দ্বৈপায়ন দেব: ●‌ একটি সিনেমার গল্প। পরিচালনা:‌ আলমগির। অভিনয়ে:‌ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, আলমগির, আরেফিন শুভ, চম্পা, হাসান ইমাম।
‘‌ফিল্ম উইদিন ফিল্ম’‌। সিনেমার মধ্যে সিনেমা।
এটা যেমন আলমগিরের ‘‌একটি সিনেমার গল্প’‌ ছবির একটা বড় আকর্ষণ, তেমনই আবার সিনেমার বাইরের সিনেজগৎ, তার হাসি–‌কান্না, সেটাও এক বড় তাস এ ছবির পক্ষে। মানে একই সঙ্গে গ্ল্যামার–‌ডিগ্ল্যামারের খেলাটা এ ছবিতে খেলেছেন আলমগির।
বাংলাদেশে এ ছবি আগেই মুক্তি পেয়ে উচ্চপ্রশংসিত। বেশ কিছু পুরস্কারও পেয়েছে। আলমগির ‘‌মেনস্ট্রিম’‌–‌এ এ ছবি বানালেও বাণিজ্যিক মশলায় ভরপুর করে তোলেননি। বরং সম্পর্ক নিয়ে গল্পের ছবিকে ধীর ও সংযত গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। চতুষ্কোণ সম্পর্কের টানাপোড়েনের মুহূর্তগুলোকে ধরেছেন মুনশিয়ানার সঙ্গে।
সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু সিনেমা–‌পরিচালক আকাশের জীবন ও কর্মকাণ্ড। আর তারই সমান্তরালে তার নায়িকা কবিতারও। আকাশ আর কবিতা একে অপরকে ভালবাসে। যদিও সে প্রেম পরকীয়া (‌এ বিষয়টি বাংলাদেশের সিনেমার কমই আসে)‌, কারণ আকাশ বিবাহিত, স্ত্রী মিতা (‌চম্পা)‌ ও ফুটফুটে কন্যা মিতালিকে নিয়ে তার সুখের সংসার। সিনেমা শুরুও হয় সেই সংসারে বিবাহবার্ষিকী পালনের ঘটনা দিয়ে। এই ‘‌এপিসোড’‌–‌এই অবশ্য দক্ষ ছোটগল্পকারের মতো নাটকীয় মোচড় আনেন আলমগির। শুটিংয়ের প্রয়োজনে স্ত্রী মিতার হীরের আংটিটা ধার নেয় আকাশ (‌আলমগির)‌। ফ্লোরে গিয়ে শুটিংয়ের মধ্যে তা পরতে দেয় নায়িকা কবিতাকে (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌। কবিতা যখন শোনে এ আংটি মিতার, ঈর্ষাপরবশ হয়েই তা ফেরত দেয় না। উপরন্তু ওই আংটি পরেই চমকের মতো হাজির হয় আকাশ–‌মিতার বিবাহবার্ষিকীর ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। কবিতার আঙুলে নিজের বিয়ের আংটি দেখে মন ভেঙে যায় মিতার। দাম্পত্য অশান্তি শুরু হয়।
এদিকে, গল্পে নতুন কোণ নিয়ে আসে সিনেমার নায়ক সজীব (‌আরেফিন শুভ)‌। জনপ্রিয় এই নায়ক বহু সিনেমাতেই কবিতার সহ–‌অভিনেতা। সে নীরবে ভালবাসে কবিতাকে। কবিতা আকাশের প্রেমমুগ্ধ জেনেও। একসময় সে কবিতাকে বলে ফেলে নিজের ভালবাসার কথা। কবিতাও আকাশের কাছ থেকে পূর্ণ মনোযোগ না পেয়ে কিছুটা সাড়া দিয়ে ফেলে সজীবের ডাকে। কিন্তু আবার কিছুদিন পরে সে আকাশের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর ভেতরেই সাব–প্লটের মতো আসে কবিতার মাতাল বাবাকে নিয়ে অশান্তি। চিত্রনাট্যের এই চলন যেন পুরনো ধ্রুপদী ত্রিকোণ সম্পর্কের উপন্যাসের মতো লাগে। এই ‘‌ক্লাসিক্যাল’‌ ব্যাপারটা পরিচালক আলমগির তাঁর ক্যামেরা পরিকল্পনাতেও রেখেছেন। ছবি জুড়ে তাই লং শটের প্রাধান্য। গল্পের নাটকীয়তার মধ্যেও সেই ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌–‌এর ছোঁয়া।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অসাধারণ অভিনয় করেছেন। লাস্য ও বেদনা— উভয়ই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। আলমগিরের শান্ত ব্যক্তিত্ব এই চরিত্রের জন্য অবশ্যম্ভাবী ছিল। স্ত্রী মিতার চরিত্রে চম্পা প্রমাণ করেছেন এখনও ‘‌পুরনো চাল ভাতে বাড়ে’‌। দু–‌একটি মুহূর্তে তাঁর চাউনিতে যেভবে জল আর আগুনকে পাশাপাশি মিশিয়েছেন, তা মনে রাখার মতো। আর আরেফিনও বুঝিয়েছেন, কেন এই প্রজন্মের কাছে তিনি সেরা নায়ক। তাঁর অভিনয়ে তিনি নিচু–চাবি আর উঁচু–চাবির পর্দাকে অনায়াসে ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে একই সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।
ছবির সম্পাদনা শুধু আর একটু ভাল হওয়ার প্রয়োজন ছিল। শট ঢোকা বা কাটাগুলো। দৈর্ঘ্যটা আর একটু কম দরকার ছিল।

জনপ্রিয়

Back To Top