মনোজিৎ মালাকার: দলটাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালবাসতেন। সক্রিয় রাজনীতি তেমনভাবে না করলেও বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ব্যারাকপুর আনন্দপুরী এলাকার সমীর বিশ্বাস। অঞ্চলে 'সঙ্গম' নামে পরিচিত এক ৬২ বছরের প্রৌঢ়। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য ডেয়ারি বিভাগের এই কর্মী ‘নীহারিকা' নাট্য সংস্থার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন। একদিকে নাটক করতেন, অন্যদিকে, দারুণ দেওয়াল লিখতেন। গত ২ মে বিধানসভার ফল বেরতেই বামেদের এই ভরাডুবিতে মনে তীব্র আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। এই নিয়ে ফেসবুকে নিয়মিত পোস্টও করেছিলেন। শেষে একটি কবিতাও লিখেছিলেন। তারপরই গভীর রাতে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় সমীরবাবুর। অবশেষে সোমবার বিকেল ৪টে নাগাদ মৃত্যু হয় তাঁর।

অনেক বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা বলেন ‘বামপন্থা' আবেগের। আর সেই আবেগ, দুঃখেই প্রয়াত হলেন জনপ্রিয় সঙ্গমবাবু। তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু পার্থপ্রতিম ভৌমিক aajkaal.in-কে বলেন, স্কুল জীবনের বন্ধু সঙ্গমের সঙ্গে এত বছর কেটে গেলেও বন্ধুত্বে কখনও খামতি ছিল না। আরও বলেন, সমীর নয়, সঙ্গম বলেই ডাকতেন তাঁকে। তাঁর এই মৃত্যুতে তিনি শোকস্তব্ধ। 

‘নীহারিকা' নাট্যদলের এক সহকর্মী অনিন্দিতা ভৌমিক aajkaal.in-কে বলেন, সঙ্গমবাবু বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। ওঁর বাবা, দাদু বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক সচেতন সঙ্গমবাবু তাঁর মতামত ব্যক্ত করতেন। সঙ্গমবাবু অনেক শৈল্পিক কর্মে পটু ছিলেন‌ বলে জানান অনিন্দিতাদেবী। জানান, আঁকা-লেখা, দেওয়াল লিখনেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

বামেদের এই ফলে কষ্ট পেয়েছিলেন সঙ্গমবাবু। গত ২ মে রাতে সন্ধের পর থেকেই ফেসবুকে একাধিক পোস্ট করেছিলেন সমীরবাবু । শেষ পোস্টটি করেন রাত তিনটে নাগাদ। বাম মনোভাবাপন্ন সমীরবাবু সেখানে একটি কবিতা লেখেন। তারপরেই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন তিনি। যে কবিতাটি লিখেছিলেন-

কবিতার‌ নাম: বলতে পারব না, মাফ করবেন (সমীর বিশ্বাস)


ফলাফল "শূন্য" হলেও
বলতে পারব না
ছাত্রযুবদের কর্মসংস্থানের
দাবিটা ভুল ছিল।

ফলাফল যতই শূন্য হোক 
বলতে পারব না
আমফানের ঝড়ে
বৃদ্ধ বয়সে
দিন নেই রাত নেই
সুন্দরবনের কান্তিবাবুর
বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে
বাঁধ সারানোর কাজ করাটা
ভুল ছিল।
বলতে পারব না।

ফলাফল যতই শূন্য হোক
বলতে পারব না
অতিমারির লকডাউনে
দিনের পর দিন 
নিরন্ন মানুষের মুখে
খাবার তুলে দেওয়া
ভুল ছিল।
আমি বলতে পারব না।

আমি বলতে পারবনা
সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের
জমি-আন্দোলনের পেছনে
আন্তর্জাতিক চক্রান্তের
কথা বলাটা ভুল ছিল
বলতে পারব না।

প্রদীপ তা কমল গায়েনের
নৃশংস হত্যাকাণ্ডে
অপরাধীদের শাস্তি চাওয়া
ভুল ছিল বলতে পারবো না। 

মানুষ যতই প্রত্যাখ্যান করুক
আমি বলতে পারব না
দেশকে দেউলিয়া বানানোর
কেন্দ্রীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে
আন্দোলন করা ভুল ছিল।
কৃষক মারা আইন বাতিলের
দাবি করাটা ভুল ছিল
আমি বলতে পারবো না।

বরঞ্চ আমি বলবো
রুটি রুজির প্রশ্নে 
ভ্রষ্টাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে
সবার হাতে কাজ
সবার পেটে ভাতের দাবিতে
কিংবা দেশকে বেচে দেবার বিরুদ্ধে 
প্রতিটা লড়াই সংগ্রাম সংগঠিত
করাই সঠিক কাজ।

জনপ্রিয়

Back To Top