অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: সারা পৃথিবী তাঁকে হারিয়ে দেওয়ার জন্যে তৈরি। এমনকী তাঁর স্ত্রীও, শেষ সম্বলটুকু তাঁর হাতে তুলে দেবার পরেও, প্রার্থনা করেন, যেন তার বর হেরে যায়। কারণ হেরে গেলে ওই লোকটা তার ‘‌পাগলামি’‌ বন্ধ করে ফুটপাথ থেকে ঘরে এসে বাস করবে। সর্বশান্ত হয়ে যাওয়া সংসারটার জ্বালা অন্তত কিছুটা জুড়োবে। কিন্তু পৃথিবী, সূর্য, বউ, পার্টি, প্রশাসন কেউ-‌ই কি পারে এমন একটা লোকের জেদকে থামিয়ে দিতে। সে তো বিশ্ববাসীকে শোনাতে চায়, বিশ্বাস করাতে চায়, নিজের মতবাদ ও ‘‌অঙ্ক’‌ দিয়ে প্রমাণ করতে চায়—সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।
এই জেদি মানুষটার আসল নাম কার্তিকচন্দ্র পাল। কিন্তু তিনি কে সি পাল নামেই পরিচিত শহরের হাজার হাজার মানুষের কাছে। কলকাতা শহরের এমন কোনও দেওয়াল বা ল্যাম্পপোস্টের নিচের বেদি পাওয়া দুষ্কর ছিল একসময়, যেখানে কে সি পাল নিজে হাতে লিখে তাঁর তত্ত্ব প্রচার করেননি। বইমেলার ভিড়ে তিনি বিলি করেছেন তাঁর তত্ত্ব, তাঁর আবিষ্কার। নিজের পয়সায় ছাপানো পুস্তিকা বিক্রি করেছেন অল্পমূল্যে। অনেকে কিনেছেন, অনেকে কেনেননি। কিন্তু হাসাহাসি করেছেন সকলেই। তবুও দমানো যায়নি মানুষটাকে।
একসময় বাড়িঘর ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। রাসবিহারীর মোড়ের কাছে ভাঙাচোরা তাঁবু তৈরি করে বাস করেছেন। চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। হেনস্থা করেছে মানুষ। পাগল বলেছে লোকে। তবু, তবুও নিজের বিশ্বাস আর জেদ থেকে তাঁকে কেউ নড়াতে পারেনি।
অবাস্তব এক ‘‌বিজ্ঞানে’‌র প্রচার করা এই জেদি, ‘‌পাগল’‌ লোকটাকে একটা ছবির নায়ক করেছেন পরিচালক অরিজিৎ বিশ্বাস, যিনি ‘‌অন্ধাধুন’‌-‌এর মতো সুপারহিট হিন্দি ছবির অন্যতম চিত্রনাট্যকার। সাহস আছে অরিজিতের, ‘‌সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে’‌-‌র মতো ছবি দর্শকদের উপহার দেওয়ার জন্য।
কে সি পাল এই ছবিতে হয়েছেন টি সি পাল অর্থাৎ তারক চন্দ্র পাল (‌মেঘনাদ ভট্টাচার্য)‌। পাশাপাশি সমান গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত আরও দুটি চরিত্র—চিরন্তন চট্টোপাধ্যায় (‌চিরঞ্জিত চক্রবর্তী)‌ ও সঞ্জীব (অঞ্জন দত্ত)‌।
একদা বামপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী, পার্টিকর্মী চিরন্তন গ্রুপ থিয়েটার করতেন। এখন তিনি বাংলা ছবির সুপারস্টার। আর, তারই বন্ধু সঞ্জীব, একদা যিনি আর্ট ফিল্ম করতেন, এখন পেট চালানোর দায়ে ’‌জামাইবাবু জিন্দাবাদ’‌-‌এর স্ক্রিপ্ট নিয়ে হাজির পুরনো বন্ধু চিরন্তনের কাছে।
একদিন, ফিল্ম পার্টিতে যথেচ্ছ মদ্যপানের পর, টলটলায়মান চিরন্তন নিজের গাড়ির খোঁজ না করে, রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। এবং মাতাল চিরন্তনের পাতাল প্রবেশ ঘটে। সেই পাতাল আসলে টি সি পালের ফুটপাথের রাজপ্রাসাদ, যা নিজের সূর্য-‌পৃথিবীর তত্ত্ব প্রচারের কারণে টি সি পালের কপালে জুটেছে। টি সি পাল তো গৃহচ্যুত। অথচ, লড়াই তো তিনি ছাড়তে পারবেন না। পৃথিবীর মানুষ ও বিজ্ঞানীদের কাছে তিনি প্রমাণ করেই ছাড়বেন সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।
চিরন্তন চমকে যান টি সি পালের জেদ দেখে। চমকে যান তাঁর বন্ধু সঞ্জীবও। তাঁরা পাশে দাঁড়ান টি সি পালের। কিন্তু দাদারও দাদা আছে। ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
সমাজের সঙ্গে রাজনীতি, অন্ধ বিশ্বাসের সঙ্গে বিজ্ঞান, জেদের সঙ্গে ভেঙেপড়া, দাম্পত্যের সঙ্গে প্রেম, শরীরের সঙ্গে মন—অনেক কিছুকে এই ছবিতে মিশিয়েছেন পরিচালক, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। সেই মেশানোর কাছে কোথাও মন্থর হয়নি ছবির গতি। থোড়-‌বড়ি-‌খাড়া ফর্মুলাকে অগ্রাহ্য করে একটা আধুনিক, ভাল ছবি তৈরির চেষ্টা করেছেন অরিজিৎ। বাংলা ছবির দর্শকদের প্রাপ্তমনস্কের সম্মান দিয়েছেন তিনি। তাঁকে কুর্নিশ।
এই ছবিতে ত্রিভূজের মত হাজির চিরন্তন, সঞ্জীব আর টি সি পাল। আর, অভিনয়ে চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী (‌চিরন্তন)‌ এবং অঞ্জন দত্ত (‌সঞ্জীব)‌ আর একবার মুগ্ধ করলেন আমাদের। চিরঞ্জিতের নায়কোচিত দাপট এবং সহানুভূতি, কাঠিন্য, ক্রুরতার অনবদ্য স্বাভাবিক দাপট প্রশংসনীয়। দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙনে ও জোড়া লাগার অদ্ভুত খেলায় অঞ্জন দত্ত যে মারাত্মক হাসিটি উপহার দেন, তা অমূল্য। আর, সিনেমার পর্দায় এমন একটা চরিত্রে অভিনয় করে স্মরনীয় হয়ে থাকবেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য। বাংলা মঞ্চ তার দাপট দেখেছে। সিনেমার পর্দায় তিনি যে অভিনয়ে কতটা ’‌সিনেম্যাটিক’‌—সেটা প্রমাণ করে দিলেন টি সি পাল মেঘনাদ ভট্টাচার্য।
টি সি পালের স্ত্রীর যন্ত্রণাকে স্বাভাবিক ও স্পষ্ট করে তুলেছেন শ্রীলা মজুমদার। ভাল লাগে পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রভাত দাস এবং পল্লবী চট্টোপাধ্যায়কে। একটি দৃশ্যে কবীর সুমনের জবাব নেই।
আবহ সঙ্গীতে প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায় মুগ্ধ করেছেন। শীর্ষ রায়ের ক্যামেরা প্রশংসনীয়। অরিজিৎ বিশ্বাস ও পারমিতা মুন্সীর চিত্রনাট্য এছবির সম্পদ। এমন একটা ছবি প্রযোজনার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য পবন কানোরিয়ার।
নিজের পথে থেকে ছবি করায় বিশ্বাসী অরিজিৎ বিশ্বাস। বাণিজ্যের নগদ লেনদেনের জগতে তাঁর এই বিশ্বাস অটুট থাকুক। কে সি পালের যুক্তিহীন বিজ্ঞান নয়, কে সি পালের জেদ ও বিশ্বাসই তাঁকে এই ছবি তৈরিতে বাধ্য করেছে। বজায় থাকুক এই জেদ। এই বিশ্বাস। এছবির ধ্রুবপদ তো জেদ ও বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত।‌

জনপ্রিয়

Back To Top