সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ ভূতচক্র প্রাইভেট লিমিটেড, পরিচালনা:‌ হরনাথ চক্রবর্তী, অভিনয়ে:‌ সোহম, শ্রাবন্তী, বনি, ঋত্বিকা, গৌরব চক্রবর্তী, রজত গঙ্গোপাধ্যায়, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, কিঞ্জল নন্দ, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, সুমিত সমাদ্দার।
ভূত আসলে সময়ের খেলা। ভূত দেখা মানে সময়ে পিছিয়ে যাওয়া।
এই পিছিয়ে যাওয়া সময়টায় পৌঁছোনোর যন্ত্রই হল ‘‌ভূতচক্র’‌। যা ঘিরে যত রহস্য, যত রস ‘‌‌ভূতচক্র প্রাইভেট লিমিটেড’‌ ছবিতে। হরনাথ চক্রবর্তী পরিচালিত এ’‌ছবির চিত্রনাট্য পদ্মনাভ দাশগুপ্তের। সন্দেহ নেই এই চিত্রনাট্যই এ’‌সিনেমার সবচেয়ে জোরের জায়গা। আর সে চিত্রনাট্যে যেন ‌শীর্ষেন্দু মুখুজ্জেচিত ‘‌অদ্ভূতুড়ে’‌ ভূত ঘিরে মজা– মশকরা–‌রহস্য–‌বিষাদের ছোঁয়া।
‘‌ভূতচক্র’‌ নামের যন্ত্রটি অমিত (‌সোহম)‌ পায় তার পারিবারিক সূত্রে। অমিতের ঠাকুর্দা (‌পরান বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ ছিলেন ভূতশিকারি। তাঁরই রেখে যাওয়া ওই যন্ত্র। একে ভাঙিয়েই লোককে ঠকানোর কাজ চলে নানাভাবে। অমিতের পাশাপাশি সে কাজ করে তার দুই বন্ধু বনি (‌বনি সেনগুপ্ত)‌ আর নিমো ওরফে নিমাই (‌গৌরব চক্রবর্তী)‌ টিভি–‌র ‘‌অ্যাড স্পট’‌–‌এ তারা ভূতের তেল, ভূতের আত্মা নামানো, ভূতের করা ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি বেচে দিন চালায়। আর তা করতে গিয়েই তারা খপ্পরে পড়ে যায় এক দুর্নীতিবাজ নেতার (‌শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়)‌। এর জেরে তাদের অজ্ঞাতবাসে গা–ঢাকা দিতে হয়। ছবির শুরুর এই আধ ঘণ্টা নিছকই ‘‌স্ল্যাপস্টিক কমেডি’‌র। এর মধ্যেই একবার অবশ্য তাদের কবরখানায় ভূত দর্শন হয়ে যায়।
তবে আসল গল্প শুরু হয় শান্তিনিকেতন থেকে চিঠি আসার পরে। চিঠিটি লেখে এক বিপন্ন মহিলা রঞ্জা সেন (‌শ্রাবন্তী)‌। সে জানায় একটি বহু পুরনো বাড়িতে তারা থাকে। রঞ্জা তার শ্বশুরমশাই (‌রজত গঙ্গোপাধ্যায়)‌, ননদ খুশি (‌ঋত্বিকা সেন)‌, আর দুই চাকর–‌চাকরানি। কিন্তু ভূতের উপদ্রবে তাদের ওই বাড়িতে থাকা দায় হয়ে উঠেছে। সেই ভূত ধরতে বা তাড়াতে ওই বাড়িতে উপস্থিত হয় ‘‌থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’‌।
এরপর একইসঙ্গে ফর্মুলা এবং না–‌ফর্মুলা চলতে তাকে। ফর্মুলা মেনে বনির সঙ্গে খুশির প্রেম হয় (‌যদিও এত ভাল একটা পারিবারিক গল্পের ছবিতে এই দু’‌জনের মুখে বার বার ‘‌বাইমিনিং’‌ সংলাপ শুনতে বেশ খারাপ লেগেছে। রঞ্জা বিবাহিতা (‌স্বামীহারা বা স্বামী পরিত্যক্তা অবশ্য)‌ হলেও তার সঙ্গে একটা ‘‌নরম’‌ সম্পর্ক গড়ে ওঠে অমিতের (‌‌এই পর্বে ‘‌শোলে’‌র আদলে জয়া ভাদুড়ির বাতি নেভানো আর অমিতাভের মাউথ অর্গান বাজানোর যে ‘‌রেফারেন্স’‌টা আনা হয়েছে তা বেশ মজাদার)‌। অমিত–‌রঞ্জা, বনি–‌খুশির পাশাপাশি নিমোর সঙ্গে বাড়ির চাকরানির যে ‘‌সিডাকটিভ’‌ দৃশ্যগুলো তৈরি করা হয়েছে তা ব্যবহারের পৌনপুনিকতায় বিরক্তি এনেছে। এসব ফর্মুলার ব্যাপার।
তবে ফর্মুলার বাইরেও হেঁটেছে চিত্রনাট্য। তা হল কে ভূত আর কে মানুষ সেই ধাঁধাটা তৈরি করা। এই সাসপেন্সটা কিন্তু সত্যিই দারুণ ভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রথমার্ধে। আর দ্বিতীয়ার্ধে সেই জায়গা নিয়েছে একটি খুনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্য। তবে শেষপর্বে আবার কমেডির ধাঁচ ফিরে এসে রহস্যের আমেজটাকে একটু লঘু করে দিয়েছে। এটা না হলেই ভাল হত। আসলে ‘‌ভূতের ভবিষ্যৎ’‌ থেকে হরর–‌কমেডি’‌র যে জনপ্রিয় ধাঁচাটা তৈরি হয়েছে তাকেও ব্যবহার করে নিতে চেয়েছেন পদ্মনাভ–‌হরনাথরা। তার দরকার ছিল না। এ ছবি বরং মেজাজ–‌মর্জিতে হিন্দি ‘‌কাল্ট’‌ ছবি ‘‌ভুলভুলাইয়া’‌র মেজাজের অনেক কাছাকাছি ছিল।
তবু এটা ঠিক যে এ’‌ছবি দেখতে ভালই লাগে। তার কারণ চিত্রনাট্যের ভেতরে থাকা সাহিত্যধর্মিতা গল্পে বাংলা পুরনো ভূতের আমেজ। হরনাথ চক্রবর্তী তাঁর এই দ্বিতীয় ইনিংসে সাহিত্যধর্মিতার ওপরই জোর দিচ্ছেন। এ’‌ছবিতেও কিন্তু তারই জিত।‌

জনপ্রিয়

Back To Top