দ্বৈপায়ন দেব: ‘‌সিক্যুয়েল’‌ নয়। ‘‌প্রিক্যুয়েল’‌।
মানে সিরিজের পরের পর্বের ছবিতে কার্যত না–‌দেখা আগের পর্বের গল্প। নায়কের জীবনের সময়টাকে পিছিয়ে দেওয়া।
হলিউডে এমনটা আকছারই দেখে দেখে চোখ পচে গেছে। স্পাইডারম্যান–‌সুপারম্যান–‌ব্যাটম্যানদের না–‌দেখা সব অতীত এসেছে অনেকবারই সিরিজের মাঝখানে। সেখানে কখনও ছেলেবেলার গল্প। কখনও আবার সুপার হিরো হয়ে ওঠার শুরুর বৃত্তান্ত।
এবার বলিউডেও সেই কৌশল নিলেন সলমন খান। তাঁর বিখ্যাত ‘‌দাবাং’‌ সিরিজের তিন নম্বর ছবিতে। এবার ছবিতে এসেছে চুলবুল ‘‌রবিনহুড’‌ পান্ডের প্রথম যৌবনের কথা। যখন সে বেকার, সৎ বাবার বাড়িতে আশ্রিত আর ঈষৎ ভোলেভালা, গাঁইয়া। সেখান থেকে এক গ্রাম্যবালার সঙ্গে প্রেম, বিয়ের আয়োজন, ভিলেন (‌সুদীপ)–‌এর  তাতে কোপদৃষ্টি ও হবু পাত্রীকে (সাঁই মঞ্জরেকার‌)‌ ‌খুন করা, মিথ্যে বদনামে সেই খুনের দায় মাথায় নিয়ে চুলবুলের জেলযাত্রা এবং সেখানে জেল ভেঙে পালানো অপরাধীদের চার ঘুসিতে ‘‌ফ্ল্যাট’‌ করে, সাজার মেয়াদ কম ক‌রে রাষ্ট্রীয় সুপারিশে পুলিশ বনে যাওয়া!‌ এই হল ‘‌কোথা–‌হইতে–‌কী–‌হইয়া–‌গেল’‌ তার বৃত্তান্ত। অথবা চুলবুল–‌নির্মাণ পর্ব।
এবারের পর্ব থেকে এরই মাঝে পাওয়া কয়েকটি প্রাসঙ্গিক তথ্য। ১.‌ চুলবুলের আসল নাম ‘‌চুলবুল’‌ নয়। তার আসল নাম ধকড়চাঁদ পান্ডে। চুলবুল নামটা তাকে তার প্রথম প্রেমিকা খুশি দিয়েছিল। ২.‌ যে সব পায়রা–‌ওড়ানো সংলাপগুলো বলতে–‌বলতে চুলবুল গুন্ডাদলকে ঠ্যাঙাত, সেই সব বিখ্যাত (‌বা কুখ্যাত)‌ সংলাপগুলি নায়কের মৌলিক নয়। অতীতে নানা গুন্ডা–‌মস্তানদের মুখ থেকে তা তার সংগ্রহ করা ও মনে রেখে পরবর্তীতে জায়গামতো কাজে লাগানো। ৩.‌ তার স্ত্রী ওরফে ‘‌দাবাং’‌ সিরিজের মূল নায়িকা রাজ্জো (‌সোনাক্ষী সিনহা)‌ নাকি আসলে নিহত খুশিরই বোন। মানে খুশির সঙ্গে বিয়ে হলে রাজ্জো হত চুলবুলের শালি। আবার রাজ্জোর মা মারা যায় চুলবুলেরই সামনে, বোনঝিকে বাঁচাতে এসে। তার মানে যখন এই পর্বে সেই পুরনো–‌ভিলেন বধ করে নায়ক, কার্যত তখন নিজের শাশুড়ি বধেরই বদলা নেয় চুলবুল। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে এমন গূঢ় তথ্য দর্শককুল তো এতদিন জানতই না, জানত না এমনকী রাজ্জো বা তার বাবাও (‌মহেশ মঞ্জরেকার)‌। কেন জানত না?‌ চুলবুল–‌এর এক লাইনের উত্তর, ‘‌সুখ ভাগ করে লাভ আছে, দুঃখ ভাগ করে কী লাভ!‌’‌
আসলে এবারের চিত্রনাট্যে গল্প দেড় লাইনের। এক নারী–‌লোলুপ ভিলেন দীর্ঘদিন ধরে জ্বালাচ্ছে চুলবুলকে। ঘরে–‌বাইরে সর্বত্র। সেই বলিউড ছবির পুরনো ফর্মুলা নায়কের পরিবারের শত্রুই আসলে দেশের শত্রুও। ফলে তাকে মারলে ঘর ও বাহির সবই পরিষ্কার। সেই মতোই চেনা পথে গল্প এগিয়েছে।
এখন এই যে দেড় লাইন সংবলিত, অতি–‌চেনা ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–‌এর গল্প, এতে আকর্ষণ জিইয়ে রাখতে একমাত্র সম্বল হয়েছে কমেডি। বা সেটাকে ‘‌ভাঁড়ামো’‌ বলাই সঙ্গত। বেশ মোটা দাগের আর অশালীন। বোকা–‌বোকা মুখে ক্রমাগত বোকা–‌বোকা সংলাপই বলে গেছেন সলমন। আসলে ‘‌টিউবলাইট’‌ বা ‘‌ভারত’‌–‌এ এমন একটা ইমেজ দর্শক খেয়ে যাওয়ায় ‘‌দাবাং–‌৩’‌–‌এও সলমন আনতে চেয়েছেন তার ছোঁয়া। কিন্তু দুঃখের কথা মিলমিশ খায়নি ব্যাপারটা। গত দুটো পর্বের মারকুটে অথচ রসিকতা–‌প্রবণ পুলিশ অফিসারকে খুবই ভ্যাতভেতে লেগেছে এ ‌ছবিতে। রসিকতা আর ভাঁড়ামো একই জিনিস নয় যে। সাঁই মঞ্জরেকার তো বটেই, সোনাক্ষী সিনহাও সম্ভবত চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে বুঝতে পারেননি এ ছবিতে তাঁর ভূমিকা কী?!‌‌ দু’‌তিনটি দৃশ্যে চুলবুলের মায়ের চরিত্রে ডিম্পল কাপাডিয়ার উপস্থিতি আছে। তবে তা প্রতিভার অপচয়!‌ ছবির হাফ ডজন গানও তথৈবচ। মনে দাগ কাটে না। চুলবুলের সৎ ভাই মক্ষীর চরিত্রটা আকর্ষণীয় হতে পারত, কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে সলমন–‌ভ্রাতা আরবাজ খান এ ক্ষেত্রে একটি পরিপূর্ণ ‘‌মিস্‌ কাস্টিং’‌। একমাত্র দক্ষিণী অভিনেতা সুদীপ ভিলেন হিসাবে দারুণ সংযোজন।
আশা করা যেতে পারে ‘‌দাবাং–‌৩’‌–‌এর পরে এই সিরিজের আর কোনও ছবি হবে না। চিত্রনাট্য ফুরাইয়াছে।  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top