সম্রাট মুখোপাধ্যায়: রহস্য। আর প্রতিশোধ।
পরিচালক সুজয় ঘোষের প্রিয় বিষয়। বড় ছবি থেকে ছোট ছবি যাতে বার বার ফিরে যান তিনি। ‘‌কাহানি’‌, ‘‌তিন’‌ বানানোর পরে ‘‌বদলা’‌ করে এক হিসাবে রহস্য–‌ট্রিলজি সম্পূর্ণ করলেন সুজয়।
‘‌ট্রিলজি’‌ এই জন্যই বলতে হচ্ছে, কারণ, এ ‌ছবিতেও রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু বাস্তবের হওয়া–‌না–‌হওয়া, থাকা–‌না–‌থাকা। একটি অপরাধকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নানারকম সম্ভাব্য বাস্তবের কাটাকুটি খেলা— এটা সুজয়ের ছক। 
এ ছবির চিত্রনাট্য অনেকটা নাটকের কাছাকাছি। তিনটি ঘরের আর একটি পথের ঘটনার ওপর মূলত ভর করে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রনাট্য। পর্দায় যার শুধু একলা মেঘলা বিকেলে। আইনের চোখে সন্দেহভাজন নয়না শেঠির (‌তাপসী পান্নু)‌ ফ্ল্যাটে এসেছে নামী আইনজীবী বাদল গুপ্তা (‌অমিতাভ বচ্চন)‌। এক খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত নয়না। তাই তার মুখ্য আইনজীবী জিমি (‌মানব কাউল)‌ তাকে পরামর্শ দেয় বিশেষজ্ঞ আইনজীবী মিঃ গুপ্তার পরামর্শ নিতে। সেই মতো বাদল গুপ্তা আসে নয়নার ঘরে। আর এদিকে জানা যায় নয়নার হাতে আছে মাত্রই তিনটে ঘণ্টা। এই তিন ঘণ্টা পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে আসবে তাকে। কারণ এমন এক সাক্ষ্য পুলিশের হাতে এসেছে যা নয়নার বিপক্ষে যাচ্ছে এ তদন্তে।
খুনের ঘটনাটি ঘটে প্যারিসের এক হোটেলে। যেখানে এক বন্ধ ঘরে অচৈতন্য নয়নার সঙ্গে পাওয়া যায় এক নিহত যুবক অর্জুনের (‌টনি লিউক, মালয়ালম ছবির নায়ক প্রথম হিন্দি ছবিতেই কামাল করা অভিনয় করেছেন)‌ মৃতদেহ। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বাইরে তুষারপাত থেকে বাঁচতে ঘরের জানলাও পাকাপাকিভাবে ‘‌সিল’‌ করা। তা হলে খুনি পালাল কোন পথে?‌ নাকি নয়নাই আসলে খুনি?‌ এই কেন্দ্রীয় রহস্যের জট খোলার অছিলাতেই চিত্রনাট্য এগোয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, এর ভেতরে আছে আরও নানারকম অজানা ভাঁজ।
খুনের ঘটনা ঘটে প্যারিসে। আর নয়নার ফ্ল্যাট গ্লাসগোয়। মাত্র তিন ঘণ্টার ভেতর সেখানে পৌঁছে অকুস্থল দেখে ফিরে আসা সম্ভব নয় বলে মিঃ গুপ্তা নয়নাকে বলেন, খুনের দিনের ঘটনা অনুপুঙ্খে বলে যেতে, যাতে কিছুই না বাদ পড়ে। আর গল্প বলার সময় তা থেকে সবরকম আবেগকে বাদ দিতে। তাই হয়। এই নিরাবেগ ভঙ্গিতে গল্পের ‘‌ন্যারেশন’‌টা এই সিনেমার বেশ বড় বৈশিষ্ট্য।
আর একটা ব্যাপারও ঘটে এর মধ্যে। এ ছবির ‘‌রিল টাইম’‌ আর ‘‌রিয়েল টাইম’‌ একাকার হয়ে যায়। যে পৌনে তিন ঘণ্টা ধরে বাদল গুপ্তার জেরা চলে, সেই পৌনে তিন ঘণ্টাই প্রায় আমরা সিনেমাটা দেখি। শুধু নয়নার অতীত চারণার বদলে ফ্ল্যাশ ব্যাকগুলো দেখি। আর সেই সূত্রেই এই গল্পে ঢুকে পড়ে ঘটনা বা ‘‌সিকোয়েন্স’‌ নম্বর তিন।
সেই ঘটনাটিও অতীতে ঘটেছে। এটিও একটি মৃত্যুর ঘটনা। যা গোপন রয়েছে আইনের চোখে।
এই মূল কাঠামোর গল্পের ওপর ভিত্তি করেই এবার শুরু হয় বাদল গুপ্তার অনুমানের খেলা। গুপ্তা নিজের ব্যাখ্যায় ঘটনাটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। আর নিজের ব্যাখ্যায় জড়িয়ে নেন নয়নাকে। তা পছন্দ না হওয়ায় নয়না আবার নিজের বলা কাহিনি সংশোধন করে নতুন করে কাহিনি নির্মাণ করে। ফের পাল্টা কাহিনি সাজান গুপ্তা। ক্রমান্বয়ে এটা চলতে থাকে এক দাবাখেলার মতো। এ যেন কোর্টরুম ড্রামারই এক অন্য চেহারা।
এ ছবি এক স্প্যানিশ ছবি ‘‌কনট্রাটিয়েম্‌পো’‌ (‌ইংরেজি নাম ‘‌দ্য ইনভিজিবল গেস্ট’‌)‌–‌এর অফিসিয়াল রিমেক। অনেকেই বলছেন ‘‌ফ্রেম টু ফ্রেম’‌ রিমেক। তাতে অবশ্য এই ‘‌হাউ–‌ডান–‌ইউ’‌‌টির রসগ্রহণে অসুবিধা হচ্ছে না। সাসপেন্স ছবির পক্ষে কাঙ্ক্ষিত শেষ চমকটিও জবরদস্ত। রিমেক বানাতে গিয়ে সুজয় আর একটি ‘‌আপসাইড ডাউন’‌ করেছেন। মূল ছবিতে অভিযুক্ত একজন পুরুষ আর তাকে বাঁচাতে এসেছে একজন মহিলা উকিল। এখানে বলাই বাহুল্য, ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। হয়তো নারী দিবসে ছবি মুক্তি পাবে এমনটা মাথায় রেখে এই ‘‌উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট’‌টা সাজানো। তবে ‘‌বদলা’‌ নামটা কোথাও যেন সেই ব্যাপারটাকে খানিকটা ‘‌প্রেডিক্টেবল‌’‌ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি এটাও ঠিক দুই নারীর লড়াইয়ের ব্যাপারটা চিত্রনাট্যকে যেমন আকর্ষণীয় মোড় দিয়েছে, তেমনই অভিনয় দিয়ে সেটাকে জবরদস্তভাবে ধরেছেন অমৃতা সিং ও তাপসী পান্নু। অমৃতার নবজন্ম হল অভিনেত্রী হিসাবে এমনটা বললে ভুল হবে না। তাপসী আবারও প্রমাণ করলেন তিনি ঝাঁকের কই নন।
তবে এ ছবি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অমিতাভ বচ্চনের। সারাক্ষণ একটা ঘরে একটা চেয়ারে বসে থেকে যে অভিনয়টা করলেন, তা তরুণ অভিনেতাদের কাছে ‘‌বাইবেল’‌ হতে পারে।
 

জনপ্রিয়

Back To Top