দ্বৈপায়ন দেব: একদম ‘‌বাধাই হো’‌। অভিনন্দন। পুরো ‘‌বাধাই হো’‌ টিমকে।  এরকম একটা সাহসি ‘‌এন্টারটেইনিং’‌ গভীর ছবি বানানোর জন্য।
যে ছবি ছকবন্দী খেলার মতো শুরু হয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে সেই ছকে দানগুলোকে বদলে ফেলতে পারে। হাসাতে হাসাতে এক পশলা বৃষ্টির মতো এনে ফেলতে পারে চোখের জল। চূড়ান্ত পারিবারিক গল্প বলতে বলতে আচমকা থাপ্পড় মেরে দিতে পারে এই সমাজের গালে। আর একটা সেক্স–‌কমেডিকে করে তুলতে পারে আংশিক রাজনৈতিক ছবি।
তরুণ পরিচালক অমিত রবিন্দারনাথ শর্মার ছবি ‘‌বাধাই হো’‌–‌র মূল কথা নতুনকে আসতে দাও। ছাড়পত্র দাও নহজাতককে। যে দেশে এই মুহূর্তে মুক্ত চিন্তার ওপর একের পর এক আক্রমণের ঘটনা ঘটছে,‌ একের পর এক বস্তা পচা মৌলবাদী চিন্তার আখড়া করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলিউডের মূল ধারার ছবিকে, ঠিক তখনই এমন একটা ছবি, তা সে যতই পারিবারিক–‌রূপক চাপানো থাক না কেন, তাকে চিনে নিতে আর ভালো লাগতে দেরি হয় না। 
গল্পের কেন্দ্রে আছে এক যুবক নকুল (‌আয়ুস্মান ঘুরানা)‌। আর তার সঙ্গে জুড়ে আছে তার প্রেমিকা তথা আই টি অফিসের সহকর্মী রাণী (‌‘‌দঙ্গল গার্ল’‌ সনিয়া মালহোত্রা এখানে পুরোদস্তুর ব্যক্তিত্বময়ী নায়িকা)‌ আর তার আধুনিকা, পরকীয়ায় আস্থা রাখা মা সঙ্গীতা শর্মা (‌শিবা চাড্ডা আবার চোখ টেনে নিলেন এ ধরনের ‘‌বোল্ড অ্যান্ড এজেড’‌ চরিত্রে)‌। এদের দিক থেকেও এ গল্পের মূল ঘটনাকে দেখা যায়। আর অন্য দিকে আছে নকুলের বাবা জিতেন্দার কৌশিক (‌গজরাজ রাও)‌, একাধারে রেলের টিকিট পরীক্ষক ও কবি। আর মা প্রিয়ংবদা (‌নীনা গুপ্তা)‌। তাদের দিক থেকেও এ গল্পকে দেখা যায়। এটাই গল্পের সব চেয়ে বড় তাস যে দু’‌দিক থেকে দেখলে ছবির মূল ঘটনাটা দু’‌রকম দেখায়। আর এই দু’‌পক্ষের মাঝে কখনও উকিল, কখনও আম্পায়ারের মতো আছে নকুলের ঠাকুমা (‌সুরেখা সিক্রি এই বয়েসেও এ ছবির সব চেয়ে বড় ভারটা কাঁধে করে টেনে বোঝালেন যে মঞ্চের এই বর্ষীয়ান শিল্পীকে হিন্দি ছবি কত কম ব্যবহার করেছে)‌।


জিতেন্দারের লেখা একটি কবিতা এক পত্রিকায় বেরোয়। আর তা পড়াপড়ির ফাঁকে শারীরিক ঘনিষ্ঠ হয় জিতেন্দার আর প্রিয়ংবদা এক বর্ষার রাতে। এই বর্ষা আসার ব্যাপারটা অনেকক্ষণ ধরে নির্মাণ করেছেন পরিচালক সিনেমায়। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে। সাড়ে চার মাস পরে বোঝা যায় প্রিয়ংবদা গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন। এবং তা জানার প্রথম রাতেই প্রিয়ংবদা সিদ্ধান্ত নেন এ‌বাচ্চার জন্ম তিনি দেবেনই, তা সে যতই পারিবারিক বা সামাজিক বাধা আসুক না কেন।
অন্যদিকে এই ঘটনা বিপর্যন্ত করে দেয় নকুলের জীবন। বন্ধুদের টিটকারিতে। প্রেমিকার মায়ের বিদ্রুপে। বাবা–‌মার প্রতি ধিক্কার আর ঘৃণা ছুঁড়ে দিতে থাকে সে। এক সময় অবশ্য ভুল ভাঙে তার। বোঝে নতুন এক জীবনকে পৃথিবীতে আসার জায়গা করে দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কিছু নেই।
নকুলের এই রূপান্তরকে ধরতে সমুদ্রের বোল্ডারের ওপর বসা যে দুটো দৃশ্যের অবতারণা করেছেন অমিত, তা সত্যিই অনবদ্য আর ‘‌সিনেম্যাটিক’‌ ফ্রেম জুড়ে একের পর এক পাখির উড়ান। যারা সমুদ্র থেকে উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। মানুষের মতো থাকার জায়গার বর্গফুট ভাগ করার লড়াই তাদের মধ্যে নেই এটাই যেন বোঝান পরিচালক।
এমনভাবে এক সিনেমায় কবিতা, রাজনীতি আর কৌতুককে এক সঙ্গে বুনে ফেলার জন্য ‘‌বাধাই হো’‌ পাবেই টিম্‌ অমিত। আর সন্দেহ নেই এটিমের ওপেনিং ব্যাটস্‌ম্যান হিসেবে আবার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন আয়ুষ্মান খুরানা। তবে এ ছবির ‘‌ম্যান অব দ্য ম্যাচ’‌ বাবার চরিত্রে গজরাজ রাও। চূড়ান্ত নাটকীয় মুহূর্তে নিজেকে অবিচল রাখা, ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেওয়াটাও যে কত বড় অভিনয়ের লক্ষণ, তা দেখিয়েছেন তিনি। আর, নীনা গুপ্তা নীরব অভিনয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের সমূহ শ্রদ্ধা আদায় করে নেন— তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্যে, তাঁর অভিনয়ের জন্যে, তাঁর অভিনীত চরিত্রের জন্যে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top