আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ একেই বোধহয় বলে ভাগ্যের চাকা ঘোরা। অন্তত মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত গ্রাম পিম্প্রির হতদরিদ্র চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের ছেলে সন্দীপ পাটিলের তো তাই হয়েছে। নড়বড়ে একচিলতে মাটির কুঁড়েতে থাকা সন্দীপ আর তার ভাইবোনেরা একটা সময় নিত্যদিনই অভুক্ত থেকে ঘুমিয়ে পড়তেন। আর আজ কানপুরেক ই–স্পিন ন্যানোটেক কোম্পানির মালিক সন্দীপ। ক্যান্সারের পরীক্ষা, অপটিক্যাল সেন্সর, বাতাসের ফিলট্রেশন সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত ন্যানোফাইবার তৈরি করে তাঁর কোম্পানি। ৩২ বছরের সন্দীপ জানালেন, বছরে ২.‌২ কোটি টাকা ব্যবসা করা ই–স্পিন ন্যানোটেক এবছর ১০ কোটি টাকা ছুঁতে চলেছে। আজ পিম্প্রিতে তাঁর সাফল্যকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ডাক পড়ে তাঁর।
নিজের জীবনের কাহিনী শোনাতে গিয়ে সন্দীপ বললেন, ছোটবেলায় তাঁর কাকাই তাঁকে নিয়ে গিয়ে পাশের গ্রাম ধন্দ্রার একটি স্কুলে ভর্তি করেন। কারণ ৭৫ শতাংশ আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত, দরিদ্র গ্রামটিতে না ছিল সুশিক্ষার ব্যবস্থা না ছিল সুস্বাস্থ্য পরিষেবা। উচ্চশিক্ষিত বাসিন্দা অধ্যুষিত ধন্দ্রাতেই প্রথমবার বিজ্ঞানী পাটিল ভাইদের কথা শুনে বিজ্ঞান এবং গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হন সন্দীপ। গ্রামে যখন টিভি বা ডিজেলচালিত গাড়ির ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ কেউ ঠিক করত সেটা খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন তিনি। স্কুল পাসের পর পিম্প্রি ফিরে বাড়ির বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব নিয়ে মাকে বিকেলে দোকানে সাহায্য এবং রাতে পড়াশোনা করতেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ফের ধন্দ্রা ফেরেন। সেখান থেকেই বিটেক পাস করেন। তারপর প্রথমবার না পারলেও কয়েকবারের চেষ্টায় আইআইটি কানপুরে সুযোগ পান। সেখানে পিএইচডি শুরু করেন। সেখানেই একদিন যখন তাঁর এক সহকর্মী ই–স্পিন মেশিন জুড়তে ব্যর্থ হন, সেই কাজটা সন্দীপকে দেওয়া হলে দক্ষ হাতে তা সম্পন্ন করেন তিনি। তারপরই ন্যানোফাইবারজাত পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।
তখন ভারতে সুলভে ন্যানোফাইবার তৈরির চাহিদা ছিল বিপুল। সেই সুযোগই কাজে লাগান সন্দীপ। কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে ব্যবসায়িক পরামর্শ নিয়ে আইআইটি কানপুরের এসআইডিবিআই এসআইআইসি–র সহায়তায় ২০১০–এ শুরু করেন নিজের কোম্পানি ই–স্পিন ন্যানোটেক। এর আগে দেশে ন্যানো মেশিনগুলি ছিল আমদানি করা। তাই ন্যানোফাইবারজাত পণ্যের দামও ছিল চড়া। সন্দীপ কম দামে দেশেই সেই মেশিন তৈরি করে ন্যানোফাইবার তৈরি করা শুরু করলেন। ফলে সেই উৎপাদিত ন্যানোফাইবারের দামও শস্তা হয়ে গেল। কিন্তু তখন কানপুরে সেভাবে কোনও ভালো কর্মশালা না থাকায় দিল্লি থেকে যন্ত্রাংশ তৈরি করে আনতে হত তাঁকে। টাকা আর সময় বাঁচাতে কানপুরের যুবক–যুবতীদেরই নিজে হাতে এই কাজে প্রশিক্ষিত করেন তিনি। এছাড়া এধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি করা ছোট কোম্পানিগুলিকে জোটবদ্ধ করে একটা কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসেন। তার ফলও মেলে হাতেনাতে। বর্তমানে সন্দীপের সাধের ই–স্পিন ন্যানোটেকের ক্রেতা দেশের বিখ্যাত গবেষণাগারগুলি। এবার ফেস মাস্ক এবং কেবিন এয়ার ফিল্টার তৈরি করতে চলেছে তাঁর কোম্পানি, জানালেন সন্দীপ। তাঁর আশা তাঁর ই–স্পিন ন্যানোটেক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি একদিন পাবলিক লিমিটেড হবে। তাহলে তাঁর নিজের কোম্পানি তো বটেই অন্য কোম্পানিগুলিও লাভবান হবে, যাতে আখেরে লাভ হবে দেশেরই। বললেন সন্দীপ পাটিল। আমাদের শুভেচ্ছা রইল।
ছবি:‌ ডেইলিহান্ট            

জনপ্রিয়

Back To Top