অলক সরকার ● সঞ্জয় বিশ্বাস,শিলিগুড়ি ও দার্জিলিং: এক সময় তিনি মাথা উঁচু করে বলতেন, ‘‌আমিই পাহাড়ের মুখ্যমন্ত্রী’।‌ পাহাড়ে যখন বিশাল কনভয় হাঁকিয়ে ঘুরতেন, দেখে মনে হত মুখ্যমন্ত্রী নয়, প্রধানমন্ত্রী যেন। থাকতেন রাজার মতো। পাহাড় দাপানোর জন্য ছিল বিলাসবহুল গাড়ি। আবার জঙ্গলপথে যাতায়াতের জন্য ছিল আলাদা গাড়ি। ছেলে অবিনাশকে ‘‌হিরো’‌ বানাতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নেপালে। ‘‌বিতেকা পল’ নামের একটি সিনেমায় অভিনয়ও করেছিল অবিনাশ। মেয়ে অন্নপূর্ণাকে হাইকোর্টের উকিল পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছিলেন প্রায়। ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এমন একটা জায়গায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখান থেকে মাটিতে পা পড়ত না। 
ক্রমশ সেই রাজপাট খসে পড়তে শুরু করে। নায়ক ছেলে এখন ফেরার। মেয়ে অন্নপূর্ণার উচ্চমাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেট জাল বলে সামনে এসেছে। আর গুরুংয়ের বিরুদ্ধে দেশবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ। ফলে গোটা পরিবার এখন পলাতক। গুরুং কোথায় আছেন, কেউ বলতে পারেন না। শুরুতে সিকিমে আশ্রয় নিলেও বাংলার সঙ্গে সিকিম সরকারের সম্পর্ক যে–‌স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে, তাতে গুরুংয়ের সিকিমে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন পাহাড়ের অনেকেই। ফলে অনেকের সন্দেহ, তিনি নেপালেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। যদিও পাহাড়ে জল্পনা আছে, তিনি উত্তরাখণ্ড বা দিল্লির কোথাও আছেন। কিন্তু বিমল গুরুং ঠিক কোথায় আছেন, সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র খবর নেই কারও কাছে। পুলিসও তাঁর টিকি খুঁজে পাচ্ছে না। তবে পালিয়ে থাকলেও বেপাত্তা হয়ে যাননি। মাঝে মাঝেই অডিও বার্তায় ফোঁস ফোঁস করেন। কিন্তু পাহাড়ে আর দেখা মিলছে না। বিনয়পন্থী মোর্চার সহ–‌সভাপতি সতীশ পোখরেল জানান, ‘‌২০১৭ সালের ৬ আগস্ট পাহাড়ের ইতিহাসে কালো দিন। ওইদিন বিমল গুরুং পাহাড়বাসীকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে গেছেন। আজও পালিয়ে। যাকে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে গোর্খাদের জন্য নেতৃত্ব দিতে হত, তিনি সমস্ত ঝামেলা থেকে গা বাঁচাতে পালিয়ে আছেন। এমন নেতাকে কেউ ক্ষমা করবে না।’‌ 
এখনও পাহাড়ের অনেক জায়গায় গুরুংয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকে আছেন। তাঁদের অনেকে ভেবেছিলেন লোকসভা নির্বাচন এলে দার্জিলিং আসনে এবারে গুরুংকেই প্রার্থী করা হবে। কিন্তু সিআইডি গুরুংয়ের বাড়ি সিল করে দেওয়ায় এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার জেরে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাও জলে। যতক্ষণ না গুরুং স্বয়ং এসে হাজির হবেন, ততক্ষণ আর ভোটার তালিকায় নাম ওঠার সম্ভাবনা নেই। অবাক করা বিষয় হল, পাহাড়ের সাধারণ মানুষও আর কোনও ঝামেলা চাইছেন না। শান্তির পাহাড়ে সবাই এখন দিব্যি আছেন। তাকভর এলাকার সুরজ সুব্বা জানান, ‘‌অযথা ঝামেলা আমরা চাই না। তাই কে কোথায় পালিয়ে আছে, সে সব নিয়ে আমরা ভাবি না।’‌ সুরজ অবলীলায় যে কথাটি বলতে পারলেন, পাহাড়ের সব মানুষ অবশ্য সেভাবে মুখ খুলতে চান না আজও। গুরুং পলাতক কিন্তু গুরুং নামের ভয় এখনও ছড়িয়ে আছে কোথাও কোথাও।  

জনপ্রিয়

Back To Top