গিরিশ মজুমদার, শিলিগুড়ি, ১৩ মে- শিলিগুড়িতে ‌দুধের চেয়েও অনেক সস্তা পনির। কারণ, বিহার থেকে আসা ভেজাল পনিরে ছেয়ে গেছে শিলিগুড়ির বাজার। মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া থেকে নিয়ে আসা সস্তা পনিরের দিকেও ঝুঁকছেন শহরবাসী। কম দামে পনির পেয়ে তাই খাবারের পদ বাড়ছে টেবিলে। দিনের পর দিন এই পনির খেয়ে বাড়ছে জটিল রোগ। শিশুদের স্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়ছে ভেজাল তথা সিন্থেটিক পনিরের। এসব নিয়ে নির্বিকার পুর কর্তৃপক্ষ। মানুষ জানতে চাইছেন কম দামে বিক্রি হওয়া এই পনিরের রহস্য কী?‌
এক কেজি পনির বানাতে অন্তত ৫ থেকে ৬ লিটার দুধের প্রয়োজন হয়। এক লিটার গরুর দুধের দাম ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। ৫ লিটার তথা ৩০০ টাকার দুধে পনির হবে ১ কেজি। বাজারে এক কেজি পনিরের দাম হবে সাধারণত ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা। এই পর্যন্ত ঠিকই রয়েছে। কিন্তু পনির কিনতে গেলেই দ্বিধায় পড়তে হবে ক্রেতাকে। একেক দোকানে একেক দর। কোনও দোকানে পনির বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়। কোথাও ২৬০ টাকায়। এক ধাক্কায় পনিরের দাম আরও ১০০ টাকা কমিয়ে ১৬০ টাকাতেও দিচ্ছে অনেকে। এত কম দামে পনির কিনতে জংশন থেকে থানামোড়, সুভাষপল্লী থেকে ভক্তিনগরের নেতাজি মোড়ের দোকানে ভিড় বাড়ছে। শিলিগুড়ি জংশন এলাকায় প্রতিদিন সকালে ড্রাম ভর্তি প্রচুর পনির বাস থেকে নামে। বেশিরভাগই পনির বিহার থেকে আসে। এর পাশাপাশি মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া থেকেও পনির আসে। 
ওই এলাকারই কয়েকটি দোকানে দুই ধরণের পনিরই পাওয়া যায়। ক্রিম যুক্ত পনিরকে খাঁটি পনির বলেন ব্যবসায়ীরা। এই পনিরের দাম ২৬০ টাকা কেজি। পাশাপাশি ১৬০ টাকা কেজিতেও পনির পাওয়া যায়। এর নাম সাদা পনির। এই পনিরই বিধান মার্কেট ও থানা মোড়ের কাছে বিক্রি হয় ১৮০ টাকা থেকে ২৪০ টাকায়। এখানকার পনির ব্যবসায়ীরা অনেকেই বলছেন, তাঁরা বিহারেই বেশি অর্ডার দেন। সেখান থেকেই আসে। তবে কী দিয়ে পনির বানানো হয়, তা তারা জানেন না। ভেজাল পনির বানাতে ব্যবসায়ীরা যন্ত্রের সাহায্যে দুধের ক্রিম (ফ্যাট) বের করে নেন। বাকি দুধ কাটিয়ে পনির হয়। এক্ষেত্রে দুধ কাটার জন্য এক ধরণের অ্যাসিড ব্যবহার হয়। ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড আইন অনুযায়ী, ফুড গ্রেড অ্যাসিডের সাহায্য দুধ কাটার পরে যে অংশ পড়ে থাকে, তাতে ৬০ শতাংশ জল এবং ৪০ শতাংশ দুগ্ধজাত ‘টোটাল সলিড’ থাকা বাধ্যতামূলক। ওই দুগ্ধজাত সলিডের মধ্যে আবার ৫০ শতাংশ ফ্যাট থাকতেই হবে। অন্যথায় একে পনির বলা যাবে না।
তবে সুভাষপল্লীর মিস্টির দোকানে পনিরের দাম একটু বেশি। এখানকার ব্যবসায়ীরা বলেন, লোকাল ও খাঁটি পনির। ২৮০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা দরে এই পনির কিনতে হবে। স্থানীয় মিষ্টি ব্যবসায়ী মহাদেব ঘোষ বলেন, ‘‌দুধের চেয়ে কম দামে পনির মিললে তা পনিরই নয়। বার্লি পাউডার আর সিন্থেটিক ছাড়া সেগুলি কিছু নয়।’‌ আর এই পনির খেয়ে বাড়ছে জটিল রোগ। রান্না ঘরে পনির এখন আবশ্যক হয়ে উঠেছে। অনুষ্ঠান বাড়িতে কম দামের পনিরে কাজ সারছে কিছু ক্যাটারিং সংস্থাও। এর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে শিলিগুড়ির শিশু বিশেষজ্ঞ সুবল দত্ত বলেন, ‘‌এই পনির লাগাতার খেলে হজমের গন্ডগোল, রক্ত চলাচলে সমস্যা, নার্ভের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ইদানীং গলব্লাডারের সমস্যায় দেখা দেওয়ায় অবাক হচ্ছি। ভেজাল সিন্থেটিক পনির খেয়ে অজান্তে মারাত্মক পেট ব্যথার রোগে ভূগতে হচ্ছে।’‌ সবার মতো তিনিও এসব নিয়ে কড়া পদক্ষেপ চাইছেন। এনিয়ে শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র পারিষদ সদস্য মুকুল সেনগুপ্ত বলেন, ‘‌আমাদের পরিকাঠামো নেই। তবে এসব বন্ধ করতে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনকেও বলা হবে।’‌ 

এই ভেজাল পনিরই বিক্রি হচ্ছে শিলিগুড়ির বিভিন্ন বাজারে। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top