অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌যত মত, তত পথ’‌।‌ বহু বছর আগে স্কুল–‌কলেজ পাশ না–‌দেওয়া, কামারপুকুর থেকে কলকাতায় এসে এক পূজারি বামুন শহরের লোকজনকে এই কথা শুনিয়েছিলেন। জাত–‌পাত, ধর্ম–‌টর্ম–‌র ইতিহাস, ভূগোল নিয়ে ব্যাপক জ্ঞান–‌সম্পন্ন পণ্ডিতেরাও চমকে গিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের এই কথা শুনে। বলে কী গেঁয়ো লোকটা?‌ তারপর, আর এক কাঠি এগিয়ে তাঁর এক শিষ্য মানুষজনকে শোনালেন, ‘‌জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’‌।
ফলে, তথাকথিত ধর্ম বা ঈশ্বরতত্ত্ব সব জলে গেল!‌ তবুও, আজ, আজও জাতপাত নিয়ে কত মারামারি, কাটাকাটি। ঘরের দেওয়ালে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের ছবি টাঙিয়েও আজও উসকে দেওয়া হচ্ছে হিন্দু, মুসলমানের বিরোধ। বড় দুঃসময় আজ। এবং এই অসময়ে মানুষে, মানুষে বিভাজন মোচনের যে কোনও উদ্যোগই যেন আমাদের কিছুটা স্বস্তি দেয়। মনে হয়, মানুষ যখন কাঁদছে, তখন, মানুষ হয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ আছে এই পৃথিবীতে। তেমন মানুষের গল্প বলতে চেয়েছেন এবং বলতে পেরেছেন পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, তাঁদের ‘‌গোত্র’‌ ছবিতে। বড় জরুরি এই আয়োজন। বড় জরুরি এই উদ্যোগ। বড় জরুরি সহজ, সরলভাবে সত্যি কথাটা বলা। সেটা পেরেছেন নন্দিতা, শিবপ্রসাদ। তাই তাঁদের অভিনন্দন। ভালবাসা। হ্যাঁ, ভালবাসা।
এবং, সত্যি কথা বলতে কী, ‘‌গোত্র’‌ ছবির বিষয়টা এমন গভীর যে এই ছবির শিল্পগত মান–‌সম্মান নিয়ে কচকচি করাটা এই মুহূর্তে একেবারেই জরুরি বলে মনে হচ্ছে না। এই ছবিতেও জন–‌মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করার জন্যে পরিচালক–‌জুটি ‘‌নীল দিগন্তে’‌ অথ‌বা পুরীর সমুদ্রতটে ‘‌রঙ্গবতী’‌র মতো নাচ–‌গানের ব্যবস্থা করেছেন। বিশ্বনাথ বসুকে পাড়ার মঞ্চে এনে গান গাইয়েছেন ‘‌হিটলার মাসিমা’–কে নিয়ে। এগুলো বাদ গেলে এই ছবির কোনও ক্ষতি–‌বৃদ্ধি হত না। কিন্তু একজন পরিচালক তো শুধু বক্তৃতা করার জন্যে ছবি করেন না। একটা ছবির মর্মকথাকে পৌঁছে দিতে চান দর্শকদের কাছে। তার জন্য নানান পরিচালকের নানান রীতি। শিবপ্রসাদ–‌নন্দিতা রায়ের রীতি তাঁদের মতন। কিন্তু জবরদস্ত সমালোচকের জোব্বা গায়ে দিয়ে এই ছবিকে কাটাকুটি করার পরেও, ‘‌গোত্র’–কে স্বাগত না জানিয়ে উপায় নেই কারও। তাঁরা তাঁদের মতো থাকুন। আমরা ‘‌গোত্র’–কে দু’‌হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছি। এসো ‘‌গোত্র’‌, থাকো ‘‌গোত্র’‌, বোসো আমার ঘরে।
‘‌গোবিন্দধাম’‌–‌এ থাকেন মুক্তিদেবী (‌‌অনসূয়া মজুমদার)‌‌। একা। বড় বাড়ি। ছেলে অনির্বাণ (‌‌সাহেব চট্টোপাধ্যায়)‌‌ থাকে বিদেশে। ফলে, এই বাড়িতে শ্যেন দৃষ্টি প্রোমোটার ‘‌বাপিদা’‌র (‌‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌‌। দূরে থাকে, তাই ছেলে অনির্বাণ মায়ের জন্যে কেয়ারটেকারের ব্যবস্থা করে যায়। আর, বার–‌বার মুক্তিদেবী নানা অছিলায় সেই কেয়ারটেকারকে তাড়িয়ে দেন।
নানান কারণ তার। যেমন, সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম শোনেনি বলে এক কেয়ারটেকারকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ছেলের বন্ধু পুলিশ অফিসার (‌‌বাদশা মৈত্র)‌‌ উদ্যোগ নিয়ে এবার তারেক আলিকে (‌‌নাইজেল আকারা)‌‌ ব্যবস্থা করে দেয় মুক্তিদেবীর কেয়ারটেকার হিসেবে। পুজো–‌আচ্চা নিয়ে ব্যাপক খুঁতখুঁতে মুক্তিদেবীর কাছে তারেক–‌কে তারক বলে পরিচয় করিয়ে দেয় ছেলে অনির্বাণ। এবং এই তারেক শুধু মুসলমান–‌ই নয়, ৯ বছর জেল–‌খাটা আসামি। আমাদের মনে পড়ে যায়, এই পরিচালক জুটিরই ‘‌মুক্তধারা’‌ ছবির কথা, যা আসলে নাইজেলের জীবনকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়ে উঠেছিল। তাই, এই চরিত্রে, মুক্তধারা–‌র নাইজেল যে অবধারিত পছন্দ ছিল শিবপ্রসাদ–‌নন্দিতা রায়ের, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর আছে বাড়ির কাজকর্ম করা ঝুমা (‌‌মানালি দে)‌‌, মোটাসোটা পুরোহিত (‌‌অম্বরীশ ভট্টাচার্য)‌‌, মুক্তিদেবীর বন্ধু–‌কাম–‌দাদা (‌‌সন্তু মুখোপাধ্যায়)‌‌। গল্প যেভাবে এগোয়, তাতে অনেক কিছুই আঁচ করা যায় আগে থেকে। যেমন প্রোমোটারের থাবা, কিংবা তারক–‌ঝুমার প্রেম। কিন্তু পরিচালক–‌জুটির মাস্টার স্ট্রোক হল তারেককে দিয়ে রাধাকৃষ্ণর পুজো করানো। এবং সেটা এমন এক পরিস্থিতিতে, যা না করে উপায় ছিল না তারেকের। কারণ, মুক্তিদেবী ততক্ষণে তো তারেকের হৃদয়ে মায়ের আসনে বসে পড়েছেন। আর, মায়ের জন্যে ছেলে তো নিজের চোখও উপড়ে দিতে পারে। রাধাকৃষ্ণর পুজো করতে পারবে না?‌ নন্দিতা রায়–‌শিবপ্রসাদের ছবির ন্যারেটিভ খুব সহজ পথে এগিয়েছে ‘‌গোত্র’‌য়। কিন্তু তারক যে তারেক, হিন্দু আচারনিষ্ঠ বিধবার বাড়িতে বসে যে সে নমাজও পড়ে, একথা জানতে পারলে মুক্তিদেবী কি রেহাই দেবেন তারেককে?‌ তারপরেও যদি জানেন, ৯ বছর জেল–‌খাটা আসামি সে, তা হলে?‌ প্রশ্ন তুলেছেন দুই পরিচালক। উত্তর দিয়েছেন মুক্তিদেবী।
‌‌‌‌এবং এ’‌ছবির প্রাণ হলেন মুক্তিদেবী তথা অনসূয়া মজুমদার। অসাধারণ তাঁর অভিনয়। অভিনয়?‌ অভিনয় বললেন একটু খাটো করা হবে কি অনসূয়া মজুমদারকে?‌ আসলে, তিনিই হয়ে উঠেছেন মুক্তিদেবী। আর, নাইজেল আকারাও সত্যি-‌সত্যিই তারেক আলি। তাঁর চোখের দৃষ্টি, তাঁর বডি-‌ল্যাঙ্গুয়েজ, তাঁর কথা বলা এবং কথা না-‌বলা, সবটাই বড় সত্যি মনে হয়। ভাল লাগে মানালিকে। ছটফটে, স্বতস্ফূর্ত, শুধু একটু লাউড। সাহেব চট্টোপাধ্যায়, বাদশা মৈত্র, সন্তু মুখোপাধ্যায় স্বাভাবিক অভিনয়ের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। অম্বরীশ কমেডি-‌রিলিফ। একটা গানের দৃশ্যে যেমন বিশ্বনাথ। প্রোমোটার বাপিদার চরিত্রে খরাজ মুখোপাধ্যায় জমিয়ে দিয়েছেন, চরিত্রের মাপ বজায় রেখে।
সুপ্রিয় দত্তর ক্যামেরা বাহবা-‌যোগ্য। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত প্রশংসনীয়। অনিন্দ্যর কথায়, সুরে, অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে মন ছুঁয়ে যায় তাঁর ‘‌মা’‌।
মা। আসলে এই ছবি এক মায়ের আর ছেলের গল্প। যে মায়ের কাছে কে হিন্দু, কে মুসলমান, তার বিচার থাকে না। যে মা আশ্রয় দেন। যে মা ছুঁয়ে দিলে হৃদয় আকাশ হয়ে যায়। যে মায়ের কাছে গোত্র বড় অর্থাহীন। সেই মা-‌কে প্রণাম।‌

জনপ্রিয়

Back To Top