সঞ্জয় বিশ্বাস,দার্জিলিং: ভোট যে উৎসবের মতো উদ্‌যাপন করা যায়, সেটা প্রথম শিখল দার্জিলিং–‌‌কালিম্পং। কোনও ভয় নেই। কোনও ফতোয়া নেই। ইচ্ছেমতো প্রার্থীকেও যে ভোট দেওয়া যায়, তাও জানল পাহাড়ের আঠারো থেকে আশি। যে পাহাড়ে ভোটের দিন কালো মেঘ থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকত, সেই ভোটের পাহাড় এদিন ছিল ঝলমলে। সত্যিকারেই ‌এদিন সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা চিকচিক করছিল। দার্জিলিঙের যে কোনও প্রান্তে দাঁড়িয়ে পর্যটকেরা মুগ্ধ হয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে উপভোগ করছিলেন। এই মুগ্ধতা শুধু পাহাড়ের রূপ দেখে নয়, পাহাড়ের ভোট দেখেও। 
দার্জিলিঙে ভোটের দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আপন মনে ঘুরে বেড়িয়েছেন বহু পর্যটক। অন্যদিকে কাতারে কাতারে পাহাড়ের মানুষ 
লাইন দিয়ে নেমে এসে বিভিন্ন কেন্দ্রে আনন্দ করতে করতে ভোট দিয়েছেন। বারাসত থেকে 
দার্জিলিঙে ঘুরতে আসা অচিন্ত্য মণ্ডল জানালেন, ‘পাহাড়ের রূপ দেখার সময় পাইনি। ভোটে মানুষের আনন্দ দেখলাম আর শুধুই ভাবলাম 
৫ বছরের মধ্যে কতটা বদলে গেছে শৈলশহর।’‌ 
পর্যটকেরাও দেখলেন উৎসবমুখর অন্য এক দার্জিলিং। পাহাড়ের ভোট মানেই বিগত এক দশক জুড়ে ছিলেন বিমল গুরুং। দার্জিলিং আসনের জয়–পরাজয় নির্ভর করত পাহাড়ের ভোট দিয়ে। কারণ, এতদিন সেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছে নয়, অন্যের চাপানো ইচ্ছেতে ভোট দিতেন। পাহাড়ের অঘোষিত রাজা–বাদশারা যা চাপিয়ে দিতেন, সেই চিহ্নেই অনিচ্ছার আঙুল ছোঁয়াতে হত মানুষকে। অনেকে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগও পেতেন না। হুমকি শুনে বাড়িতেই থাকতে হত। একচেটিয়া পাহাড়ের ভোট পাওয়ার পর সমতলের ভোট গুরুত্বহীন হয়ে পড়ত। এবার গুরুং নেই। চাপিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই। তাই শুধু পাহাড় নয়, ভোটাররা উৎসব করলেন পাহাড়–সমতল সর্বত্র। কারণ, এবারে পাহাড়ের মতো সমতলের ভোটও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়ে সকাল থেকেই দেখা গেল ঘুম স্কুল, জুনিয়র বি টি কলেজ, সিংমারি–‌সহ বেশ কিছু এলাকায় লম্বা লাইন দিয়ে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। এই ভিড়ের মাঝে দেখা মিলল ১৮ বছরের নেহা তামাং, শকুন্তলা তামাং, রিয়া ছেত্রিদেরও। 

 

ওঁদের কাছে প্রশ্ন ছিল, ‌শুধুই কি প্রথম ভোট দেওয়ার আনন্দে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, নাকি বিশেষ কিছু ভেবে ভোট দিচ্ছেন?‌ উত্তরটাও ছিল মন ভাল করার মতোই। রিয়া, শকুন্তলা জানালেন, ‘আমরা আমাদের মতো একটা সরকার চাই। যে সরকার পাহাড়ের উন্নয়নের কথা ভাববে। পাহাড়ের শিক্ষার কথা ভাববে। যাঁকে ভোট দিলে এমন সম্ভাবনা থাকবে, আমরা তাঁকেই ভোট দিতে লম্বা লাইনের পেছনে দাঁড়িয়েছি।’‌ 
নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মতোই উৎসাহ নিয়ে ভোট দেওয়ার কথা বললেন প্রবীণরাও। গুরুংয়ের খাসতালুক পাতলেবাসে যেখানে এখনও পোড়া গাড়ি আর তছনছ হওয়া গুরুংয়ের ঘর পড়ে আছে, সেখানেও মানুষের ভোট দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহের কোনও খামতি ছিল না। সকাল ১১টার মধ্যেই ৩৯০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ২২২ জন ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এত উৎসাহ গুরুংয়ের সময়ও ছিল কিনা সন্দেহ। বিকেল পর্যন্ত উৎসাহ দেখা গেছে পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে। বিকেল ৫টার আগেই ভোটদানের হার ৭২ শতাংশ ছাপিয়ে গেছে। তখনও বিভিন্ন বুথের সামনে লম্বা লাইন। ভোট শেষ হতে কোথাও কোথাও সন্ধে গড়িয়ে যায়। তবে এর মধ্যেও দু–একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। দুপুরের পর আচমকাই কালিম্পঙের পথে সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর চলে। মোর্চা নেতাদের অনুমান, দিনভর পাহাড়ের খোশমেজাজ দেখে হিংসায় কেউ কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে। অবশ্যই কমিশন সেটা দেখবে। এদিনের ভোট নিয়ে বিনয় তামাং থেকে অমর সিং রাই যেমন খুশি, তেমনই খুশি রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব। তিনি জানিয়েছেন, ‘‌যে প্রার্থী জেতার আগেই নিজেকে সাংসদ বলে জাহির করেন, তাঁর দল দার্জিলিঙের বহু কেন্দ্রে এজেন্টই দিতে পারেনি। আপশোস, পোলিং এজেন্ট ভাড়ায় দেওয়া যায় না।’

খুশির ভোট দার্জিলিঙের রোহিণীতে। বৃহস্পতিবার। ছবি: এএফপি

জনপ্রিয়

Back To Top