দ্বৈপায়ন দেব:  ●‌ বালা। পরিচালনা:‌ অমর কৌশিক। অভিনয়ে:‌ আয়ুষ্মান খুরানা,
ভূমি পেডনেকার, ইয়ামি গৌতম, সৌরভ শুক্লা, জাভেদ জাফরি, দীপিকা চিখলিয়া, সীমা পাওয়া, অভিষেক ব্যানার্জি।
সবার মাথা থেকে ‘‌উইগ’‌টা খুলে নিচ্ছে ‘‌বালা’‌ ওরফে বালমুকুন্দ শুক্লা!‌ নানারকম ‘‌নকল চুল’‌–‌এ নিজেদের অস্তিত্বকে ঢাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানুষদের মাথা থেকে। এক ঝটকায়!‌
আর সেটা করতে গিয়ে ‘‌টেকো’‌ কথাটার মানেকে আর শুধু চুলহীন মাথায় আটকে রাখেননি ‘‌বালা’‌ ছবির পরিচালক অমর কৌশিক, বরং তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অস্তিত্বের, জীবনযাপনের বহু পরতে। ‘‌টেকো’‌ বা ‘‌টাকলা’‌ মানে অসম্পূর্ণতা। প্রচলিত মাপকাঠিতে। এই ‘‌প্রচলিত’‌ ব্যাপরটা ‘‌চলতি’‌ হল কী করে?‌ না, বেশিরভাগ মানুষ যেমন, বেশিরভাগ মানুষ যা চায়। অর্থাৎ জনপ্রিয় যা কিছু তাকেই একমাত্র ‘‌মডেল’‌ হিসাবে চাওয়ার বা চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের আমজনতার স্বভাবের ভেতরেই থাকে। আর সেখানে থেকেই যত গোলমালের শুরু। ‘‌অন্যরকম’‌ হলেই কিছু মানুষকে ‘‌প্রান্তিক’‌ বা বাতিল করে দেওয়ার গল্পটাও শুরু, হয় এই প্রবণতা থেকেই।
যা বড় মর্মান্তিকভাবে বুঝতে হয় বালাকে। কারণ, এক সময় সে নিজেও ‌এভাবেই বাতিল করত। তখন শাহরুখ খানের ‘‌মিমিক্রি’‌ তাকে স্কুলে ‘‌হিরো’‌ বানিয়ে দিয়েছিল। তার সহপাঠিনী লতিকার গায়ের রং, রূপ প্রচলিত মাপকাঠি অনুযায়ী ‘‌সুন্দর’‌ নয়। অতএব, এহংকারী বালার কাজই ছিল, রূপের প্রসঙ্গে টেনে রোজ লতিকাকে অপমান করা। লতিকার হৃদয়ের দিকে ফিরেও তাকায়নি সে কোনদিনও।
কিন্তু এর পরই চিত্রনাট্যে তথা বালার জীবনে চূড়ান্ত ‘‌আপসাইড ডাউন’‌টা ঘটে যায়। আর তা ঘটে যায় যেন নীতিগল্পের মতো করেই। বালাও এবার সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে পিছিয়ে পড়ে বা বাতিল হয়ে যায়। তার মাথার চুলেরা এক সময় তাকে ছেড়ে চলে যেতে থাকে। প্রসঙ্গত, ওই ছবির কথক কিন্তু চুলেরাই। তাদের ‘‌রানিং কমেন্ট্রি’‌তেই আমরা ছবিটা দেখি।
একদিকে যেমন মাথায় চুল গজানোর জন্য বালার নানারকম মরণপণ ও হাস্যকর প্রচেষ্টা আমরা দেখতে থাকি, তেমনই সমান্তরালে চলতে থাকে বালার পেশা ও প্রেমগত জীবন। সেখানেও ওই সৌন্দর্য আর তার ভুলভাল মাপকাঠিরই গল্প। বালা চাকরি করে এক ফেয়ারনেস ক্রিম কোম্পানিতে। সেলসম্যানের। যে ছেলে নিজের ‘‌ইন্দ্রলুপ্ত’‌তার বিড়ম্বনায়, সেই ছেলেই রোজ আবার কালো মেয়েকে ফর্সা করার রূপকথা বেচে বেড়ায়। এই সাদা–‌কালোর চক্করে আবার গল্পে ফিরে আসে লতিকা (‌‌ভূমি পেডনেকার)‌‌।
আর অন্যদিকে তার জীবনে আসে পরী (‌‌ইয়ামি গৌতম)‌‌, যাকে সে চেনে মোবাইলের ‘‌টিকটক’‌ মিউজিক অ্যাপে নাচগান সমেত ‘‌আপলোডেড’‌ ছবি দেখে। সৌন্দর্যহীনতার জগতে পরী যেন সৌন্দর্যের এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে একদিন ছুঁয়েও ফেলে বালা, পরী তাদের ক্রিমের মডেল হয়ে ফটোশুট করতে আসায়। বালা কখন বাবার (‌‌সৌরভ শুক্লা) এনে দেওয়া ‘‌উহগ’‌ পরে ঘুরছে। তুমুল সপ্রতিভ বালার প্রেমে পড়ে যায় পরী ‘‌রূপ–‌কথার নিয়ম মেনে। তারপর বিয়ে। এবং বিয়ের পরের সকালেই বালার স্বরূপ উন্মোচন। 
এবং আয়ুষ্মান খুরানা। ওই ছবিতে তাঁর অভিনয়ে নির্দিষ্ট কিছু বেদনার মুহূর্তে অভিব্যক্তি দেখার মতো। এক গাঢ় বেদনা যেন ছায়ার মতো পড়ে থেকেছে তাঁর চোখে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। একের পর এক ছবিতে যেভাবে আয়ুস্মান অভিনীত চরিত্রেরা কোনও না কোনও ভুল ধারণা বা অন্ধ বিশ্বাসকে আঘাত করছে, তা দেখার মতো। এ বছরই ‘‌আর্টিকেল ১৫’‌য় জাতপাত–‌বিরোধী অবস্থান ‘‌ড্রিমগাল’‌–‌এ লিঙ্গসাম্য, এবং তার পরই ওই ছবিতে আবার তথাকথিত ‘‌সৌন্দর্যায়ন নিয়ে আপত্তি পেশ করা চরিত্র। একজন তারকার কাজ যে শুধু ভক্তদের বিনোদিত করা না, বরং তাদের মনে সঠিক ধারণাটা বুনে দিতে সাহায্য করাও, তা আয়ুষ্মান ছবির পর ছবিতে প্রমাণ করে চলেছেন। তাঁকে এখন বলিউডের ‘‌মি.‌ রাইট’‌ বলা চলে। আর একজনের কথা না বললেও অন্যায় হবে। ভূমি পেডনেকার। ওই ‘‌ছবির লতিকা। মেক–‌আপে ওই ছবিতে চূড়ান্ত কৃষ্ণকায়া। ‘‌দম লাগাকে হেঁইসা’‌তে স্থূলকায়া, ‘‌ষান্ড কি আঁখ’‌–‌এ ষাটোর্ধ্বা, এবার কালো মেয়ে। মানতেই হবে, নায়িকা–‌চরিত্রায়নে অন্য হাওয়া আনছেন ভূমি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top