সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • অসুর। পরিচালনা:‌ পাভেল। অভিনয়ে:‌ জিৎ, নুসরত জাহান, আবির চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়।
নাম কিগান মান্ডি। আদিবাসী শিল্পী। ‘‌অসুর’‌ গোষ্ঠীর আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত এক যুবক। ভুলো মনা। ছবি শুরুর দৃশ্যেই দেখি পাজামা ছাড়াই, শুধু ঊর্ধ্বাঙ্গে পাঞ্জাবি পরে চলে এসেছে সে আর্ট কলেজে ক্লাস নিতে!‌ পাগলাটে। কখন যে হাসবে, কখন যে জড়িয়ে ধরবে, কখন যে ক্ষেপে যাবে— এসবের কোনও ঠিক নেই!‌ নিষ্ঠুর। কারণ জীবনে নানারকম ভালোবাসা পেয়েও তা মাড়িয়ে চলে যায় সে!‌ এই ‘‌আনপ্রেডিক্টেবিলিটি’‌–‌টা নেই শুধু কিগানের (‌জিৎ)‌ শিল্পে। সেখানে সে নাছোড়বান্দা রকমের আত্মবিশ্বাসী। সেখানে সে ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌।
একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন আর তঁার শিল্পকর্ম অনেক সময়ই আলাদা, তারই জীবন্ত স্বাক্ষ্য কিগান মান্ডি। ব্যক্তিগত জীবনে কিগান যতটাই অস্থির, শিল্প সৃষ্টিতে ততটাই শান্ত, গভীর। তারই একটি চূড়ান্ত নমুনায় এসে স্থির হয়েছে এ ছবির চিত্রনাট্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমাটি তৈরি করে সে শহরের এক বারোয়ারি পুজো প্যান্ডেলে। যা নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক, বঁাধভাঙা ভিড়ের কারণে দর্শকদের নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সরকার বন্ধ করে দেয় এই বিশাল মূর্তিসংবলিত পুজো প্রদর্শন।
সবচেয়ে বড়দুর্গা নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এক প্যান্ডেলে বিরাট হইচই, বিতর্ক হয়েছিল কয়েক বছর আগে। সেই পার্কের নাম আসলের কাছাকাছি রাখতে গিয়ে দেশবন্ধু পার্ক রাখা হয়েছে, যা আসলে উত্তরে। তবে যেসব রাস্তাঘাটের উল্লেখ ‘‌রেফারেন্স’‌–‌এ আনা হয়েছে, তা সবই দক্ষিণের। এ ছবিতে প্রায় থ্রিলারের উত্তেজনা এসেছে এই পুজো বন্ধের নেপথ্য কারণ নিয়ে কাটাছেঁড়া ঘিরে। 
তবে এটাও ঠিক, এই ‘‌ডকু’‌ অংশটা এ ছবির জোরও বটে, আবার কিছুটা দুর্বলতাও বটে। কারণ চিত্রনাট্যের একটা বড় অংশ জুড়ে দাম্পত্য;‌ বন্ধুত্বও ত্রিকোণ সম্পর্কের আলো–‌অন্ধকার–‌বেদনা। আচমকা থ্রিলারের প্রবেশ ঘটেছে।‌ ফলে ছবির ক্লাইম্যাক্সও ভীষণ নাটকীয় হয়ে গেছে। ছবির প্রথমার্ধের গভীরতা বরং অনেক বেশি।
কিগান ছাড়া এ ছবিতে ত্রিভূজের অন্য দুটি বাহু হল বোধি (‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌ আর অদিতি (‌নুসরত জাহান)‌। তিনজনই আর্ট কলেজের সহপাঠী। বোধি আর অদিতির এক সময় বিয়ে হয়। তাদের সন্তানও হয়। তবু দু’‌জনের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায় কিগানের ব্যাপারে বোধির অসূয়ার কারণে। সে মেনে নিতে পারে না কিগানের সঙ্গে অদিতির নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রেখে যাওয়া। শুরু হয় ইগোর যুদ্ধ।
ছবিতে কিগানের বিপরীতে আনা হয়েছে বোধির মতো চরিত্র। চরিত্রবান, সুদর্শন, আদর্শ পিতা, কিন্তু মনের অভ্যন্তরে তুমুল মেপে নেওয়া, যাচাই করে তবে বুঝতে চাওয়া এক হিসেবি মানুষ, যে পেশায় এক বড় কর্পোরেট কর্তা। গোটা কলকাতায় তিন–‌চার ডজন পুজো স্পনসর করে বোধির এজেন্সি।
এরই মধ্যে এসে গেল কিগানের ওই বিরাট দুর্গামূর্তি গড়ার খবর। আর তাতে তাকে সাহায্য করছে অদিতি। ব্যস, ক্ষিপ্ত বোধি চেষ্টা শুরু করল যদি ওই মূর্তিকে ‘‌ব্যান’‌ করা যায়। কীভাবে করা যায়, তার জন্য সে ভয় দেখাল অদিতির বাবাকে (‌বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়)‌, যিনি একজন ক্লাবকর্তা। ছবির শেষ কি বন্ধুত্বে নাকি শত্রুতায়?‌
এমন অচেনা, বঁাধভাঙা নায়ক চরিত্র ইদানীং বাংলা ছবিতে কমই আসে। এ চরিত্রের মুখে যে সংলাপ দিয়েছেন পরিচালক পাভেল, তাও বেশ অন্যরকম। হয়তো কারও কারও কাছে একটু বেশিই ‘‌তীব্র’‌ বা ‘‌অশিষ্ট’‌ লাগতে পারে। তবে এটাও ঠিক, এমন ছাল–‌বাকল ছাড়ানো সংলাপ ছাড়া এ ছবি বা এ চরিত্র জমত না। একটু–‌আধটু বাড়াবাড়ি কাজেই লেগেছে। জিৎকে শুধু ভালো নয়, ‘‌অমোঘ’‌ লেগেছে বলা যায়। তবে এমন একটা অন্য ধরনের ছবি প্রযোজনা করার জন্য প্রযোজক জিৎ বাড়তি বাহবা পাবেন। তঁার বিপরীতে আবির চট্টোপাধ্যায় কাঙ্ক্ষিত মুখোশটি মুখে ঝোলাতে পেরেছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন অসুররা যখন দেবতা হয়, দেবতারা অসুর বনে যায়। অন্যরকম আর যথাযথ লেগেছে নুসরতকেও। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে বহুদিন পরে বড় চরিত্রে দারুণ লাগল। ভাল লেগেছে কুশল চক্রবর্তীকে। স্বল্প উপস্থিতিতে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীকেও ভাল লাগে। ছোট চরিত্রে উপস্থিত রাজনন্দিনীর।
এই সময়ে দঁাড়িয়ে ‘‌অসুর’‌ সম্প্রদায়ের একজনকে নায়ক করার ভেতর এক ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থাকে, প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে, সে সাহস দেখানোর জন্য পাভেলকে বাহবা। আর এ ছবির সংলাপও বেশ প্রথাবিরোধী। তার জন্যও সাহসী হতে হয়েছে পাভেলকে।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top