শিবব্রত গোস্বামী
কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো বাঙালির ঘরের আরধনা যেমন, তেমন উৎসবও। ভক্তি আর আনন্দ থাকে পাশাপাশি। দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। মা লক্ষ্মী ধন সম্পত্তির দেবী । অনেকেই সারা বছর প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়ম মেনে লক্ষ্মী পুজো করেন । বৃহস্পতিবার তাই ‘‌লক্ষ্মী বার’‌ নামে পরিচিত । কিন্তু আশ্বিন মাসের এই বিশেষ দিনটি এসবের থেকে আলাদা। 
বাংলায় মা লক্ষ্মী আসেন বিভিন্ন রূপে। কখনও মাটির ছাঁচে, কখনও আবার পোড়া মাটির ঘটে। মাটির সরার ওপর লক্ষ্মীর মুখ এঁকে তাকে পুজো করার প্রথা তো খুব জনপ্রিয়। সে জিনিস দেখতেও ভারি সুন্দর আর আন্তরিকও। যে রূপেই হোক, শাস্ত্র মতে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী ধন সম্পদে ভরিয়ে দিতে ভক্তর বাড়িতে পুজো নিতে আসেন । নিশীথে এসে দেখেন, বাড়ির কে জেগে আছে ? কার দরজা খোলা আছে ? সেই বাড়িতেই প্রবেশ করেন মা–এমনই বিশ্বাস বাঙালির । তিনি ধন, আলো, সৌভাগ্য, সৌন্দর্য্যেরও প্রতীক। বাঙালির ঘরে তাই তো বেজে ওঠে সেই গান–‘‌এস মা লক্ষ্মী বসো ঘরে , আমারই ঘরে থাকো আলো করে’‌। বিশ্বাস, দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে সুখ বাড়বে, অর্থ কষ্ট থাকবে না ।
লক্ষ্মী দেবী দ্বিভূজা। তিনি মর্তে নামেন পেঁচাকে বাহন করে। হাতে থাকে তঁার শস্যের ভান্ডার। আবার কালী পুজোর দিনে অনেক বাড়িতে ‘‌অলক্ষ্মী’‌র পুজো করা হয়। বিশেষ করে এপার বাংলার আদি বাসিন্দারা এই পুজো করেন। আসলে বাঙালিদের তো বারো মাসে তেরো পার্বন। গণেশ পুজো দিয়ে শুরু তারপর বিশ্বকর্মা পুজো , দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো ,কালীপুজো ,ভাইপুজো , জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে সরস্বতী পুজো দিয়ে শেষ। কিন্তু দীপাবলির দিনে অলক্ষ্মী পুজোর ব্যাপারটা অনেকেরই অজানা। কথিত আছে ইনি দেবী লক্ষ্মীর বড় বোন। সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের পাত্র নিয়ে উঠে এসেছিলেন দেবী লক্ষ্মী আর গরলের পাত্র নিয়ে উঠে এসেছিলেন অলক্ষ্মী। তবে তাঁর আবির্ভাব নিয়ে পুরানে ভিন্ন ভিন্ন গল্প আছে। পুরান অনুযায়ী তঁার স্বরূপটি মা লক্ষ্মীর বিপরীত। এইজন্য অনেক সময়ে অপরিষ্কার, অকর্মন্য, শ্রীহীন মানুষকে ‘‌লক্ষ্মীছাড়া’‌ বলে ডাকা হয়। বাড়ির ঠাকুমা, দিদিমারা ‘‌অলক্ষ্মী’‌  উচ্চারণ করতে ভয় পান। তিনি নাকি নিয়ে আসেন দারিদ্র‌্য। দুর্ভিক্ষ নিয়ে। সেই কারনে এই নাম মুখে আনা ভালো নয়। 
প্রবাদ আছে ‘‌লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা’‌‌। সময়ের নিয়মে তিনি অলক্ষ্মী রূপ ধারণ করেন, তাই তাকে তুষ্ট রাখতে দুই রূপেরই পুজো। লক্ষ্মী–‌অলক্ষ্মী দুই বোন, তাই তঁারা সর্বদা সহবস্থান করেন। কথিত আছে সেই কারনে যেখানে সম্পদ, সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য সেখানেই ঈর্ষা, হিংসা। তাই দীপাবলির দিনে অলক্ষ্মীর পুজো করে এই ঈর্ষা, লোভকে তাড়িয়ে সম্পদ সমৃদ্ধি কে স্বাগত জানানো হয়।  

জনপ্রিয়

Back To Top