ন সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ • পরিচালনা:‌ সায়ন্তন ঘোষাল • অভিনয়ে:‌ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, গার্গী রায়চৌধুরি, অঞ্জন দত্ত, সুপ্রভাত দাস, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়।
‘‌মগ্ন মৈনাক’‌। ১৯৬৩ সালে লেখা শরদিন্দু-‌কাহিনী এবারের ব্যোমকেশ-‌চিত্রনাট্যের অবলম্বন। চিত্রনাট্য লিখেছেন অঞ্জন দত্ত। যিনি বছর দশেক আগে বাংলায় এই নতুন ‘‌ব্যোমকেশ-‌ফ্রেঞ্চাইজি’‌টি শুরু করেছিলেন। জনশ্রুতি তিনি বেশ কয়েকটি ব্যোমকেশ করে ক্লান্ত। অতএব এবার ব্যাটন (‌বা চিত্রনাট্য)‌ তুলে দিয়েছেন তরুণ সায়ন্তন ঘোষালের হাতে। যে সায়ন্তন ইতিপূর্বে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘‌‌‌যখের ধন’কে পর্দায় এনে অ্যাডভেঞ্চার ছবির ধারায় নিজের কৃতিত্ব প্রমাণ করেছেন।
কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার ছবি আর রহস্য ছবি তো আলাদা। মেজাজে, ফর্মে। ফলে আশঙ্কাটা ছিলই যে, অন্যত্র সফল সায়ন্তন কি ‘‌হু ডান ইট’‌ করতে গিয়ে সফল হবেন?‌ উত্তরটা এক কথায় দিতে হলে, বলতেই হবে, ‘‌হয়েছেন’‌। ছোট ছোট সিকোয়ন্সে চরিত্রদের টানাপোড়েন আর পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতাগুলো খুব চমৎকারভাবে ধরেছেন সায়ন্তন। এক দল ‘‌ভাল অভিনেতা-‌অভিনেত্রী’‌র অভিনয় তাঁর খুব কাজে লেগেছে এইসব সিকোয়ন্সকে বাঁধতে। এবং মনে রাখতে হবে অঞ্জন দত্তর সৌজন্যে একটা পূর্ণ নাটকীয়-‌মাত্রার চিত্রনাট্য হাতে পেয়েছিলেন সায়ন্তন। সেটা কাজে লাগিয়েছেন। উপরন্তু গোটা ছবি জুড়ে দৃশ্যগতভাবে যে বিবর্ণ ‘‌টেক্সচার’‌টা তিনি ব্যবহার করে গেছেন ছবিতে, তা কিন্তু এই সিনেমার মেজাজে একইসঙ্গে একটা ধ্রুপদী মৌতাত এবং একটা আলো-‌অন্ধকারের কালকে একইসঙ্গে ধরে ফেলেছে। এই কাহিনী পরিচালনার গুণে কখনই দমচাপা লাগেনি। উত্তেজনার হাওয়া সবসময়েই খেলে গেছে ছবি জুড়ে। বেশ বড় আর ছড়ানো কাহিনী। তা সত্ত্বেও যে ছবিকে পৌনে দু’‌ঘণ্টার সংযত সময়-‌দৈর্ঘ্যে ধরে রাখা গেছে, তা সম্পাদক শুভজিৎ সিংহের কৃতিত্ব।
এই ছবি নিয়ে আর একটা কৌতুহল, টেনশন, আশঙ্কা ইত্যাদি ছিল। এই প্রথম ব্যোমকেশ সাজলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। সাম্প্রতিক কালে টালিগঞ্জের চার-‌চারজন  নায়ক ব্যোমকেশ সেজেছেন নানা মাধ্যমে। আবির চট্টোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, গৌরব চক্রবর্তী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এছাড়াও আরও তিনজন একটা করে ছবিতে ব্যোমকেশ হয়েছেন। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, সুজয় ঘোষ, শুভ্রজিৎ (‌মঞ্চেও ব্যোমকেশ সেজেছেন)‌‌। সেদিক থেকে সাম্প্রতিককালে পরমব্রত অষ্টম ব্যোমকেশ। তিনি জানতেন অন্যদের সঙ্গে তুলনাটা আসবেই। আর সেজন্য ব্যোমকেশ চরিত্রকে তিনি খানিকটা গড়ে নিয়েছেন নিজের পথে। এখানে ব্যোমকেশ গভীরভাবে চিন্তামগ্ন একটু কম। বরং তার চরিত্রের রসিকতা প্রবণ দিকটাকেই বড় করে তুলে এনেছেন পরমব্রত তাঁর চরিত্রায়নে। যিশু সেনগুপ্তর চরিত্রায়নে ‘‌চলে এসো অজিত’‌ বলাটাকে বিশেষ একটি ‘‌গেট ডায়লগ’‌ বা প্রস্থান-‌সংলাপ করে তুমুল জনপ্রিয় করেছিলেন অঞ্জন। এবার পরমব্রতর মুখে সেই সংলাপটিকে ঈষৎ সরস করে তিনি করেছেন, ‘‌তাহলে যাওয়া যাক অজিত’‌। এটাও বোধহয় জনপ্রিয় হবে সংলাপ হিসেবে। তবে ‘‌‌থিংকার’‌ হিসেবে একটি দৃশ্যে পরমব্রত চমৎকার অভিনয় করেছেন। ক্লাবে বসে অজিত যখন অন্যতম সন্দেহভাজন উদয়কে জেরা করছে, সে সময় ব্যোমকেশের মুখে নীরবে ধীরে ধীরে অভিব্যক্তির বদলটা অসাধারণ। বরং অজিত হিসেবে রুদ্রনীল যেন আশা পূরণ করতে পারলেন না। তাঁর অভিনয়ে লেখকের সেই ব্যক্তিত্ব কই?‌ একটি দৃশ্যে অজিতকে মদ্যপান করিয়ে হাসির খোরাক করে তোলাটাও পীড়াদায়ক।
 এই ছবিতে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ যুবক। যদিও সন-‌তারিখ অনুযায়ী ‘‌মগ্ন মৈনাক’‌ পরিণত ব্যোমকেশের কীর্তি। যে সময়ে ব্যোমকেশ অভিনিবেশ করেছিল অপরাধ বিজ্ঞানের লাগোয়া যৌনতা সংক্রান্ত নানা কেসে। শরদিন্দুর কলমে প্রথম লাইনটি ছিল এইরকম—‘‌স্বাধীনতা লাভের পর পনেরো বছর অতীত হইয়াছে।’‌ অর্থাৎ এই ঘটনার কাল ১৯৬২। অঞ্জনের চিত্রনাট্য তাকে তুলে এনেছে এক দশক পরে ১৯৭১-‌এ। যখন ওপারে মুক্তি যুদ্ধ। এপারে নকশাল আন্দোলন। এবং অঞ্জনের চিত্রনাট্য অনুযায়ী রাজ্যে বামপন্থীদের যুক্তফ্রন্ট সরকার!‌ বাস্তবে তখন অবশ্য রাজ্যে জারি ছিল রাষ্ট্রপতি শাসন। শরদিন্দুবাবুর মূল কাহিনীতে রহস্য ঘনীভূত হয় ব্যবসায়ী সন্তোষবাবুর (‌সুমন্ত মুখোপাধ্যায়)‌ বাড়িতে এক আশ্রিতার ছাদ থেকে পড়ে ঘটে যাওয়া মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। মূল গল্পে সন্তোষবাবু ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদও। তিনি ও তাঁর স্ত্রী জড়িত ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের চরমপন্থী ধারার সঙ্গে। ছবিতে তাদের করা হয়েছে এস ইউ সি আই কর্মী!‌ এবং ওই দলের প্রতিনিধি হিসেবেই সন্তোষবাবুকে মন্ত্রী করা হয়েছে। পরবর্তীতে এহেন একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটি অনৈতিক বিদেশি যোগ যে স্থাপিত হবে, তা তো অঞ্জন জানতেন। অথচ কীভাবে তিনি যুক্তফ্রন্টের একজন মন্ত্রীর ওপরে এমন কলঙ্কলেপন করলেন, কোন ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে, এই প্রশ্ন উঠবেই।
শরদিন্দুর গল্পের টানে রহস্য উতরেছে। পরমব্রতর অভিনয়ের কথা আগেই বলা হয়েছে। চমৎকার অভিনয় করেছেন সুমন্ত মুখোপাধ্যায়, গার্গী রায়চৌধুরি ও সুপ্রভাত দাস। জটিল চরিত্রায়ণ গার্গী অবলীলায় করেছেন। অঞ্জন নিজেও একটি চরিত্র করেছেন। কিন্তু সে চরিত্র ঘিরে সৃষ্ট রহস্য শেষ অবধি অধরাই থেকে গেছে। যদিও অভিনয়ে অঞ্জন খুঁত রাখেননি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top