সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • ‘‌বহমান’‌। পরিচালনা:‌  অনুমিতা দাশগুপ্ত। অভিনয়ে:‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, ব্রাত্য বসু, অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, গৌতম হালদার, সোহাগ সেন।

অসম প্রেম নয়। অসমকালের প্রেম। জীবন গিয়াছে চলে যখন কুড়ি–‌কুড়ি বছরের পার। তখন শুধু পৌষের মাঠে দেখা হওয়া নয়, দুই সত্তরের ঈষৎ এপার–‌ওপার দাঁড়িয়ে থাকা নরনারী যদি ঠিক করে, তারা একত্রে বসবাস বা সহবাস করবে, ঠিক কেমন হয় তাহলে?‌ বা কী হয়, প্রতিক্রিয়ায়?‌
সেলিম। আর মাধুরী। সেই দুই নরনারী হলে তো ধর্মীয় বিভাজনের বৃত্তটাও সম্পূর্ণ হয়, যাকে ভাঙতে চেয়েছে প্রেম।
এই নিয়েই অনুমিতা সেনগুপ্তের ছবি ‘‌বহমান’‌। যেখানে নরনারীর চিরকালীন মিলনের মনোগত ইচ্ছা আর সামাজিক সম্পর্কগুলোর শ্যাওলার মতো পায়ে জড়িয়ে শৃঙ্খল রচনা করা, গতিরোধ করা মুক্ত সম্পর্কের— এই বহমান তথা চিরন্তন কাহিনিই এ ছবির চিত্রনাট্য। 
চিরবহমান আরও একটি মাত্রা আছে ছবিতে। প্রেম, বাসনা, অঙ্গীকারের পাশাপাশি। সে মাত্রা অধিকারবোধের। আর তার থেকে জন্ম নেওয়া ঈর্ষার। রিরংসার। মা মাধুরীর সঙ্গে তাঁর বন্ধু সেলিমের বহমান সম্পর্কটাকে মেনে নিতে পারে না শুরু থেকেই ছেলে সুব্রত (‌ব্রাত্য বসু)‌। সেলিমকে (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌ শুরু থেকেই প্রায় নজরবন্দি করে রাখে সুব্রত গোপন চরেদের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে সঙ্ঘাতের জমি তৈরি হয় যত, ততই সুব্রতর ভেতরের হিংস্র বাঘটা বেরিয়ে আসে। পরিস্থিতি চরমে ওঠে যখন সেলিন আর মাধুরী (‌অপর্ণা সেন)‌ একত্রে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিতে চলে। সেকথা সেলিমই প্রস্তাবাকারে পেশ করে সুব্রত‌র কাছে। এই দৃশ্যটিতে সুব্রত চরিত্রে ব্রাত্য এবং সেলিম চরিত্রে সৌমিত্রবাবু— দুই প্রজন্মের দুই শক্তিশালী অভিনেতার সর্বার্থে মুখোমুখি লড়াই মনে থাকবে। এমন একটি দৃশ্যই খোলের ভেতরে মুক্তোর দানার মতো মহার্ঘ হয়ে ওঠে সিনে–‌রসিকদের কাছে। এই দৃশ্যে দু’‌জনেই কার্যত বিহ্বল। কিন্তু অভিব্যক্তি–‌তে  দু’‌জনে একশো আশি ডিগ্রি বিপরীত!‌ সৌমিত্র যেখানে চোখের ভাষায়, ঠোঁটের দ্বিধাগ্রস্ত নড়াচড়ায় দিশাহীনতাকে স্পষ্ট করেন। সঙ্কোচকে মূর্ত করেন। ব্রাত্য সেখানে অনেকখানিই তীব্র। সরাসরি। এবং উচ্চকিত। কিন্তু আগাগোড়া এক নিয়ন্ত্রিত সংযমে তাঁর রুক্ষ অভিব্যক্তিগুলোও প্রকাশিত। বসে থেকেও গোটা শরীর দিয়ে অভিনয় করেছেন ব্রাত্য। হাত ও কঁাধের মুদ্রায়। ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ানোয়। কোঁচকানো চোখ আর চেপা দাঁত–‌ঠোঁটের ব্যবহারে তীব্র করে সংলাপ–‌টা ছাড়ায়। এমন দৃশ্যই পর্দায়  দর্শকের কাছে ‘‌রিপিট ভ্যালু’‌ তৈরি করে। ব্রাত্যর সঙ্গে অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়ের নৈশ দ্বন্দ্বের দৃশ্যটিও উঁচু জাতের অভিনয়ে সাজানো। অর্পিতা  এ ছবিতে ব্রাত্য–‌অভিনীত চরিত্রের স্ত্রী জয়িতা। মেজাজে, ব্যক্তিত্বে, অন্তর্চরিত্রে যে সুব্রত‌র একান্তই বিপরীত। তার মা নীলিমা (‌সোহাগ সেন)‌, একজন রাজনৈতিক ‘‌অ্যাক্টিভিস্ট’‌, এ গল্পে তাঁরও একটা ভূমিকা আছে।
জয়িতা অধ্যাপক সেলিম খানের একদা ঘনিষ্ঠ ছাত্রী। সে সেলিমকে বিয়ে করার প্রস্তাবও দিয়েছিল ‘‌আর্লি‌ এজ ক্রাশ’‌–‌এর দরুন। মাধুরীর আমন্ত্রণে তার বাড়িতে গেলে জয়িতার সঙ্গে সেলিমের দেখা হয় বহু বছর পরে। এই দৃশ্য থেকেই জটিলতার সূচনা ঘটে। ঘটায় সুব্রত। বোঝা যায়, যার প্রতি সুপ্ত এক মনস্তাত্ত্বিক ‘‌কমপ্লেক্স’‌–‌এ ভোগে সে, সন্দেহ আর অধিকারবোধের তাড়নে। শিশুর মতো ভয়ও পায় সে মাকে হারিয়ে ফেলবার। এসব কিছু মিলে তার চরিত্রের ভেতর সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত জটিলতার, তার প্রকাশ ঘটে বাড়ির সবাই মিলে যাওয়া পিকনিকেও।
এরকমই ছিন্ন–‌বিচ্ছিন্ন সিকোয়েন্সের মধ্যে দিয়েই ছবির চিত্রনাট্যকে সাজিয়েছেন অনুমিতা। নাটকের মতো বেশ লম্বা দৃশ্যে। এতে ছবির গতি কিছুটা মার খেয়েছে হয়তো, কিন্তু ছবির চলন দেখে মনে হয়, এমনটাই অনুমিতার ইচ্ছা ছিল। এই ‘স্লোনেস’‌। তবে একটা পর্বে গিয়ে যেন মনে হয়েছে কাহিনি আটকে যাচ্ছে। আর একটু নাটকীয়তার সাসপেন্স কাম্য ছিল। তাছাড়া দুই নারীর মধ্যে জয়িতার চরিত্রটা বেশ স্পষ্ট ও বহুমাত্রিক হলেও, মাধুরী চরিত্রটি যেন আরও উন্মোচনের অপেক্ষা করে। অপর্ণা সেনের মতো একজন অভিনেত্রী চরিত্রের খামতিগুলো নিজের উপস্থিতি দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু চিত্রনাট্যে বহু–‌বহু উপস্থিতির পরেও চরিত্রটি যেন অননুন্মোচিত থাকে। ব্যক্তিত্বের দাপটে অথচ কৌতূহলবৃত্তিতে জয়িতা উজ্জ্বল। সৌমিত্র তাঁর নিজের কাজটুকু ঠিক করে গেছেন তাঁর উপস্থিতি দিয়ে। তাঁর সহায়কের ভূমিকায় হারু চরিত্রটি যদিও অপ্রয়োজনীয় লেগেছে, গৌতম হালদারের মতো সক্ষম অভিনেতা চরিত্রটিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া সত্ত্বেও। তাছাড়া শুধু সম্পর্ক–‌সম্পর্ক না করে দুই শিক্ষিত রুচিবান বয়স্ক মানুষের আলোচনা আরও নানা বিষয়ে সমৃদ্ধ হতে পারত। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top