সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • গুড নিউজ। পরিচালনা:‌ রাজ মেহতা। অভিনয়ে:‌ অক্ষয়কুমার, করিনা কাপুর, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, কিয়ারা আদবানি, আদিল হোসেন, টিস্‌কা চোপড়া।
‘‌কমেডি অফ এররস্‌’‌। সেই ‘‌এর দান, ওর ঘরে’‌র গল্প। বা, ‘‌কথাসরিৎসাগর’‌–‌এর সেই বিখ্যাত দুই নিহতের ধড় আর মুন্ডু, পুনরুজ্জীবনের সময় বদলাবদলি হয়ে যাওয়ার গল্প। যেখানে তারপর ‘‌আইডেনটিটি’‌ নিয়ে সমস্যা।
পরিচালক রাজ মেহতাও তাঁর ‘‌গুড নিউজ’‌ বানাতে গিয়ে এমন ঘরেই যেন দান ফেলেছেন। তাঁর ছকটা শুধু একটু বড়। আর সমসাময়িক।
এক যোগ এক, দু‌জনের মধ্যে এই গোলমালটা না ঘটিয়ে রাজ তাঁর চিত্রনাট্যে দুই যোগ দুই ‘‌ইক্যুয়াল টু’ ‌চারজনের মধ্যে ‘‌হেরাফেরি’‌টি ঘটিয়ে দিয়েছেন। আগতপ্রায় সন্তানকে নিয়ে। দু’‌জোড়া দম্পতির মধ্যে। ছবির ভাষা ধার করে বলতে হয়, এক জোড়া ‘‌কাপল’‌,‌ আর এক জোড়া ‘‌জোড়ি’‌র মধ্যে। বুঝতেই পারছেন, এখানে সেই ‘‌ইন্ডিয়া মিটস্‌ ভারত’‌, এক জোড়া দম্পতি প্রবল সাহেবি–‌আদবকায়দার। আর অন্য জোড়া ততোধিক প্রবল দেশি। এই যে চাল–‌চলন, আদবকেতা, মনমর্জি— সব কিছুতে আলাদারকম দু‌টো দম্পতিকে মুখোমুখি আনা—‌ এটার ভেতরেই কিন্তু লুকিয়ে আছে ওই ছবির কমেডির সবচেয়ে বড় তাসটা। আর হয়তো ছবির সবচেয়ে বড় ‘‌গুড নিউজ’‌ টাও। সেটা কিন্তু নিছক কমেডি নয়।
ছবির প্রথম ভাগ জুড়ে অধিকাংশই অবশ্য দীপ্তি (‌‌করিনা কাপুর)‌‌ ও বরুণের (‌‌অক্ষয়কুমার)‌‌ জুটির কার্যকলাপ। অন্য জুটি জানি (‌‌দিলজিৎ দোসাঞ্জ, পাঞ্জাবি ছবির জনপ্রিয় নায়ক)‌‌ আর মণি ওরফে মণিকা (‌‌কিয়ারা আদবানি, ‘‌কবীর সিং’‌ হিট হওয়ার পরে পরপর ভালই কাজ পাচ্ছেন)‌‌ ‘‌এন্ট্রি’‌ নেয় গল্পের মাঝখান থেকে। দুই জুটির এই মিলনে বড় ভূমিকা নেয় ডঃ যোশি (‌আদিল হুসেন)‌ ও ডঃ যোশি (‌‌টিস্‌কা চোপড়া)‌‌—‌ আরেক ডাক্তার দম্পতি, যাদের ‘‌ফার্টিলাইজেশন এজেন্সি’‌টির খুব সুনাম নিঃসন্তান দম্পতির কোলে সন্তান এনে দেওয়ার ব্যাপারে। বলাই বাহুল্য, ‘‌আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশান’‌ বা কৃত্রিম পদ্ধতির সাহায্যে।
দুই দম্পতি জুটির মধ্যে যতই অমিল থাকুক, দু‌টো ব্যাপারে তাদের বড়ই মিল, ১.‌ দুই জুড়িই নিঃসন্তান এবং একটি সন্তান পাওয়ার জন্য তারা মরিয়া। ২.‌ দু‌জনেরই পদবি বাত্রা। পাঞ্জাবি পরিবার থেকে এসেছে তারা দু’‌পক্ষই। এদের দেখা হওয়ার ‘‌ভূমধ্যসাগর’‌ হয়ে ওঠে ড.‌ যোশির ক্লিনিকটি। দুই জোড়া দম্পতিই ‘‌আইভিএফ’‌–‌এর আশ্রয় নেয় সন্তান পাওয়ার জন্য। একই দিনে। আর সেখানেই বাধে গোলমাল। একের গল্পে অন্যজন ঢুকে যায়। বরুণের শুক্রাণু চলে যায় ভুলবশত‌ মণিকার গর্ভে। আর জানির শুক্রাণু চলে যায় একইভাবে দীপ্তির গর্ভে। ফলে এই সম্ভাবনা তৈরি হয় যে বরুণের পিতৃপরিচয়ে বড় হবে জানির সন্তান। আর জানির পিতৃপরিচয়ে বড় হবে বরুণের সন্তান। ভারতীয় পরিবার–‌ব্যবস্থার সাবেক যে পিতৃতান্ত্রিক পরিচিতি–‌নির্ভরতা তার ভেতরে এভাবে যেন এক বিপর্যয় ঘটে যেতে চলে। রাজ নেহতা দেখালেন, পরিবার বা পিতৃপরিচয় নয়, মানুষের জন্মের ক্ষেত্রে বড় পরিচয় মানবিক সংযোগ। তা পরিবার না পরিবারের বাইরে থেকে এসেছে, তা বড় নয়। দমফাটা হাসি চলতে চলতে মাঝেমাঝেই তাই রাজ (‌‌চিত্রনাট্য ও কাহিনি জ্যোতি কাপুরের)‌‌ অনায়াসে চলে গেছেন ভারী আবেগবহুল দৃশ্যে। আর সেখানেও দর্শকের চোখের কোল ভিজে উঠেছে। হাসি–‌কান্নার ভেতরে এই যে আলপথটা খুঁজে নিতে পেরেছে এই ছবি, এখানেই এই ছবির জিত। আর ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে যখন বরুণের বাবা–‌মা, যাঁরা এতসব গোলমালের কিছুই জানেন না, হাসপাতালে এসে সদ্যোজাত নাতির মুখে খুঁজে পাচ্ছেন নিজের ছেলের আদল, আর সেই সময় বড় ব্যঞ্জনাময়ভাবে দীপ্তির চোখ বরুণকে পেরিয়ে চলে যাচ্ছে দরজায় দাঁড়ানো জানি আর মণির দিকে, আর সেই সময়ই নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে বরুণ তুলে দিচ্ছে জানির বাড়ানো হাতেও— ‌ সে দৃশ্য এক অন্য মহৎ আবেগে আর বার্তায় তুলে নিয়ে যায় এই ছবিকে। মনে হয় মহৎ কমেডির এই তো পাওনা–‌শেষে এক আলো–‌ঝলমলে বার্তা পাওয়া।
অক্ষয় কমেডির রাজা। গোটা ছবিতে তিনিই দর্শকদের মাতিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। ইদানীং অক্ষয়কে বড়ই ভোঁতা সব কমেডি–‌ছবিতে দেখা যায়। এই ছবি সে দুঃখ দূর করবে। ফিরে–‌আসা করিনা বোঝালেন ধারে ও ভারে কমেডি‌র পিচে তিনি এখনও একইরকম।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top