বৈচিত্র‌্যই যে তাঁর সবচেয়ে বড় জোর, প্রমাণ করলেন সুজিত সরকার। এবার তিনি এক কবিতার মতো বিষণ্ণ সুন্দর সিনেমা গাঁথলেন।

সম্রাট মুখোপাধ্যায়
• অক্টোবর, পরিচালনা:‌ সুজিত সরকার, অভিনয়ে:‌ বরুণ ধাওয়ান, বনিতা সাঁধু, গীতাঞ্জলি রাও।
একটি ঋতু। একটি স্মৃতি। কয়েকটি না বলা, কিছু না হওয়া কথা।
এই সব নিয়ে কিছু শ্বাস, কিছু দীর্ঘশ্বাসের ছবি ‘‌অক্টোবর’‌। যা সিনেমা হিসেবে বেশ অভিজাত। বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
‘‌অক্টোবর’‌–‌এর সিংহ ভাগ জুড়ে আছে এক দুর্ঘটনাজনিত অসুস্থতা আর অনিবার্যভাবে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসা মৃত্যু। এ যেন এক ‘‌ক্রনিকাল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড’‌। এক আগাম মৃত্যুর ধারাবিবরণী। সুজিত সরকারের এই ছবি তাই আগাগোড়াই বিষণ্ণতার ভাষায় লেখা।
এর আগেও অসুস্থতা নিয়ে ছবি করেছেন সুজিত। ‘‌পিকু’‌। কিন্তু সে ছবির সিরিও–‌কমিক অনেক জায়গাতেই চরিত্রদের আর দর্শকদের শ্বাস ফেলতে জায়গা দিয়েছিল। এই ছবি এতটাই ‘‌মর্বিড’‌, এতটাই দমবন্ধ করা, যে দর্শকদেরও যেন এক সময় মনে হবে তাঁরা হাসপাতালের ওষুধ, ডেটল আর অসুস্থতার ঘ্রাণ পাচ্ছেন।
ঘণ্টা দুয়েকের এই ছবিতে গল্পের ভাগ খুবই কম। না–‌গল্পই বেশি। গোটা ‘‌প্লট’‌–‌এর একমাত্র বড় ঘটনাটি ঘটে যায় ছবির শুরুতেই। যেখানে শিউলি (‌বনিতা সাঁধু)‌ নামের এক হোটেল কর্মী ডিউটি শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে ওই হোটেলের ছাদেই পার্টি করতে–‌করতে পড়ে যায় তিনতলার ওপর থেকে। এর জন্য দায়ী তার ঈষৎ তরল অবস্থা, নাকি রেলিংয়ে  জমে থাকা কুয়াশার জল, তা পরিষ্কার হয় না। তবে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে দেখা যায় সে গভীর ‘‌কোমা’‌য় তলিয়ে গেছে।
এ গল্পের আরেক প্রধান চরিত্র দানেশ বা ড্যান (‌বরুণ ধাওয়ান)‌। সে–‌ও ওই হোটেলেরই কর্মী। ড্যান আর শিউলি দু’‌জনেই ওই হোটেলে ‘‌প্রবেশনারি’‌ পর্বে রয়েছে। দু’‌জনের মধ্যে তফাতটা হল শিউলি যেখানে তার কাজকর্মে চূড়ান্ত সফল, ড্যান সেখানে একেবারেই অপদার্থ বলে চিহ্নিত। একটা কাজও সে গুছিয়ে করতে পারে না। তার কাজ যে কোনও মুহূর্তেই চলে যেতে পারে— এমন একটা অদৃশ্য খাঁড়া নিজের ঘাড়ে ঝুলিয়েই ড্যান সব সময় চলে।
এমন নয় গল্পের চেনা ফর্মুলা অনুযায়ী ড্যানকে কাজে সাহায্য করে শিউলি। বরং অন্যদের মতোই ড্যান সম্পর্কে তারও কিছুটা উপেক্ষার ভাবই রয়েছে। ফলে দু’‌জনের মধ্যে কোনও রোমান্টিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে না। শুধু বর্ষশেষের রাতে ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার আগে শিউলির একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসা ছিল, ড্যান কয়েকদিন ধরে কাজে আসছে না কেন?‌
শিউলি পড়ে যাওয়ার খবর যেমন ড্যান পায়, তেমনই ওই প্রশ্নের খবরটাও পায়। আর সেটা তাকে নাড়া দেয়। তবে প্রবল অন্তর্মুখী ড্যান তার এই অনুভূতি নিয়ে বেশি কথা বলে না। শুধু অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে শিউলির সুস্থ হয়ে ওঠার। আর এই অপেক্ষা করার জন্যই সে রোজ হসপিটালে এসে বসে থাকে। লবিতে, রিসেপশানে, কেবিনের বারান্দায়, সিঁড়িতে। আর সবাই চলে গেলে এসে বসে শিউলির কেবিনে, বিছানার পাশটিতে। একা একাই কথা বলে চলে শিউলির সঙ্গে। তাকে চিনে যায় নার্সেরা। তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে শিউলির মা (‌গীতাঞ্জলি রাও)‌, যিনি স্বামীর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও যাবতীয় আর্থিক চাপ সহ্য করে হাসপাতালকে বলেন ‘‌ভেন্টিলেশান’‌ চালিয়ে যেতে। টানা এক বছর ধরে।
এদিকে ড্যানের সব কাজকর্ম পণ্ড হয়। হোটেলে বহুদিনই ‘‌অ্যাবসেন্ট’‌ হয় সে। সহকর্মীরা উপহাস করে। প্রিয় বন্ধুও মনে করিয়ে দেয় শিউলির প্রেমিক নয় ড্যান। পরিস্থিতি এমন হয় নার্সের কাছে পর্যন্ত হাত পাততে হয় ড্যানকে। এক সময় চাকরিও চলে যায় তার। তবু এ নিশির টান সে ছাড়তে পারে না। এ যেন তার নিয়তি, যার গ্রাস থেকে মুক্তি চায় না সে। ‘‌নিয়তি’‌র এমন তাৎপর্যপূর্ণ ‘‌সাবভার্সিভ’‌ চেহারা খুব কমই দেখা গেছে ভারতীয় সিনেমায়। ড্যান শুধু বসে থাকে এ কথা শুনতে কেন শিউলি সেই রাতে ড্যানকে খুঁজেছিল?‌ এ যেন সেই ‘‌একটি কথার দ্বিধাথরথরচুড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী’‌।
ড্যানের মা আসে। তাকে নিয়ে যায় এখান থেকে। ড্যান এরপর চলে যায় কুলু। এক হোটেলের ম্যানেজার হয়ে। তার কাজকর্ম মুগ্ধ করে সবাইকে। তবু ড্যান আবার একবার ফিরে আসে তার নিয়তির কাছে। আর এরপর যা ঘটে তা কবিতার মতো। ব্যঞ্জনায়, সমাপ্তিতে। দৃশ্যগতভাবেও।
এ ছবির দ্বিতীয়ার্ধ যতটা সিনেম্যাটিক, ততটাই উচ্চাঙ্গের সাহিত্যও। কখনও মনে হয় যেন আন্তরিওনির গভীর এক সিনেমা দেখলাম। আবার কখনও মনে হয় যেন রাস্কিন বন্ড বা বিভূতিভূষণের এক অনবদ্য শান্ত অথচ অতলস্পর্শী গল্প পড়লাম। সন্দেহ নেই সুজিত সরকারই এই মুহূর্তে বলিউডে সব চেয়ে বৈচিত্র‌্যময় পরিচালক। যিনি ‘‌পিকু’‌র বা ‘‌ভিকিডোনার’‌–‌এর মতো কমেডি, ‘‌মাদ্রাজ কাফে’‌র মতো থিলার আর ‘‌অক্টোবরট’‌–‌এর মতো বিষাদগ্রস্ত ছবি পরপর বানাতে পারেন।
আরেকজনেরও সেরা কাজ এই ছবি। ড্যানের চরিত্রে এমন অভিনয় করেছেন বরুণ ধাওয়ান যে এই ছবি যে ঘণ্টা দেড়েক হাসপাতালে আটকে আছে ছোট্ট এক পরিসরে, তা বোঝাই যায়নি। এটাও সুজিতের কৌশল, যখন অতটা দমচাপা আবহ থেকে এই ছবি প্রকৃতির কাছাকাছি আসে তখন যেন মুক্তির আনন্দ মেলে। আর বড় মমতায় সেই ভেজা ঘাস আর শিউলি ফুলগুলোকে ধরেছে অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top