফ’‌ হামি, তখন পেটের মধ্যে হাত-‌পা ঢুকে যাবার অবস্থা হয়। 
এমন নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে এই ছবির চরিত্রদের এবং দর্শকদের ফেলতে ফেলতে এগিয়েছেন এছবির দুই পরিচালক। ফেলতে-‌ফেলতে এক সময় তুলেও ধরেছেন। ছোটদের জগতের সঙ্গে উঠে এসেছে আমাদের চারপাশ। ছাত্র-‌ছাত্রী, স্কুল এবং অভিভাবক—এই তিনটে বিন্দুকে একটা সমবাহু ত্রিভুজে নিয়ে আসা কঠিন কাজ শুধু নয়, কঠিনতর কাজ। সেই কাজটা দক্ষতার সঙ্গে সহজভাবে দর্শকদের সামনে এনেছেন শিবপ্রসাদ, নন্দিতা রায়। পুরো ছবি জুড়ে তাই স্পষ্ট হয়ে আছে তাঁদের হৃদয়। অনেক বড় দায়িত্বও পালন করলেন তাঁরা। এই অবিশ্বাসের যুগে আমরা তো আজও বিশ্বাসকেই ছুঁয়ে থাকতে চাই। হামি সেই বিশ্বাসের গল্পই শোনাতে চেয়েছে। এবং পেরেছে। তাই আমরাও হামি-‌তে বিশ্বাস রাখছি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top